আজকের গল্প - 'কাটলেট'..... মনদীপ ঘরাই,বাংলাদেশ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

আজকের গল্প - 'কাটলেট'..... মনদীপ ঘরাই,বাংলাদেশ

রেস্টুরেন্টের ঘড়িগুলোর কাটাগুলো এমন অলস কেন? আধাঘণ্টা ধরে বসে আছে ভেবে ঘড়িতে তাকাতেই রনন দেখে মাত্র ৭ মিনিট পেরিয়েছে।দোষটা কি ঘড়ির কাঁটার? নাকি সময়ের? ‘স্যার, এই যে কাঁটা’ রনন চমকে উঠে তাকালো ওয়েটারের মুখের দিকে। কাঁটা মানে! ঘড়ির কাঁটাকে মনে মনে অলস বলেছিল সে। খুলে এনে দিতে তো বলে নি!! হাতের দিকে তাকাতে ভুল ভাঙল। কাঁটা চামচ এনেছে ওয়েটার। ঘড়ির কাঁটা না। সাথে চিকেন কাটলেট। একটা আদর্শ কাঁটাচামচে কয়টি দাঁত থাকে? যে কয়টিই থাকুক,চিকেন কাকলেটের হৃদয়ে ত্রিশুল হয়ে বিঁধতে একটা দাঁতের বেশি লাগে নাকি? রননের চোখ পড়ে পাশের টেবিলে। একটা ছেলে। বয়স ২০-২১ হবে। তার টেবিলে র্যা পিং পেপারে মোড়া কিছু একটা। বারবার হাত ঘড়ি দেখার ভঙ্গি করছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, হাতে ঘড়ি নেই তার। অভ্যাসবশতই দেখছে। অপেক্ষাটা ভালোবাসার কারো জন্যই হবে। সদ্য সেলুন থেকে কাটানো চুল, পরিপাটি শার্ট-জিন্স আর ... উৎসুক চোখ দেখেই বুঝতে কষ্ট হয় না। পাশের দুই টেবিল পরিপূর্ণ ওই ছেলেটার বয়সী গোটাদশেক ছেলে দিয়ে।তবে দুই টেবিলের ছেলেগুলো কেউ কাউকে চেনে না বলেই রননের মনে হয়। এই দুটো টেবিলের ছেলেগুলোকে তেমন একটা পছন্দ হয় না রননের।বখাটে। রননের পেছনের টেবিলে একটা তরুণী। খাবার নিয়েছে একগাদা। গত ১৫ মিনিট ধরে শুধু খাবারের ছবি আর সেলফি তুলছে। রনন বেশি তাকালো না। পাছে ওই তরুনী মনে করে বসে কিনা যে রনন হয়তো তাকেই দেখছে। তরুণীর পাশের টেবিলে এক সম্ভ্রান্ত বুড়ো বসে আছে। বসে আছে বললে খুব ভুল হবে। ওয়েটারের সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে ঝগড়া করছে। তরকারিতে চিনি কম হয়েছে। রনন অবাক! তরকারিতে লবণ কম হরহামেশাই শোনে। শেষমেষ চিনি কমের জন্য ঝগড়া!!! ওয়েটার বেচারা স্যরি বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে। ওদিকে রাস্তার ধারের কোনার টেবিলটায় চলছে আরেক কাণ্ড। ২ কি ৩ বছর বয়স হবে হয়তো মেয়েটার। ভাতভর্তি প্লেটের ওপর উঠে বসেছে। কেউ নামাতে পারছে না। নামালেই কান্না শুরু। দুহাতে ভাত ছিটাচ্ছে আর বলছে, ‘তুলা, তুলা’ সাদা ভাতকে তুলা ভেবেই হয়তো উড়াচ্ছে। মেয়েটার বাবার মুখটা দেখার মতো। রাগ,ক্ষোভ,দুঃখ, লজ্জ্বা সব মিলে একটা খিচুড়ি এক্সপ্রেশন! আর মায়ের কথা নাই বা বললাম। বামপাশের টেবিলে ৩ জন বন্ধু বসা। তিনজের হাতেই মোবাইল। মোবাইল টিপছে আর কি যেন খাবার প্লেটে নিয়ে নাড়ছে। আইটেমগুলো চেনা নয় রননের। এ দলে রনন একা নয়। পাশের টেবিলের এক লোকও আছে। উনি গ্রাম থেকে এসেছেন। বারবার বলছেন, টাহা পয়সা কোনো সমেস্যা না, বোজ্জেন? পাশের টেবিলে যেইয়া অর্ডার দেসে, হেইয়্যা দ্যান’ ওয়েটার ঘেমে যাচ্ছে। কারণ, তিনজন তো অর্ডার করেছে তিন ধরণের মেক্সিকান খাবার! কে কাকে বুঝাবে। সবচেয়ে নির্ভেজাল টিভি কর্নারে বসা মাঝবয়েসী মহিলাটা। এককাপ ধোঁয়া ওঠা কফি সামনে নিয়ে বই পড়ছেন। এ নিয়ে তিনবার কফি ঠান্ডা হলো,তিনবার ওয়েটারকে দিয়ে গরম করিয়ে এনেছে।মনে হচ্ছে, কফির ধোঁয়া ছাড়া তার বই পড়া হয় না। রেলের স্টিম ইঞ্জিনের মতো। রননের সামনে একটা টেবিলে পুরোনো দুই বন্ধুর ২০ বছর পর দেখা হয়েছে। সাথে দুজনের পরিবার। দুই বন্ধু মহাগল্প জুড়েছে।আর দুই পরিবার মুখে প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। এবার আবার শুরু থেকে... রননের পাশের টেবিলের ছেলেটার সামনে কোনো মেয়ে তো না, একটা ছেলে এসে বসেছে। শুধু বসে নি। রীতিমত হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। ছেলেটার মন যে ভেঙ্গেছে তা কি আর আলাদা করে বলতে হয়? এক সপ্তাহ মোবাইলে কথা বলার পর মেয়েটা নিজে না এসে বয়ফ্রেন্ডকে পাঠিয়েছে। তাদের ঝগড়া চলছিল, তাই সামিনা একটু ‘দুষ্টুমি’ করে কথা বলেছে। ছেলেটাই বা মানবে কেন? গত সাতদিনে কি কি কথা হয়েছে রেকর্ডিং শোনাতে লাগলো। এখন মেয়েটা আর তার বয়ফ্রেন্ড ঝগড়া করছে... পাশের দুই টেবিলের বখাটে ছেলেগুলো উঠে এসে টেবিলের দুই দিক ঘিরে রেখেছে। এখন রনন বুঝেছে এরা প্রেমিক পুরুষ আর বয়ফ্রেন্ড এই দুজনের লোক। পরিস্থিতির অপেক্ষায় ছিল। এখন দু পক্ষ মুখোমুখি। র্যা পিং করা গিফটটা এখনো টেবিলেই রাখা। রননের পেছনের টেবিলের তরুনীর বয়ফ্রেন্ড এসে পড়েছে। এখন দুজন মিলে সেলফি তুলছে। পাশের টেবিলের বুড়োর বাসা থেকে স্ত্রী আর ছেলে চলে এসেছে বাসার ড্রেসেই। ডায়াবেটিক বাবার চিনি খাওয়া ঠেকাতে। বুড়োর স্ত্রী এখন ওয়েটারকে শাসাচ্ছে। বাচ্চা মেয়েটা ভাতের থালা থেকে নেমেছে। ঘুমাচ্ছে। এখন পরিস্কার পর্ব চলছে। ওই তিনজন বন্ধুর টেবিলটাতে এখন পাঁচজন। এবার পাঁচজনই মোবাইল চাপছে।নতুন দুজন অর্ডার করছে কালো রঙ্গের বার্গার। কি রে ভাই! পোড়া পাউরুটি নাকি? মনে মনে ভাবে রনন। ঝামেলা আর গ্যাঞ্জামের কি দেখেছেন এতক্ষণ। আসল গ্যাঞ্জাম বাধালো গ্রামের সেই লোক। একটু আগে টাকার গরম দেখানো তিনি এখন অন্যরূপে, " মোর কি টাহায় গা কামড়ায়? তুই একই খানা তিনডা আনছো ক্যা? হ্যা? তোরে তুইল্যা আছাড় দিমু জানোয়ার’ ওই যে, একই রকম দেখতে তিন ধরনের মেক্সিকান খাবার! টিভি কর্ণারে বসা মহিলাটা বইয়ের মাঝামাঝি। কফির ধোঁয়া উড়ছে। বই না শেষ করে আজ যাবে না বোধ হয়। ‘তুমি ওই বুড়ি মহিলার দিকে তাকিয়ে আছ কেনো?’ চিন্তার জগতটা চুরমার হয়ে যায় মুহূর্তে। রননের গার্লফ্রেন্ড মিলা এসেছে। কোথায় দেরিতে আসার জন্য রনন ঝগড়া করবে, উল্টো মিলা এসে শুরু করে দিয়েছে মাঝবয়েসী এই মহিলার দিকে তাকানো নিয়ে। রনন তো সবাইকেই দেখছিলো।শুধু ওই মহিলাকে না। ওসব বুঝানোর সময় শেষ। তুমুল ঝগড়া চলছে। রননও দেরিতে আসার দোষ দিতে ছাড়ে না। চলিতেছে মহা সংগ্রাম... এই তো গতকালকের কথা। রনন এসে বলছিলো, ‘ভাই রেস্টুরেন্টের সংজ্ঞা কি?মিলার অ্যাসাইনমেন্টে লাগবে।সবাই তো গুগল সার্চ করে দেবে। আপনি মিয়া এতো লেখেন, অরিজিনাল কোনো সংজ্ঞা দ্যান।’ আমার উত্তরে রনন রেগেমেগে বের হয়ে গিয়েছিলো। আমি বলেছিলাম, ‘আধুনিক রেস্টুরেন্ট হলো সেই বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে মন ভরে খাওয়া ছাড়া জগতের সবকিছু হয়’ ননের প্লেটে চিকেন কাটলেটটা কাঁটা চামচ-বিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। পাসে টমেটো সস?
নাকি কাটলেটের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ?

মনদীপ ঘরাই, বাংলাদেশ

২৮শে অক্টোবর ২০১৮ইং




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here