Type Here to Get Search Results !

খনা চরিত" ...কিংবদন্তী খনার জীবনী নির্ভর অসাধারন এই নাটকের শেষ দুই দৃশ্য।।নাট্যকার- রবিরশ্মি ঘোষ,সিডনি

মুখবন্ধ: খনা কিংবদন্তীর অন্তরাল থেকে উঠে আসা বিস্মৃতপ্রায় এক নাম। ইতিহাসের কাছে তার থাকার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। শুধু লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে তার বচন। সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের জন্য বলে যাওয়া কিছু কথা। এমন কথা যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে চলতে সাহায্য করে। সময়ের ধারা বেয়ে তার রূপ পরিবর্তন হয়েছে, অনেক কিছু তার মধ্যে এসে মিশে গেছে। আজকের যুগের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তার অনেক কিছুই খেলো মনে হয়। তবু কিছু বচন আছে যা কৃষিভিত্তিক এবং হয়ত আজ ও কৃষক দের কাছে তার কিছু গুরুত্ব থাকতে পারে। সেই বচনের দায়বদ্ধতা আমার না। আমার বিনীত প্রয়াস শুধু প্রাচীন বাংলার আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক বিদুষী নারীর অস্তিত্বের লড়াই কে তুলে ধরা। যে সেচ্ছায় নিজের বাকরুদ্ধ করেছিল তার কথা কে গল্পের ছলে সবার কাছে নিয়ে আসা। যে বচনকে তখনকার সমাজ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল, সেই বচন সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও কিছু অংশে বেঁচে আছে। এটাই হয়ত সেই অভিমানীনির বড় প্রাপ্তি। হয়ত এটাই সে চেয়েছিল।

# শেষ দুই পর্ব


দৃশ্য ১২


(মিহির ঘরে একা| খনার প্রবেশ|)

খনা: কি ব্যাপার? আজ একাকী ঘরের ভিতর?
(মিহির উত্তর দেয় না|)
খনা: কি হয়েছে? উত্তর দিচ্ছ না কেন? কোন প্রকার ক্লেশ না কি কোন অসুস্থতা?
মিহির: তোমার সঙ্গে বিশেষ কিছু বার্তালাপ আছে|
খনা: কিছু অমঙ্গল সূচক ঘটেছে কি? তোমার অভিব্যক্তি আজ এরকম কেন?
মিহির: অমঙ্গল এখনো ঘটেনি তবে ঘটনার গতিপথ যেভাবে চলেছে তাতে অমঙ্গল শীঘ্রই ঘটবে কিছু|
খনা: তার মানে কি?
মিহির: তার মানে তোমার অজ্ঞাত নয় খনা| আমি দেখতে পাচ্ছি উর্ণনাভ যেমন তার জাল বিস্তার করে তেমন ভাবে তুমিও তোমার জাল বিস্তার করছ|
খনা: (বিস্মিত) জাল বিস্তার আমি.... কি ভাবে? এই চিন্তা তোমার মনে উদয় হল কি ভাবে?
মিহির: এ নিছক আমার মনোদ্ভূত ধারণা নয় খনা| এর দৃঢ় ভিত্তি আছে|
(অল্পক্ষণ নির্বাক থেকে) তুমি জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ কর খনা|
খনা: কি বলছ? জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ করব কেন? এখন তো স্বয়ং আচার্য দেব ও আশীর্বাদের হাত রেখেছেন মাথার ওপর| তাহলে জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ করব কেন?
মিহির: আশীর্বাদের হাত রেখেছেন আর সেই হাত কেই তুমি দংশন করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত| কি ক্ষতি করেছেন পিতা তোমার যে তুমি এই ধংসাত্মক কার্যে মেতেছ?
খনা: আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না| কোন ধংসাত্মক কার্যের কথা বলছ তুমি?
মিহির: জেনেও অজ্ঞানের ভান কর না খনা| তুমি ধীরে ধীরে মহারাজের মনে পিতার সম্বন্ধে বিরূপ ধারণার সঞ্চারণ করছ|আমাকে তো বহু আগেই তোমার পথের থেকে সরিয়ে দিয়েছ কিন্তু আমি কিছু বলিনি| কিন্তু পিতার যদি কোন ক্ষতি হয় তাহলে আমি সহ্য করব না খনা|
খনা: তোমাকে আমি সরিয়ে দিয়েছি? যা কিছু করেছি সবই তোমার জন্য| তোমাকে জানাই যে সিংহলে রাষ্ট্র বিপ্লব নিছকই অজুহাত ছিল| আমি তোমার ভাগ্য গণনা করে জেনেছিলাম যে বঙ্গ দেশেই তোমার পরিবারের সাথে পুনর্মিলন ঘটবে| তাই নিজের দেশ ত্যাগ করে আমি তোমাকে নিয়ে এই বঙ্গ দেশে পদার্পণ করি| আর আচার্যদেবের ক্ষতি আমি কেন করব? কি ভাবেই বা তা সম্ভব? তিনি সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন| আমার কি ক্ষমতা তার ক্ষতি করার আর আমি সে প্রয়াসই বা করব কেন? তিনি তো আমারও পিতৃতুল্য|
মিহির: খুব সহজ ব্যাপার খনা| পিতার গণনা কে বারম্বার ভুল প্রমাণিত করে তুমি তার স্থান লাভ করতে সচেষ্ট|
খনা: তাঁর গণনাকে ভুল প্রমাণ করা? বারম্বার? সে আমি শুধু একবারই করেছি মিহির| তাও শুধু তোমার জন্য| তুমি কি বুঝতে পারছ না যে সেদিন তাঁর গণনা ভুল প্রমাণ না করলে আজকে তুমি তোমার পিতা কে পেতে না?
মিহির: সে কার্য তো সম্পন্ন হয়েছে| এখন আর তোমার জ্যোতিষ চর্চার কি প্রয়োজন? যে পিতা কে এত কষ্টে পেয়েছি তাঁকে আর হারাতে চাই না| তাই এইটুকু দয়া কর আমাকে| জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ কর|
খনা: আর যদি জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ না করি?
মিহির: তাহলে তোমাকে আমি ত্যাগ করতে বাধ্য হব|
খনা: (দু হাতে দুই কান চাপা দিয়ে)একি শুনলাম আমি হায়? একথা উচ্চারণ করতে পারলে তুমি? একবারও ভাবলে না যে তোমার জন্যই সর্বস্য ত্যাগ করে বঙ্গ দেশে এসে প্রতিনিয়ত তোমাকে তোমার পিতা মাতার সাথে মিলাবার প্রচেষ্টাই করে গেছি?
মিহির: আমি ছোট থেকে পিতা মাতার সাহচর্য থেকে দুরে বড় হয়েছি| এ বিষম জ্বালা তুমি বুঝবে কি ভাবে? এখন তাদের পেয়ে আর হারাবার অভিপ্রায় নেই| তাই যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে তোমাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হব| সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দিও না খনা| জ্যোতিষ চর্চা ত্যাগ কর|

(মিহির ঘর থেকে নিস্ক্রান্ত হয়| খনা হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে এবং ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পরে|)
 
দৃশ্য ১৩

গান:
রুঠ গয়ে প্রীতম হমার|
যাহার লাগি চিত করিণু অর্পণ
প্রেম প্রীত সব করিণু তর্পণ,
আজু রুঠ গয়ে প্রীতম হমার |
ঝর ঝর আজি ঝরত বারিধারা,
কন্ঠ রুদ্ধ আজু নয়ন বাকহারা,
আজু রুঠ গয়ে প্রীতম হমার|
অবহুঁ আউর না সহিবারে পারি
বুলাও মোহে অব মোরে গিরিধারী,
রুঠ গয়ে প্রীতম হমার |

(খনা রাধা গোবিন্দের বিগ্রহের সামনে অর্ধ মুর্ছিতার মত পড়ে|)

খনা: (বিগ্রহের দিকে চেয়ে) হে মাধব এ কি হল? যার জন্য সব কিছু ত্যাগ করলাম সেই দিল এত বড় আঘাত?
আমি তো শুধু ওর মঙ্গল কামনাই করেছিলাম| যা কিছু করেছি সব ওকে ওর হারানো শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, ওকে ওর পিতা মাতার বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য|ও কেন আমাকে ভুল বুঝলো?
কিন্তু কাকে প্রবোধ দিচ্ছি আমি? আমি খনা| আমার গণনা অভ্রান্ত| ভবিষ্যত প্রজন্ম প্রশ্ন করবে আমি কি নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে অক্ষম ছিলাম?
জেনে রেখো অনাগত ভবিষ্যতের প্রজন্ম, খনা নিজের ভাগ্য নির্ধারণে অক্ষম ছিল না| খনা জানত যে তার স্বামী একদিন তাকে ভুল বুঝবে, একদিন সে মুখ ফিরিয়ে নেবে| তবু কেন, কেন জেনেশুনে এই গরল পান?
একি তবে নির্বুদ্ধিতা? না কি ভালবাসা?
যেদিন থেকে সেই অনাথ কিশোর কে হৃদয় দিয়েছিল খনা, সেদিনই গরলের পাত্র এঁকে নিয়েছিল নিজ ললাটে| না নীলকন্ঠ, তুমি একা নও| জেনেশুনে খনাও বিষপান করেছিল সেদিন|
সে বিষের পাত্র ঋণ হয়ে ছিল এতদিন| আজ এসেছে দিন, সে ঋণ শোধ করবার| খনার কন্ঠ হবে চির কালের জন্য রুদ্ধ| কিন্তু খনার বচন? তার গতি কে রোধ করবে? সে আজ আকাশে বাতাসে অনুরণিত হচ্ছে|
(নেপথ্যে খনার বচন বহু কন্ঠে|)
ওই তো শুনতে পাই জনগণেশের কলরব| কে করবে এদের কন্ঠরোধ? বাঁধভাঙ্গা প্রবল জলস্রোতের মত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অত্যাচারীর মানদন্ড, ভেঙ্গে চুরমার করে দেবে শুষ্ক বিচারের পাষান প্রতিমা|
হবে| সব হবে| শুধু থাকবে না খনার কন্ঠ| চিরতরে হবে সে রুদ্ধ|যে জিহ্ভা সকল কলহের কারণ সেই জিহ্ভা আজ করব ছেদন|
হে মহাকাল তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক তবে|

(খনা কতৃক নিজ জিহ্ভা ছেদন| খনা মূর্ছিত হয়ে পরে|)
(কিছু পরে বরাহ পন্ডিতের প্রবেশ|)
বরাহ পন্ডিত: খনা, খনা মা তুমি কোথায়? অতি সুখবর আছে যে| মহারাজ চক্রকেতু তোমাকে রাজ জ্যোতিষী পদে নিয়োগ করেছেন| এবার আমি নিশ্চিন্তে অবন্তী নগরে ফিরে যেতে পারব| বঙ্গ দেশের জ্যোতিষ এখন নির্ভরযোগ্য হস্তে|
কোথায় খনা মা? (ভূলুন্ঠিত খনার দিকে চোখ পরে) একি?
(কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে) মা একি হল? একি করলি মা?
(বরাহ পন্ডিতের কন্ঠস্বর শুনে মিহির এবং সরমা দৌড়ে এসে ঢোকে)
বরাহ পন্ডিত: একি করলি মা? নিজেকে এই দণ্ড কেন দিলি? কেন কন্ঠরোধ করলি নিজের? খনার বচন কি তবে আর শোনা যাবে না? হারিয়ে যাবে চিরতরে এই পৃথিবী থেকে?
(নেপথ্যে বহু কন্ঠে খনার বচন শোনা যায়)
না না তা কেন? ওই তো শোনা যায় বহুকন্ঠে খনার বচন| না না হারিয়ে যাবে না| যতদিন বঙ্গ দেশের মাটিতে কৃষক ধান চাষ করবে, যতদিন মাঠে রাখাল ধেনু চরাতে যাবে, যতদিন এ নদীপথ বেয়ে মাঝি নৌকা বেয়ে যাবে, যতদিন শাপলা ফুলে ভরা ওই দীঘির ওপারে সূর্যোদয় হবে, ততদিন আকাশে বাতাসে অনুরণিত হবে আমার খনা মায়ের বচন|
(নেপথ্যে খনার বচন আরো জোরে শোনা যায়)

(যবনিকাপাত)

=========================================



রবিরশ্মি ঘোষ, অস্ট্রেলিয়া 

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৯

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.