খনা চরিত "(ধারাবাহিক নাটক) ......প্রথম পর্বের পর ২য়,৩য় এবং ৪র্থ পর্ব - অস্ট্রেলিয়া থেকে রবিরশ্মি ঘোষ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

খনা চরিত "(ধারাবাহিক নাটক) ......প্রথম পর্বের পর ২য়,৩য় এবং ৪র্থ পর্ব - অস্ট্রেলিয়া থেকে রবিরশ্মি ঘোষ

মুখবন্ধ: খনা কিংবদন্তীর অন্তরাল থেকে উঠে আসা বিস্মৃতপ্রায় এক নাম। ইতিহাসের কাছে তার থাকার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। শুধু লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে তার বচন। সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের জন্য বলে যাওয়া কিছু কথা।আমার বিনীত প্রয়াস শুধু প্রাচীন বাংলার আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক বিদুষী নারীর অস্তিত্বের লড়াই কে তুলে ধরা। যে সেচ্ছায় নিজের বাকরুদ্ধ করেছিল তার কথা কে গল্পের ছলে সবার কাছে নিয়ে আসা।

প্রথম পর্বের পর ঃ


দৃশ্য ২:

(কথক ঠাকুর এর প্রবেশ)
কথক ঠাকুর: রাজপ্রাসাদের খবর তো অনেক হইল| কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ? তা দিগের কি সংবাদ? চলেন দেখা যাক|

(মঞ্চে চন্দ্রকেতু গড়ের এক গ্রাম্য জ্যোতিষী ব্রাহ্মন উপবিষ্ট| এর মধ্যে এক প্রজার প্রবেশ)
ব্রাহ্মন: কি হে ঘোষের পো, হেই সক্কাল সক্কাল কই যাইতেছ?
প্রজা: আরে ভটচাজ মশাই যে| পেন্নাম হই| হুই রাজবাড়ির দিকে যাইতেছি গো| শুনতি পেলাম হোথায় নাকি এক মস্ত বড় জ্যোতিষী এইয়েছেন গো| ভাবতেছি তার কাছে গিয়া একটু ভাইগ্য টা বিচার করাইয়া লই| সময়টা বড় ভালো যেইতেছে না গো| আর বছর ফসল টাও কেমন নষ্ট হইল|
ব্রাহ্মন: ধুর বেটা চাষা| মস্ত বড় জ্যোতিষী কি তর ফসলের কথা শুইনবার লেইগ্য়ে বইস্যে আছেন নাকি? তিনি কে জানিস? তিনি হইলেন বরাহ পন্ডিত| সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রধান রত্ন| তিনি দিব্যেন তর চাষের খবর?
প্রজা: হেই কথা টা তো ভাব্যি নাই ভটচাজ মশাই| তাই তো| এত বড় মানুষ চাষ বাসের খবর শুইনব কেন্যে|
ব্রাহ্মন: হুঁ হুঁ বাবা| এই লায়গ্য়েই তো শাস্ত্রে কৈয়েছে “অস্তি গোদাবরী তীরে এক বিশাল শাল্মলিতরু”|
প্রজা (অবাক চোখে): এগ্য়ে ভটচাজ মশাই ওই সাল সাল কি কইলেন যেন| কি জিনিস গো হেই টা? ওই কি তরু?
ব্রাহ্মন: গরু| যেমন তুই একখান বলদ| যা যা চাষ বাস কর গি যা| মেলা কাজ পইরে আছে|
প্রজা: কিন্তু ভটচাজ মশাই ওই চাষ নিয়াই তো সমস্যা| আর বছর ফসল টা নষ্ট হইল যে গো| কি করা| কার কাছ্যে যে যানতি পারব|
ব্রাহ্মন: দেখ আমার আবার দয়ার শরীর| কারো দুঃখ দেইখতে পারি না তো| তুই বরং হেই বেটির কাছে যা| হুই যে কি নাম যেন – হ্যাঁ মনে পৈরেছে, খনা| সে তো শুনছি চাষ বাস লইয়ে অনেক কথা কয়|
প্রজা: বাচাইলেন ঠাকুর মশাই| তাইলে হেই দিক্যেই যাই|
(প্রজার প্রস্থান)

 দৃশ্য ৩

(খনা ও মিহিরের কুটীর)
(মিহির কাগজের ওপর কলম দিয়ে জটিল গণনায় ব্যস্ত| দ্বিতীয় দৃশ্যের প্রজা ও আরো কিছু চাষী গোছের লোক ইতস্তত উপবিষ্ট| খনা ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এবং সকলকে নমস্কার করে| চাষী রাও প্রতি নমস্কার করে|)
খনা: আপনারা বহু দূর থেকে এসেছেন| কি ভাবে আপনাদের সেবা করতে পারি?
প্রথম দৃশ্যের প্রজা: মা সাহায্য তো লায়গ্বই তবে একখান কথা জাইনবার ইচ্ছা| আমরা যে অনেক দূর থেইককে আইয়েচ্ছি সেইটে তুমি জাইনলে কেমন কইরে?
খনা (মৃদু হেসে): খুড়া, আপনার পায়ে অনেক কাদা লাগা আছে| এখানে আকাশে মেঘ থাকলেও কয়েকদিন যাবত বৃষ্টি হয় নি| আপনি এমন কোনো গ্রাম থেকে এসেছেন যেখানে বৃষ্টি হয়েছে এবং সেই গ্রাম এখান থেকে কম করেও এক দিনের হাঁটা পথ হবে|
প্রথম দৃশ্যের প্রজা: মাইনলাম গো মা তোমার বিদ্য়েরে| এইবার আমার সমস্যার একখান বিচার দাও দেখি|
খনা: কি আপনার সমস্যা?
প্রথম দৃশ্যের প্রজা: আর বছর আমার ধানের ফসল টা নষ্ট হইল যে গো| কি যে করি| ভটচাজ মশাইরে জিজ্ঞাস করলাম তো তিনি বইল্লেন তোমার কাছে আইতে|
খনা: ধানের চাষ (অল্প ভেবে)... হুঁ | আষাঢ়স্য পঞ্চম দিবসে
(খনা দেখে যে চাষী অবাক হয়ে শুনছে এবং কিছু বুঝতে পারছে না| খনা হেসে ফেলে)
দাড়ান খুড়া, সহজ ভাবে কই|
আষাঢ়ের পঞ্চদিনে রোপণ করে ধানে ।।
বাড়ে তার কৃষিবল । কৃষিকার্য তার সফল ।।
প্রথম দৃশ্যের প্রজা: এইবার বুইঝতে পারছি মা জননী| আইজকে হইল আষাঢ় মাসের তৃতীয় দিন| কাইল বাদে পরশু যদি ধান লাগাই তব্যে তার ফসল ঠিক হইব্যে|
চাষী ২: মা, ধান ছাড়া অইন্য ফসলের কথাও কন কিছু|
খনা: শুনেন তাহলে|
পান পোঁত শ্রাবনে | খেলে না ফুরায় রাবনে ।।
খনা বলে চাষার পো । শরতের শেষে সরিষা রো ।।
ভাদ্দরের চারি আশ্বিনের চারি । কলাই রোবে যত পারি ।।
খনা বলে শুন শুন | শরতের শেষে মুলা বুন||

খুড়া, একই মাঠে দুই ফসলের চাষও হয়|
সরিষা বুনে কলায় মুগ| বুনে বেড়াও চাপড়ে বুক||

চাষী ২: মাগো অনেক কিছুই জাইনলাম গো|

খনা: খুড়া, আরো কিছু কথা কই|

খনা বলে হাল নিয়ে মাঠে যবে করিবে গমন ।
আগে দেখ চাষী ভাই হয় যেন শুভক্ষণ ।।
শুভক্ষণে করিবে যাত্রা ।
পথে যেন নাহি শুন মন্দবার্তা ।।
বাপ-বেটা মিলে অভাবেতে সদর ভাই 
মনের সুখেতে চাষ কর চাষী ভাই ।।
খাটে খাটায় লাভের গাঁতি| তার অর্ধেক মাথায় ছাতি||
ঘরে এসে পুছে বাত| তার ঘরে হা-ভাত হা-ভাত||

(খনা জোড় হাতে প্রণাম জানায়| চাষীরা প্রতি নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে যায়|)
(মিহির লেখা থেকে মুখ তলে খনার দিকে চেয়ে হাসে|)
মিহির: কৃষিকার্যের বিধি তো অনুধাবন করলাম কিন্তু শেষের কথাগুলি কি ছিল?
খনা (হেসে): কৃষি তে যাওয়ার সময় যদি চাষীর মন বিচলিত থাকে তাহলে কৃষিতে তার মন বসবে?
মিহির: আর বাপ-বেটা মিলে???
খনা: বংশানুক্রমে চাষের জমি ক্রমশই ভাগ হয়ে যাচ্ছে আর যার জন্যে চাষীর ভাগে লাভ আর কিছুই থাকে না| যতক্ষণ না তারা সবাই মিলে চাষ করতে শিখছে কৃষিকার্য থেকে লাভ হবে কি করে?
মিহির: তাও বুঝলাম| আর সব শেষের টা?
খনা: তাও বোঝাতে হবে? (হাসে) কৃষক যদি নিজে কৃষিকার্যে যুক্ত না থাকে তার পরিণাম কি লাভজনক হতে পারে?
মিহির: খনা, তোমার এই সহজ ভাষায় বিতরণ করা শিক্ষা বঙ্গ দেশের কৃষক কুলের হিতসাধন করতে সমর্থ হোক, এই আমার প্রার্থনা|
খনা: তুমি পাশে থাক শুধু| সব হবে|

(নেপথ্যে গানের সুরে খনার বচন)
যদি চৈতে বৃষ্টি হয়| তবে ধানের সৃষ্টি হয়||
যদি কার্তিকে উনো জলে| খনা বলে ধান দুনো ফলে||
আগে বাধি আলি| রোপ তবে শালি||
কেমন ফসল দেখবে ফলে| খুশি হবে খনা বলে||


 দৃশ্য ৪

(নদীর ধারে মিহির একা বসা| গান চলাকালীন খনার প্রবেশ)

গান:
হেই হেইয়া হেইও রে, তাকত দিয়া বাইয় রে||
হেই হেইয়া হেইও রে, তাকত দিয়া বাইয় রে||
নাও বাইয়া যাও রে মাঝি কুন বা দ্যাশে ঘর,
যেই দ্যাশে তে থাকে বুঝি বেউলা লখিন্দর|
আমারে লইয়া যাও গো বন্ধু তোমার লগে কইরা,
গাঙের জলে ভাইস্যা যাই তোমার নাওয়ে চইড়া|
নাইগো আমার ঘর বন্ধু, নাইগো আমার দ্যাশ,
তোমার নাও টি বাইয়া বন্ধু লও গো নদীর শ্যাষ|
নদীর শ্যাষে সাগর বন্ধু নাইকো তাহার শ্যাষ,
তাহারও মাঝে তে যদি পাইগো আমার দ্যাশ|
হেই হেইয়া হেইও রে, তাকত দিয়া বাইয় রে||
হেই হেইয়া হেইও রে, তাকত দিয়া বাইয় রে||

(খনা ধীর পদক্ষেপে এসে মিহিরের পাশে দাড়ায়| মিহির অল্প ফিরে চায়, কিছু বলে না)
খনা: কি দেখছ?
মিহির: এই নদী| কেমন ভাবে এই জলরাশি বয়ে গিয়ে সেই বিশাল জলাধারে মিশে যায়| সেই জলরাশি বাস্প হয়ে বাতাসে মেশে, তারপর বৃষ্টি হয়ে ঝরে এই স্রোতস্বিনীর অঙ্গে আবার মিশে যায়| এ যেন জীবন চক্র – জন্ম – মৃত্যু-তারপর আবার জন্ম, হয়ত|
খনা: এ তো প্রকৃতির চিরাচরিত ধর্ম| সৃষ্টি, স্থিতি, লয়| তারপর সে চক্রেরই পুনরাবৃত্তি|
মিহির: জানো মাঝে মাঝে ভাবি এই জলরাশি কি জানে তার উৎপত্তি স্থল কোথায়?
খনা: জলরাশির কি তা জানার প্রয়োজন আছে?
মিহির: জলরাশির হয়ত নেই, কিন্তু আমার আছে খনা, আমার আছে| আমি জানতে চাই কোথায় আমার জন্ম, কে আমার জন্মদাত্রী, কে বা আমার পিতা? কোন বংশের জাতক আমি|
খনা: এই জলরাশি যেমন নিজের উৎস না জেনেও নিজ গুনেই মহিমাময়, তেমনি আজকে তোমার বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান এর জন্যই তোমার পরিচয়| বংশ পরিচয় কি এতই গুরুত্বপূর্ণ?
মিহির: এ শুধু বংশ পরিচয়ের প্রশ্ন নয় খনা| প্রশ্ন আমার অস্তিত্বের| জ্ঞানাবধি আচার্য দেবের কাছে শুনে এসেছি যে নদীবক্ষে নৌকা বিহারের সময় আমাকে তিনি পান, এক ডালির মধ্যে ভাসমান অবস্থায়| ভাবি কোন দোষে আমার পিতা মাতা আমাকে ত্যাগ করেছিলেন|
খনা: শিশু নিষ্পাপ|তার কোনো দোষ হতে পারে না|
মিহির: তবে কেন খনা? তবে কেন?
খনা: আচার্য দেব তোমাকে বহু যত্নে বড় করেছেন| সিংহল দেশে এবং এখন এই বঙ্গ দেশেও মানুষের ভালবাসা তুমি পেয়েছ| তবু তোমার মনের এই আকুতি আমি বুঝি| আমি আজকে কথা দিলাম এই নদীর জল আর নীল আকাশকে সাক্ষী রেখে যে তোমার পিতৃপরিচয় আমি অন্বেষণ করব|
মিহির: সে তো অসাধ্যসাধন খনা| আমি জানি আমার প্রতি তোমার ভালবাসা গভীর কিন্তু এ কার্য তো অত্যন্ত দুরুহ||
খনা: সেই দুরুহ কার্য সম্পন্ন করবার অভিপ্রায় নিয়েই তো এই সুদুর বঙ্গ দেশে আসা|
মিহির: কিন্তু কেন খনা? তুমি তোমার নিজের দেশ পরিজন সব ছেড়ে কেন এলে এভাবে?
খনা: তাও কি বলে দিতে হবে? তুমি জানো না যে তোমার মুখে একটি হাসির রেখা দেখার জন্য আমি সব কিছু করতে রাজি?
মিহির: জানি খনা| তাই তো তুমি শুধু আমার সহধর্মিনী নও, আমার মানসী|
খনা: তাই যেন থাকতে পারি - তোমার পথ চলার সাথী হয়ে সারাজীবন|
(মিহির কিছু বলে না| শুধু খনার হাত ধরে জলের দিকে চেয়ে থাকে)
(নেপথ্যে মাঝির গান চলতে চলতে মিলিয়ে যায়)


============================================================
ক্রমশ......

রবিরশ্মি ঘোষ, অস্ট্রেলিয়া 


ছবিঋণঃ ইন্টারনেটের সৌজন্যে 
৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner