আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম কবি,নাট্যকার ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা: তাহমিনা বেগম, বাংলাদেশ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২০

আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম কবি,নাট্যকার ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা: তাহমিনা বেগম, বাংলাদেশ


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা(Federico Garcia Lorca):আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের  অন্যতম কবি,নাট্যকার ও মঞ্চ পরিচালক।১৮৯৮ সালের ৫ জুন স্পেনের গ্রানাদায় জন্মগ্রহণ করেন।বাবা ছিলেন জমিদার ও মা বিসেন্তা লোরকা রোমেরো ছিলেন একজন শিক্ষিকা।মা বিসেন্তা খুব  ভালো পিয়ানো বাজাতেন এবং লোরকা মায়ের পিয়ানো বাজানো দেখে নিজেও পিয়ানোর প্রতি অনুরক্ত হন এবং আন্তোনিও সেগুরা মেসা নামক এক সংগীতজ্ঞের কাছে পিয়ানো বাজানো শেখেন। অনন্যসাধারণ কবিতা ও নাটকের জন্য তিনি বিশ্ব শিল্পাঙ্গনে স্থায়ী আসন করে নেন।সংগীত ও চিত্রকলাতেও ছিল তাঁর বিপুল আগ্রহ। তিনি যখন কবিতা লিখেছেন, তখন তাঁর ভেতরে কাজ করেছে গানের সুর, ছবির রং। ফলে তাঁর কবিতা লাভ করেছে গীতিময়তা ও চিত্রধর্মিতা।  এমনকি তাঁর গদ্য ও নাটকও অসাধারণভাবে কাব্যগুণসম্পন্ন ও সংগীতঋদ্ধ। লিরিকই লোরকার শিল্পসত্তার মূলাধার, তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার কেন্দ্রীয় বল ও বিভা। 

লোরকাকে মান্য করা হয় বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্প্যানিশ (দেশ ও ভাষা উভয়ার্থে) কাব্যশিল্পী ও নাট্যশিল্পী হিসেবে। 

লোরকার মা যেহেতু একজন ভালো  পিয়ানো বাদক ছিল তাই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সংগীতজিন ছিল তার রক্তে। পিয়ানোর ঝংকার শুনলেই তাঁর রক্ত টগবগ করে নেচে উঠত। তিনি পিয়ানোর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেননি।  লোরকা নিজেকে ভাসিয়ে দেন দেবুসি, শোপ্যাঁ ও বিটোফেনের অমৃতরসে। তাঁর বন্ধুত্ব হয় সুরকার মানুয়েল দে ফাইয়ার সঙ্গে। আর তখন থেকে স্প্যানীয় লোকগীতি হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তাঁর কলম চিরে বেরিয়ে আসে চারুগদ্য ‘নকটার্ন’, ‘বালাদ’ ও ‘সোনাটা’। তার ওপর আরোপ করা হয় সুর। গ্রানাদায় কাফে আলামেদাতে বসত শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। সেখানে লোরকা নিয়মিত শামিল হতেন। আসর মাতিয়ে তুলতেন তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত লিরিক ঝিলিকে।

স্কুলশিক্ষা সমাপ্তির পর ১৯১৫ সালে লোরকা গ্রানাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আইন ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে। তাঁর মনে জাগে ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা। ১৯১৬-১৭ সালব্যাপী তিনি স্পেনের উত্তরে কাস্তিয়া, লেয়োন ও গালিথিয়া ঘুরে বেড়ান দন ফের্নান্দো দে লোস রিয়োস নামের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। এ অধ্যাপক তাঁকে লেখালেখিতে উৎসাহিত করেন। তার ফসল ভ্রমণবৃত্তান্ত ইমপ্রেসিয়োনেস ই পাইসাহেস বা মানচিত্র ও ভূদৃশ্যাবলি। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই (১৯১৮)। এর প্রকাশনায় অর্থ জুগিয়েছেন তাঁর পিতা স্বয়ং।

১৯১৯ সালে লোরকা মাদ্রিদে চলে যান। সেখানে কাটিয়ে দেন পরবর্তী ১৫টি বছর। তাঁর নতুন স্থান রেসিদেনসিয়া দে এস্তুদিয়ান্তে। এর সুবাদে তিনি মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে থাকেন। এবার তাঁর পাঠের বিষয় আইন ও দর্শন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন শিল্পচর্চায়। মগ্ন থাকেন অভিনয়, কবিতাপাঠ ও প্রাচীন লোকগীতি সংগ্রহে। এ সময় এল মালেফিসিয়ো দে লা মারিপোসা বা প্রজাপতির দুরভিসন্ধি নামে একটি নাটক লিখে ফেলেন। ১৯২০ সালে সেটি মঞ্চস্থ হলে ঢি ঢি পড়ে যায়। কারণ, নাটকটি ছিল প্রচলিত ঘরানার বাইরে। এটি রচিত পোকামাকড়ের জীবন নিয়ে।পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর লোককাহিনিভিত্তিক লিব্রো দে পোয়েমাস বা কবিতার বই। এতে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, একাকিত্ব ও প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ।

লোরকার ওপর ফ্লামেঙ্কো ও জিপসি সংস্কৃতির প্রভূত প্রভাব পড়েছিল। এ জন্য তাঁদের কথা ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর লেখায়। ফ্লামেঙ্কো সংস্কৃতির প্রসারে ১৯২২ সালে তিনি প্রথম ‘কান্তে হোন্দো’ বা ‘গভীর গান’ উৎসব আয়োজন করেন। স্পেনের বিখ্যাত ডিপ সং গায়ক ও পিয়ানোবাদকেরা তাতে অংশ নেন। তিনি বিশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুর দিকে যেসব কবিতা লিখেছেন, তাতে গভীর গানের আদল খুঁজে পাওয়া যাবে। লোরকা ‘সাতাশের প্রজন্ম’ নামে একটি আভাঁ গার্দ শিল্পীসংঘে যোগ দেন। এই সংঘে ছিলেন সালভাদর দালি ও লুইস বুনুয়েলের মতো জাঁদরেল শিল্পীরা, যাঁরা তাঁকে পরাবাস্তববাদ ও প্রতীকবাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।  ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কানসিয়োনেস বা গীতিমালা। ১৯২৮ সালে আলোর মুখ দেখে রোমান্সেরো হিতানো বা জিপসি গাথা। এ বই তাঁকে খ্যাতির তুঙ্গে নিয়ে যায়।

কবিতার পাশাপাশি চলে তাঁর নাট্যচর্চা। তাঁর দ্বিতীয় নাটক মারিয়ানা পিনেদা ১৯২৭ সালে বার্সেলোনায় মঞ্চস্থ হলে বিপুল প্রশংসা কুড়ায়। পরের নাটক লা সাপাতেরা প্রোদিহিয়োসা বা মুচির আশ্চর্য বিবি একটি প্রহসন। তাতে চিত্রিত নারীর প্রতি গোপন প্রণয় ও স্খলনের কাহিনি।

লোরকা ১৯২৯ সালে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। ঘুরে বেড়ান হার্লেম ও ভের্মন্টে। তিনি কলাম্বিয়া স্কুল অব জেনারেল স্টাডিজে ভর্তি হন। বিষয় ইংরেজি। কিন্তু অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন লেখালেখি নিয়ে। কিছুদিন কিউবার হাভানাতেও কাটান। নিউইয়র্কে বসে তিনি যে কবিতাগুলো লেখেন, সেসব সংকলিত হয় পোয়েতা এন নুয়েভা ইয়র্ক বা নিউইয়র্কের কবিতা গ্রন্থে।  এই গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোতে নাগরিক যন্ত্রণা ও একাকিত্ববোধ তীব্র হয়ে ফুটে উঠেছে। ‘নিউ ইয়র্ক’ কবিতায় তিনি লেখেন  ‘এক ফোঁটা হাঁসের রক্তের/ বহুগুণিতাঙ্কের নিচটাতে,...কোমল রক্তের এক নদী।/যে নদী গান গেয়ে বয়ে চলে/ মহল্লার যত শয্যাঘর একে একে পিছে ফেলে/ পিছে ফেলে নিউইয়র্কের যত নকল ভোরের/ সিমেন্ট, বাতাস, টাকাকড়ি।’ (দেবীপ্রসাদ বন্দোপ্যাধ্যায় অনুদিত)।তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ এবং এর ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা। তাঁর মনে পুঁজিবাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

১৯৩০ সালে সেকেন্ড স্প্যানিশ রিপাবলিক ঘোষিত হলে লোরকা দেশে ফিরে আসেন। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে নাট্যবিষয়ক সংস্থা ‘বাররাকা’র পরিচালক পদে নিয়োগ দেন, যার কাজ সাধারণ জনগণের জন্য নাটক প্রণয়ন ও প্রদর্শন। তিনি গ্রামেগঞ্জে গিয়ে বিনা মূল্যে নাটক দেখাতে থাকেন। নিজে নাটক পরিচালনা করেন এবং তাতে অভিনয় করেন। বাররাকারতত্ত্বাবধানে স্প্যানীয় ক্লাসিকগুলো দেখানো হয়; লোরকার নিজের নাটকগুলোও স্থান পায়, বিশেষ করে তাঁর ট্র্যাজেডিত্রয়—বোদাস দে সাংগ্রে বা রক্তবিবাহ, ইয়েরমা ও লা কাসা দে বেরনার্দা আলবা বা বেরনার্দা আলবার বাড়ি। কাব্যগুণে সমৃদ্ধ এই নাটকগুলোতে ধ্বনিত হয় বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি শ্রেণি, নারী ও যৌনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ট্যাবুশাসিত সমাজের মৌনতা ভেঙে দেন এবং সাধন করেন এক সামাজিক বিপ্লব। 

১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। লোরকা তখন তাঁর নিজগৃহ ‘কায়েহোনেস দে গারসিয়া’তে অবস্থান করছিলেন। ফ্রাঙ্কোর সৈন্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং বন্দী করে রাখে। ১৯ আগস্ট ঘাতকেরা তাঁকে কবরস্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর লাশ গুম করে ফেলা হয়। এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি তাঁর মৃতদেহের কী গতি হয়েছিল। তাঁর বই নিষিদ্ধ করা হয় ও পোড়ানো হয়। একজন মহান কবির এমন করুণ মৃত্যু এখনো পৃথিবীতে তাঁর অসংখ্য অনুরাগীকে বিষণ্ন করে তোলে। মৃত্যুর পরে তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিনাশযজ্ঞ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মনকে বিষিয়ে তোলে। কেন হত্যা করা হয়েছিল কবিকে? 

লোরকার মৃত্যু ছিল সত্যিই হৃদয়বিদারক। অতি সুদর্শন প্রগতিবাদী  প্রাণোচ্ছল সেই যুবকটি আর নেই, এ যেন এক দুঃস্বপ্নের বাস্তবতা। তাঁর মৃত্যুসংবাদে পাবলো নেরুদা অশ্রুভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘স্পেনের সেরা ফুলটি ঝরে গেল।’ 

লোরকার কবিতায় একদিকে পাওয়া যায় জিপসি গানের সুরসৌন্দর্য  ও আরব শৈলীর ঐতিহ্যবিধুরতা।  তিনি প্রতীকবাদী শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায় অঙ্কন করেন নিউইয়র্ক ও হাভানার জীবনচিত্র। একই মেজাজে আন্দালুসীয় কৃষক ও নারীজীবনকে নাট্যরূপ দেন। স্পেন ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কাব্যকীর্তি। 



তাহমিনা বেগম, বাংলাদেশ

১১ই অক্টোবর ২০২০

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here