ঘুরে এলাম সনাতন ধর্মের শহর বেনারস--- রীণা দাশ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

শনিবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০১৯

ঘুরে এলাম সনাতন ধর্মের শহর বেনারস--- রীণা দাশ

আমার অনুভবে চলে যাওয়া সময় যে কত সুন্দর তা উপলব্ধি করা যায় ফেলে আসার পরই।কোথাও যাওয়ার আগে তাই মানসিকভাবে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে রাখি যাতে কিছু বাদ না পড়ে।
এবারের উদ্দেশ্য জীবন ভান্ডার পূর্ণ করবো ত্যাগের মাহাত্মের মহিমা দিয়ে।
টিভিতে কর্তাবাবু দেখছিলেন প্রয়াগে কুম্ভমেলার প্রস্তুতি।যেই না দেখা অমনি মনে গেঁথে নিলেন ।অনেকটা মেঘ না চাইতে জল পাওয়ার মত অবস্হা।ছেলের কানে পৌঁছানো মাত্র টিকিটের ব্যবস্হা হয়ে গেল।যেতে হবে বিমানে পবিত্র তীর্থভূমি বেনারসের মাটি ছুঁয়ে।ভাবালু প্রকৃতির মানুষটির সাথে আমারও শুরু হলো স্বপ্ন দেখা। 
টিকিট তো হয়ে গেল,কিন্তু থাকব কোথায়,কিভাবে এই ভাবতেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একজন পরিচিতের সাথে কথা বলতেই তিনি যাবতীয় বন্দোবস্তের আশ্বাস দিলেন।পরের দিন সকালেই পরমার্থসাধক সংঘের সন্ত দয়াল মহারাজের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন।কথা বলতে বলতে মনে হয়েছিল মানুষ রূপে  ঈশ্বর এনারাই।মূহুর্তের মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে গেল।আমরা দুজন চারদিন থাকব বেনারস ভোলাগিরি আশ্রমে মাথা পিছু দুশ টাকা করে থাকা ও খাওয়া সব মিলিয়ে।
শুরু হল জল্পনা কল্পনা ইতিহাসের জননী বেনারসকে নিয়ে।বেনারস তীর্থদর্শন এ ছিল আমাদের কাছে মণিমুক্তো জহুরত পাওয়ার মত।ঈশ্বরের অপার করুণা ছাড়া আর কিছু মনে হয় নি।
অবশেষে কাঙ্খিত দিনটি এল।11th জানুয়ারী।সকাল সাড়ে নটায় ব্যাগ পোটড়া নিয়ে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।বিমান ছাড়বে 11.25 a.এ।গন্তব্য বেনারস।শিহরণের পারদ চড়ছে।যাবে কলকাতার মাটি ছুঁয়ে।এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে যখন বসেছিলাম মনে হয়েছিল ,বিমানটাই মহামিলনক্ষেত্র।বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আগত যাত্রীদের সবার মুখেই একটা আশার হাসি।
ইতিহাসপাঠে বেনারসের প্রতি একটা অন্যরকম ভালো লাগা ছিল।হিন্দুদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসাবেও এই স্হানকে দেখা ও জানার একটা আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই।ঈশ্বর ডাকেন নি বলে তাঁর দরজায় যাওয়ার সময় হয় নি।মা ,ঠাকুমার মুখে শুনতাম মোক্ষ লাভের আশায় অনেকেই কাশীবাসী হতেন।সেই মাটি চোখের সামনে,ভাবতেই মনটা কেমন করে উঠল।
বিমান বেনারসের মাটি ছুঁবে এমন সময় বিমান সেবিকা ঘোষণা দিলেন ATC এর বার্তা না পাওয়ায় বেনারসের আকাশে আরো একটু সময় কাটাতে হবে।মন্দ তো নয় ,এক ভাড়ায় ঈশ্বর কয়েকবার চক্কর কাটার সুযোগ করে দিলেন।অবশেষে নামলাম বেনারসের লালবাহাদুর শাস্ত্রী বিমানবন্দরে।সময় বিকাল চারটে।তাপমাত্রা 24 ডিগ্রী সেলসিয়াস।ভীত ছিলাম উত্তর ভারতে এই সময়ে শীতের প্রকোপ নিয়ে।ভয় কেটে গেল।ঈশ্বর সাথ দেবেন শুরুতেই বোঝা গেল।
বিমানবন্দর থেকে আমাদের গন্তব্যস্হল ভোলাগিরি আশ্রম।ভেলোপোড়া পুলিশ ষ্টেশনের পাশে।বিমানবন্দর থেকে 30km দূরত্বে অবস্হিত।প্রিপেইডে জানিয়ে দিল বারশো টাকা লাগবে।বের হয়ে গেলাম বিমানবন্দর থেকে।বাইরে থেকে ছয়শো টাকায় ছুটলাম পঁয়তাল্লিশ মিনিটের রাস্তা।পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
আশ্রমে পা রাখতেই সৌম্যকান্তি দর্শণধারী মহারাজ মাধবানন্দজী আমাদের নির্ধারিত রুমের চাবি ধরিয়ে দিলেন।আধো হিন্দিতে কথা বলা শুরু করতেই আশ্রমবাসীরা আমাদের ভাষার অবস্হান বুঝতে পেরে বাংলা ভাষাতেই কথোপকথন শুরু করলেন।ফলে ভাবের আদান প্রদানে আর কোন অসুবিধা রইলো না।রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গা মায়ের ঘাটের উদ্দেশ্যে।শুনেছি অষ্ট আশিটি ঘাট আছে গঙ্গার পাড় ঘেসে।শুরুতেই যে ঘাটে পৌঁছলাম তার নাম হরিশ্চন্দ্র ঘাট।কথিত আছে পৌরাণিক রাজা হরিশ্চন্দ্র এই ঘাটে এক সময়ে ডোমের কাজ করেছিলেন।রাতদিন এখানে মৃতদেহ সৎকার করা হয়।দাঁড়িয়ে মানব জীবনের সত্যকে প্রত্যক্ষ করছিলাম আর ভাবছিলাম মানব জন্ম হওয়া উচিৎ কান্নার আর মৃত্যু হাসির।মৃত্যুতেই মুক্তি,তবে মোক্ষ কিনা জানি না।মনে আসে,একটু একটু করে যে দেহ ছাঁই হয়ে যায়,এ দেহ নিয়ে ঐহিক জগতে মানুষের কতই না অহংকার।সব দেহ পুড়েই তো ছাঁই হয়।ভেসে যায় গঙ্গার জলে।নিরাকার এই রূপ কোথায় ঠাঁই পায় ??এই জন্যই কি সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পরজন্মবাদে বিশ্বাসী ??এর থেকে মুক্তি লাভের জন্যই কি ঈশ্বরোপসনা?? 
ভাবতে ভাবতে গঙ্গার পাড় ধরে হেঁটে একে একে অসি ঘাট,দ্বারভাঙ্গা ঘাট,মুন্সি ঘাট,দশাশ্বমেধ ঘাট,মান মন্দির ঘাট,স্কিনদিয়া ঘাট,ভোঁসলে ঘাট,পঞ্চাঙ্গ ঘাট,মণিকর্ণিকা ঘাট ইত্যাদি অনেক ঘাট ঘুরে নিলাম।মণিকর্ণিকা ঘাটে অধিকাংশ সৎকার হয়।প্রাচীনকালে মানুষ কাশীবাসী হতেন এই ধারণাতেই যে এই ঘাটে সৎকার হলে জন্ম জন্মান্তরের চক্র থেকে আত্মা মুক্তি লাভ করে।সব দোষ মুছে যায়। ঘাট পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম তাহলে কি যাদের দেহ এ ঘাটে সৎকার হবে না তারা কি আবার চক্রাকারে এই ধরাধামে আসবেন?
এরপর গঙ্গার বুকে নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরলাম।সাইবেরিয়ান পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা গঙ্গার সৌন্দর্য্যতাকে আরো গভীর করে তুলেছিল।ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা ঘনাতেই চলে এলাম দশাশ্বমেধ ঘাটে-----

(ক্রমশ )

রীণা দাশ, ত্রিপুরা

২৬শে জানুয়ারি ২০১৯ইং

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here