ছোটগল্প - ‍‍ "বিষাদে বিসর্জন" .........সসীম আচার্য,ত্রিপুরা - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

ছোটগল্প - ‍‍ "বিষাদে বিসর্জন" .........সসীম আচার্য,ত্রিপুরা

প্রতি দিনের মতো‌‍‌‌ আজও চিকু আর তুনি সকাল সকাল ‌ চৌমাথার মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালের কাছে এসে বসে থাকে। গাড়ী গুলি সাঁই-সাঁই করে সামনের রাস্তা দিয়ে ছুটছে। সকাল আট-টায় ট্রাফিক সিগনাল শুরু না হওয়া পর্যন্ত ওরা এ ভাবেই বসে থাকে। লাল আলো জ্বললেই  গাড়ি গুলো একের পর এক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে চিকু আর তুনি  কাজে লেগে পড়ে ।  কাজ করতে করতে তারা বুঝে গেছে দামী গাড়ি গুলির বাবুদের মনটাও দামী থাকে, বড় থাকে। তাই বেছে বেছে ভাই- বোনে মিলে সুন্দর দামী গাড়ি গুলির সামনের দিকে তাদের ছোট ছোট হাত যতটুকু যায় ফটাফট‍্ মুছে  হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে , বাবুরা খু্শি হয়ে দশ-বিশ, কেউ কেউ অাবার বেশীও দিয়ে দেন। একবার তো এক বাবু তুনির হাতে একশ টাকার নোট দিয়ে গাল টিপে আদরও করে দিয়েছিল, অার উনার পাশে বসা দিদিমণি তুনির হাতে একটা বিস্কুটের প্যাকেটও দিয়েছিল। যারা এই পথে আসা যাওয়া করে তারা অনেকেই তুনি আর  চিকুকে চিনে নিয়েছে। লাল সিগন্যাল সময়ের মধ্যে মাত্র ২-৩টি গাড়ি মুছতে পারলেও, অন্য গাড়ির স্যার দিদিমণিরা এমনিতেই ডেকে ডেকে ওদের হাতে পয়সা দিয়ে যায়।
            এই ভাবেই চিকু আর তুনি দিনভর রোজগার করে সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে যায়। বাড়ীটাও  তাদের অদ্ভূত ,  সরকারী , খুব শক্ত পুক্ত -  রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বড়ো একটি কালভার্ট । ঝড় বৃষ্টি  কোন কিছুই তাদের বাড়ির ক্ষতি করতে পারেনা। চিকু আবার বুদ্ধি করে কালভার্টের একদিক গাছের ডালপালা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে, আর অন্য দিক, কুড়িয়ে পাওয়া ছেঁড়া ছালা দিয়ে রাতে আটকে দেয়, খোলা থাকলে তুনি আবার ভয় পায়,তাই।
           এবার নিশ্চয়ই চিকু আর তুনির  পরিচয়টা পাঠকদের জানতে ইচ্ছে করছে ! অাসুন পরিচয় করে নেওয়া যাক ।  চিকু, তুনির দাদা, বয়স দশ, আর তুনি চিকুর একমাত্র ছোট বোন, বয়স ছয়।  তুনিকে তিন বছরে রেখেই প্রথমে তাদের মা, আর বছর দেড়েক আগে তাদের বাবাও পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেয়। বাবা মৃত্যু শয্যায় চিকুকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলে ছিল - বাবা চিকু ছোট বোনটাকে দেখে রাখিস। তাকে মারধোর করিস না , কষ্ট দিস না। চিকুও চোখের জল ফেলতে ফেলতে বাবাকে কথা দিয়েছিল। তাই এখন তুনিকে নিয়ে চিকুর চিন্তার শেষ নেই।
               বাবা মারা যাওয়ার পর গত দেড় বছরে চিকু তুনিকে একটা জামাও কিনে দিতে পারেনি। একটা ছেঁড়া ময়লা জামা পরেই তুনি থাকছে, ব্যাপারটা চিকুকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। বোনটার দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। মাথার চুলগুলো শুকনো খড়ের মতো হয়ে রয়েছে , তারও একই রকম,  যেন দুভাই- বোন মাথা ভর্তি খড় নিয়েই জন্মেছে। মাথায় একটু তেল সাবান দিলেই হয়তো ....কিন্তু কি করবে , সারাদিন গাড়ি মুছে বাবুদের কাছে যা পায় সবই খরচা হয়ে যায় দুবেলা দুমুঠো খেতে। তবে তুনিকে খুশি রাখতে তুনি  যা যা খেতে ভালবাসে তাই কিনে দেয় চিকু, আর তুনি এতেই খুব খুশি।
           আজও দুজনে সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে ছোট  মোম জ্বালিয়ে সারাদিনের টাকা-পয়সা গুনতে বসে। গুনতে গুনতে চিকু একটি একশ টাকার নোট পেয়ে তুনিকে জিজ্ঞাসা করে- কি রে তুনি একশ টাকা কে দিল! কেউ কি ভুল করে দিল? না রে দাদা ভুল করে দেয়নি- বাবুটা আমার হাতে একশ টাকা দিয়ে একটা পূজোর জামা কিনতে বলল। পূজো? চিকু যেন চমকে ওঠে। ওঃ তুনি আমি তো ভুলেই গেছি দূর্গা পুজোর কথা!! বলতে বলতে চিকু ভাবনায় ডুবে যায়। মনে পড়ে বাবা যতদিন ছিলেন প্রত্যেক পূজোতেই তাদের নতুন জামা প্যান্ট দিতেন! নতুন জামা পড়ে তুনি আর সে বাবার সঙ্গে পূজো দেখতে বেরুত। বাবা বেলুন চকলেট্ ও কিনে দিত। তুনি চিকুর সে কি আনন্দ....... হঠাৎ ঢাকের শব্দে তুনি দুগ্গা ঠাকুর দুগ্গা ঠাকুর   বলে দৌড়ে কালভার্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসে- দাদা দেখে যা - দেখে যা দূগ্গা ঠাকুর নিয়ে যাচ্ছে! দুহাত তুলে তুনি চেঁচীয়ে উঠে 'দূগ্গা মাইকি জয়"। তুনির ডাকাডাকিতে চিকু বাইরে বেড়িয়ে আসে। হাত তুলে প্রণাম করে মা দূর্গাকে। যতক্ষণ ঢাকের শব্দ কানে আসে তারা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তুনি দাদার কানে মুখ লাগিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলে- দাদা আরোও দূগ্গা ঠাকুর অাসবে চল্ আমরা বসি এখানে। চিকু তুনির কাঁধে হাত রেখে বসে। ইতিমধ্যে আরো দুটি ট্রাকে ঢাক বাজাতে বাজাতে কারা যেন ঠাকুর নিয়ে চলে যায়। তুনি দূগ্গা মাইকি জয় বলে নাচতে থাকে। চিকু দুই হাঁটুতে মাথা গুজে বসে মনে মনে ভাবে - পূজোতে তুনিকে একটা জামা কিনে দিতেই হবে, না হলে উপর থেকে বাবা মনে কষ্ট পাবে।  কিন্তু কি ভাবে--- চিকুর বুকটা যেন ফেটে যায়,  দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তুনি তা খেয়াল করে দাদাকে জড়িয়ে ধরে - দাদা তুই কাঁদছিস কেনরে? চিকু- - কিছু না এমনি। তুনি--- বলনা দাদা , বলনা- কেন কাঁদছিস? চিকু চোখ মুছতে মুছতে বলে-  আমাদের ভাগ্যটা খুব খারাপরে তুনি। তুনির অবুঝ মন বুঝে না, তাই  জিজ্ঞাসা করে-- খারাপ কেন রে দাদা? চিকু--দেখিসনা  মা-বাবা দুজনেই আমাদের রেখে চলে গেছে! তুনি-- কোথায় গেছে? তাহলে তুই যে বললি ওরা মরে গেছে। দাদা তুইও আমাকে ফেলে মরে যাবি নাতো? চিকু তুনিকে জাপটে ধরে বলে--- না রে বোন আমি চলে গেলে তোকে দেখবে কে? চল্ ভেতরে চল্।
            ভেতরে এসে তুনি খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে চিকু টাকা গুনতে বসে। কাল পূজো, তুনিকে একটা জামা কিনে না দিলে বাবা কষ্ট পাবেন। চিকু গুনে দেখে,  আগের জমানো কিছু টাকাসহ মোট সাড়ে চারশো টাকা, কাল যদি আরো কিছু পায়...তুনিকে তার পছন্দ মত জামা কিনে দেবে । চিকু টাকা গুলিকে পেন্টের পকেটে রেখে শুয়ে পড়ে।
            পরদিন  চিকু তুনিকে নিয়ে শহরে যায়। শহরের বড়ো বড়ো দোকান দেখে তুনির সে কি আনন্দ , দাদার হাত ধরে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। হঠাৎ তুনি চিকুকে জিজ্ঞাসা করে- দাদা আমরা কোথায় যাচ্ছিরে? চিকু- চল্ তোকে একটা জামা কিনে দেবো। তুনি- আমাকে জামা কিনে দিবি?_তাহলে লাল জামা কিনব। চিকুও মনে মনে ভাবে লাল জামা পরলে তার বোনটাকে ভালই দেখাবে।কিন্তু মাথার উসকো খুসকো চুল গুলির কি হবে? চিকু ঠিক করে একটা সাবানও কিনবে তুনির জন্য । ভাবতে ভাবতেই তুনি চিকুকে টেনে ধরে- দাদা দেখ পুতুলটির গায়ে কি সুন্দর লাল জামা। চিকু দাঁড়িয়ে দেখে বড়ো একটি  দোকানের কাচের ভিতর পুতুলের গায়ের জামাটি সত্যিই খুব সুন্দর। তুনিকে বেশ মানাবে। তুনি- দাদা ঐ জামাটা কিনে দে না। চিকু মনে মনে ভাবে এত সুন্দর জামা !এত বড়ো দোকান ! না জানি কত হবে জামাটা! তুনিকে বলে চল দেখি ,  তুনিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে যায়, এমন সময় গেটের সিকিউরিটি তাদের অাটকায় -- এই তোরা কে রে, এখানে কি করছিস, ভাগ এখান থেকে । এখানে ভিক্ষা নেই ,যা-- । চিকু অনুনয় করে বলে- কাকু আমরা ভিক্ষা করতে আসিনি, বোনের জন্য একটা জামা কিনব, ঐ পুতুলের গায়ের লাল জামাটার মতো। সিকিউরিটি হেসে বলে - ঐ লাল জামাটা কিনবি? জানিস ওটার দাম কতো? চিকু-- কত কাকু? সিকিউরিটি - তিনহাজার টাকা আছে? চিকু- তিন হাজার!! তার কাছে তো মাত্র--- সিকিউরিটি চেঁচীয়ে বলে-- ভাগ , ভাগ এখান থেকে। এখানে জামা কিনতে হলে সাতবার তোর জন্ম নিতে হবে, যা যা সামনে থেকে সরে দাঁড়া। চিকু সরে দাঁড়িয়ে জামাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনটা খারাপ হয়ে যায় ,না: হবে না । তুনিকে বলে চল আরেকটা দেখি। সামনের দিকে এগোয় দুজনে । আবার তুনি চিকুকে টেনে ধরে - দাদা ঐ দ্যাখ আরেকটা লাল জামা ।  সামনের দোকানটায় আরেকটা লাল জামা দেখে চিকু তুনিকে নিয়ে দাঁড়ায়। তুনিকে বলে--তুই দাঁড়া আমি জামাটার দামটা জেনে আসি। চিকু ভয়ে ভয়ে গেটের দিকে এগোয়, কিছু বলবার আগেই সিকিউরিটি লাঠি উচিয়ে তেরে আসে। চিকু তুনিকে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে আসে। তুনির অবুঝ মন চিকুকে জিজ্ঞাসা করে- দাদা ওরা আমাদের জামা কিনতে দেয় না কেন? মারতে আসে কেন? চিকু কোন উত্তর দেয় না, তুনিকে নিয়ে ফিরে আসে। চিকু বুঝতে পারে তাদের ময়লা ছেঁড়া পোষাকের জন্যই তাদের দোকানে ঢুকতে দেয়নি কাকুটা।
              চার দিকে মাইক ঢাকের শব্দ।আলোর রোশনায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। তুনি বায়না ধরে পূজো দেখবে। চিকু জানে, তাদের পূজোর পেন্ডেলেও কেউ ঢুকতে দেবে না, তাড়িয়ে দেবে। সবাই যখন দল বেধে রাস্তা দিয়ে পুজো দেখতে যাচ্ছে , চিকু তুনিকে নিয়ে কালভার্ট  এর উপরে উঠে বসে। তুনিকে মাথায় আদর করতে করতে বলে- তুনি আমাদেরও একদিন অনেক টাকা হবে, আমরাও বড়ো লোক হবো! তুনি মুহুর্তে  দেরী না করে বলে-- দাদা তখন অামাকে ঐ লাল জামাটা কিনে দিবি? চিকু বুঝতে পারে,  তুনি ঐ জামাটাকে এখনো ভুলতে পারেনি। মনে যন্ত্রণা নিয়ে বলে- তখন তো তুই অনেক বড়ো হয়ে যাবি, শাড়ি পরবি। অামি তোকে লালটুকটুকে একটা শাড়ি কিনে দেব। তুনি- আমি শাড়ি পরবো? তাহলে তো আমি অনেক বড়ো হয়ে যাব দাদা!
চিকু-- হ্যাঁ রে তখন তুই অনেক বড়ো হয়ে যাবি।
আদরের বোনটা যে একদিন দূরে চলে যাবে তা ভেবে চিকুর মনটা উদাস হয়ে যায়।
            দেখতে দেখতে পূজার তিনদিন কেটে যায়। আজ দশমী। চিকু ঠিক করে আজ তুনিকে নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বসবে যেখানে দূর্গা ঠাকুরের বিসর্জন হয়, ওখানে কেউ তাদের তাড়িয়ে দেবে না। সেই মতো চলে যায় বিসর্জন দেখতে। ঢাকের তালে তালে তুনিও নাচে। চিকু তার আনন্দ আরো দ্বিগুন করে দেয় একটা বেলুন কিনে দিয়ে। সকাল থেকে অনেকগুলি প্রতিমা বিসর্জন দেখে দেখে তুনি ক্লান্ত হয়ে পরে। খুব খিদে পায়। চিকু তুনির পছন্দের চাউমিন কিনে দেয় । নিজেও খায়। খাওয়া হয়ে গেলে তুনি বায়না ধরে আর ভাল লাগছে না এবার  ঘরে ফিরবে।   চিকুর হাত ধরে টানতে থাকে তুনি। চিকু তুনিকে নিয়ে ঘরের দিকে হাটতে থাকে।  কাছাকাছি আসতেই চিকু চমকে ওঠে ! একী অনেকগুলো লোক মিলে তাদের ঘরটিকে  ঠেলে ঠুলে গাড়িতে তুলছে। চিকুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে! দৌড়ে যায় - ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে তাদের জিনিস গুলি। তুনি কুড়িয়ে নেয় তার খেলনা পুতুল আরো কতকি। ততক্ষনে  গাড়িতে কালভার্ট উঠিয়ে লোকগুলি চলে যায়।  চিকু তুনির হাত ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষন। তার চোখ দিয়ে টপ্ টপ্ করে জল  পড়তে থাকে। তুনির ডাকে হুঁস ফিরে-  দাদা ওরা আমাদের ঘরটি কেন নিয়ে গেল? আমরা এখন কোথায় থাকবো? চিকু কোন উত্তর দেয় না। তুনির হাতটা শক্ত করে ধরে থাকে।  তুনি  - বল্ না দাদা আমরা কোথায় থাকবো? কোথায় থাকবে চিকু নিজেও তো জানে না । চোখের জল মুছতে মুছতে চিকু তুনিকে নিয়ে হাঁটতে থাকে, কোথায় যাবে, সেও জানে না---। ততক্ষনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারদিকে আলো জ্বলে উঠেছে। দূরে বিসর্জনের পর কারা যেন ঢাকের তালে তালে গাইছে --- "আমি ডাকি মা মা -- মাতো কিছু শোনে না" --- আকাশে ততক্ষনে তারার দল ফোটে উঠেছে -- আর দুদিন পরই পূর্ণিমা, তাই একফালি চাঁদও আকাশে উকি মেরেছে। চার দিকের আলোর মধ্যেও চিকু- তুনির পথটা যেন ক্রমশ অন্ধকারে হারিয়ে গেছে--- নিস্তেজ- নিস্তব্ধ---


সসীম আচার্য,ত্রিপুরা


১২ই নভেম্বর ২০২০
 

1 টি মন্তব্য:

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here