কমলাসুন্দরীর গাঁয়ে... - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮

কমলাসুন্দরীর গাঁয়ে...

Thelakunja (ঠেলাকুঞ্জ) ত্রিপুরার দক্ষিণে কিল্লা ব্লকে  অবস্হিত এক অখ্যাত গ্রাম।নাম শুনলে আৎকে উঠবেন অনেকেই।সমুদ্র স্তর থেকে 41 মিটার উপরে অবস্হিত জায়গাটি ধীরে ধীরে কমলার রঙে সেজে উঠছে।জায়গাটির বুকে পা রাখতে নির্দ্দিষ্ট কোন পথ অবলম্বন করতে হয় না।প্রকৃতি তার নিজের প্রয়োজনে দ্বার অবারিত করে দেয় জনকলরবের জন্য।কখনো কখনো নীরব সম্মোহন টুটে যায় প্রকৃতি মায়ের।অদৃশ্য দুয়ার ভেদ করে সরবতায় পূর্ণ হওয়ার জন্যই হাট করে খোলা থাকে তখন চারিদিক।
ত্রিপুরা সুন্দরী মায়ের পা ছুঁয়ে ঠেলাকুঞ্জে যেতে হলে বিয়াল্লিশ কিমি পথ পেরোতে হবে,কিল্লা  ব্লক থেকে চার কিমি পেরোতে হবে এবং যারা রাজধানী আগরতলা থেকে পা রাখবেন ওই গাঁয়ে ,তারা সাতত্রিশ কিমি পথ অতিক্রম করলেই কমলাসুন্দরীকে ছুঁতে পারবেন।ঠেলাকুঞ্জ গ্রামকে ঘিরে রেখেছে কাঁছিয়াগাও,ছয়ঘরিয়া,উত্তর বড়মুড়া,কিল্লা এবং দক্ষিণ ব্রজেন্দ্রনগর ।
সকাল হতেই তড়িঘরি রওনা হলাম ঠেলাকুঞ্জের পথে।পাহাড়ি জনজাতি অধ্যুষিত জনপদে ঘুরাফেরা অনেকেরই না পছন্দ।কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে যার টানে অপেক্ষা করা তাকে অবহেলা করি কি করে ----মনে পড়ছিল আবুল হাসানের একটা লাইন---" এ ভ্রমণ আর কিছু নয়,কেবল তোমার কাছে যাওয়া।"
রওনা দিলাম ।একে একে শহরের বিভিন্ন ঠিকানা ছাড়িয়ে গাড়ি সোঁ সোঁ গতিতে চলল ।শহর ছেড়ে এবার গ্রামের রাস্তা।ধানক্ষেতের পাশ ঘেঁষে কখনো বা রাবার বাগানের বুক চিরে।পুরো রাস্তা আলো ছায়ায় মাখামাখি।জড়িয়ে আছে একে অন্যকে আলিঙ্গন করে।এ মায়া বড় মোহময়।স্নিগ্ধ কমনীয়।উপছে পড়া রূপলাবন্য।এমন রূপের প্রেমে পথিককে দুদন্ড থামতেই হবে।মাখতে হবে অরূপ মাধুরী।নয়তো বৃথা জীবন।সাথিদের মধ্যে দুজন পুরুষ সাথি গাড়িতেই বসে রইলেন।বুঝলাম প্রকৃতির এ লাবন্য উনাদের ধ্যানভঙ্গ করাতে পারে নি।আমরা নারী প্রকৃতি দুজন নেমে পড়ি প্রকৃতির ওই অমোঘ টানে।দু এক কদম পাঁয়চারী শেষে আবার যাত্রা শুরু ।যানজটহীন এমন খোলামেলা পথঘাট হতে পারে বর্তমানের ব্যস্ত সময়ে,এ আমার ধারণার বাইরে ছিল।চলতে পথে মনে হয়েছিল একাকী পথের যাত্রী আমরা।মাঝে মাঝে একটা দুটো যান আমাদের ঘোরে দোলা লাগাচ্ছিল কেবল।যাই হোক----
এক্কা,দুক্কা করে অবশেষে গন্তব্যস্হল ঠেলাকুঞ্জ গ্রামে এসে গাড়ি ব্রেক কষল।পেয়ে গেলাম ঠিকানা।
পৌঁছে দেখলাম অপার সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে কমলাসুন্দরীর গাঁও।প্রবেশ মুখেই পর্বত দুহিতারা তাদের সাজানো সংসার মেলে রেখেছেন আমাদের মত যারা আসছেন তাদের জন্য।মূলতঃ পাহাড়ি জনপদ হওয়ায় তাদের পসরার আধিক্যই ছিল বেশি।নজরে পড়লো পাতা দিয়ে মুড়ানো একধরনের খাদ্যের।ককবরক ভাষায় একে এরা "বাঙ্গই" বলে।জপে জপে মুখস্ত করে নিলাম।আরেকটু এগুতেই নজর পড়লো বাঁশের তৈরী চোঙে এক ধরনের খাদ্য,একে নাকি "ওয়াংচু গুদক" বলে।দারুণ সব নাম।লোভ সামলে এগিয়ে গেলাম।গিয়ে চক্ষু ছানাবড়া।এ যে অচেনার আনন্দের ধারা বইছে।পথঘাট নেই।অথচ সবাই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।কিসের সন্ধানে যাচ্ছে,ভাবতে ভাবতে আমরাও এগুচ্ছি।আশ্চর্য !!! 
পাহাড়ের বুক চিড়ে এমন পথ কে তৈরী করে,কেন ই বা করে ,এমন সব প্রশ্ন কারো কারো মনকে আন্দোলিত করে বৈকি।নয়তো কিসের পিপাসায় জীবন বাজি রেখে এমন পথে পদচারণা।বিস্মিত হতে হয়।মনোহারিনী অঞ্চল।মনে হলো প্রকৃতিই পারে এমন অবারিত দুয়ার খুলে দিতে,মনের ক্ষুধা মেটাতে।চড়াই উৎরাই পার হতে গিয়ে মনে পড়ে যায় ভ্রমণের আগে মানুষ নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকলেও ভ্রমণের পর মানুষ সাথী হিসাবে পেয়ে যায় দৃশ্যসমূহকে।
দেখলাম সুন্দর সুবিস্তীর্ণ সবুজে মাখা বনভূমি।উঁচু নীচু সবুজ টিলা একটির উপর একটি উঁকি দিচ্ছে।প্রকৃতির এই মোহময়ী রূপে অবগাহন করার সাধ জাগবেই।পথহীন পথে চলা মানুষগুলোকে দেখে মনে হবে ,মানুষগুলো নিশ্চয়ই কোন গুপ্তধনের সন্ধানে ছুটে চলেছে আমাদের মতই।পদচারনা কবে থেকে শুরু হয়েছিল কে জানে ।বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তাঁঁর আরণ্যক উপন্যাসে লিখেছিলেন ---"কতকাল হইতে এই বন পাহাড় এইরকম আছে----।" আমারও এই ঘন জঙ্গলে তাই মনে হলো। 
আদি, অকৃত্রিম, অপাপবিদ্ধ সরল সুন্দর বলতে যা বুঝায় ,এ যেন ঈশ্বরের বিরাজভূমি।কলুষতা ও মলিনতাবিহীন নির্জন বনভূমি মানুষের কলরবে উচ্ছ্বসিত আজ।সামনে এগিয়ে যেতেই স্বচ্ছতোয়া  জলের প্রবাহ।অগভীর এই প্রবাহের উপর বাঁশের সাঁকো করা পারাপারের জন্য।পা রাখতে ইচ্ছে হলো।শিহরণ জাগলো জলের ছোঁয়ায়। 
আরেকটু এগুতেই দেখা পেলাম কমলাসুন্দরীদের।আহা।মন জুড়িয়ে গেল।কিছু গাছ বার্ধক্যে জর্জরিত।কিছু গাছে এখনো যৌবনের আদল।পূর্ণ ফুটন্ত সৌন্দর্যের লালিমা গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এদের সৌন্দর্যের পাহাড়ায় পর্বত দূহিতারা।ঘুরলাম ,দেখলাম।কমলার বাগিচাগুলি মালিকানাধীন।প্রাচীরের বাঁধনে না বেঁধে বাগানগুলিকে উন্মুক্ত পরিবেশে রেখেছেন।তবে নজরের আড়াল যেন না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিবন্ধ।ইচ্ছে ছিল গাছ থেকে পেড়ে কমলাসুন্দরীকে আঁকড়ে ধরবো।হয় নি সে সুযোগ।থাকুক আদরে আব্দারে।শেষে পাহাড়ি টংঘরে আলতো নজর রেখে সবাইকে আমার ক্যানভাসে সেঁটে ঠেলাকুঞ্জের কমলাসুন্দরীকে বাই বাই জানিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে দিলাম।
কেবল ভাবছিলাম পাহাড়ি পরশমণির ছোঁয়া আবার পাব তো ???

রীণা দাস, শিক্ষিকা
আগরতলা,ত্রিপুরা

৫ই ডিসেম্বর ২০১৮ইং 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here