চলো ঘুরে আসি নীলাকুরুঞ্জী ফুলের পাহাড়" ------ সবুজে ঘেরা পাহাড়ের সৌন্দর্য বর্ণনায় রীণা দাস, ত্রিপুরা - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

চলো ঘুরে আসি নীলাকুরুঞ্জী ফুলের পাহাড়" ------ সবুজে ঘেরা পাহাড়ের সৌন্দর্য বর্ণনায় রীণা দাস, ত্রিপুরা

(প্রথম পর্ব)

ঘুরবো বললেই ঘোরা হয় না,দেখবো বললেই দেখাও হয় না।এও সময়ের ডাক বটে।পরিকল্পনা করেও অনেক সময় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।যাই হোক আমাদের এ বারের যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল এক আর মাঝপথে তা হয়ে গেল আরেক।উদ্দেশ্য ছেলের সংসারে যাওয়া,গেলাম।তারপর ছেলের অন্যত্র যাওয়ার ডাক আসায় আমাদের ডাকও অন্যদিকে মোড় নেয়।সংসার বৈরাগ্য মানুষ আমি।পছন্দ নয় অহেতুক চার দেয়ালে বন্দী জীবন যাপন।
মন বলছিল ---" সে যে পথের চির পথিক
                   তার কি সহে ঘরের মায়া?
                    দূর হতে যা দূরান্তরে
                    ডাকে তারে পথের ছায়া।"-----রাতারাতি প্ল্যান হলো----চলো উটি।নীলগিরী পাহাড়ের রাণী উটি।মূহুর্তের মধ্যে পাহাড়ি ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলো।এ এক যন্ত্রণা,সংসারে মন টেকে না যাদের,সংসার ফাঁকি দিয়ে পালাতে চায় কেবল দেখার নেশায়।
সে দিনটি ছিল 7th Aug 2019.ঘন শ্রাবণ মাস।বর্ষার বাড় বাড়ন্ত।ছেলেকে পুণের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দিয়ে আমরাও তৈরী।বেরিয়ে পড়লাম।ছেলের কাছে কোয়েম্বাটুরে স্টে করেছিলাম।উবের নিয়ে চলে গেলাম সোজা নিউ বাস স্ট্যান্ড,সাঁই বাবা কলোনী।ছেলে বলেছিল ছোট গাড়ি নিয়ে যেতে।মাত্র তো 85 km.সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা।
সফরে আমরা দুজন,কর্তা গিন্নী।ছেলে বললেও চেপে গিয়েছি ছোট গাড়ির বিষয়।একে তো খরচের বহর,সাড়ে তিন হাজার টাকা নেবে বললো ।তার চেয়েও বড় ভাবনার বিষয় ,এই বয়সে এসে বিশেষ।করে সংসার যাপনের কয়েক বছরের মাথায় স্বামী স্ত্রী যতই প্রেমাতুর হোক না কেন,তাদের প্রেম উড়ে যাবেই সংসারের দাপুটে ভূমিকায়।আর বাকীটা ব্যাখ্যাতীত।তাই ছোট গাড়ির ভাবনাকে গুডবাই জানিয়ে বাসের কাছেই গেলাম।মনে হলো বাসের ভিড়াভিড়িতে উড়ে যাওয়া প্রেম যদি ফিরে আসে।কারণ বাসে লোক সমাগমে তর্ক বিতর্কের কোন অবকাশ বা সুযোগ থাকে না।
বাস কাউন্টারে গিয়ে পঁচাত্তর টাকা করে দুটো টিকিট কেটে বসে পড়লাম।শুরুতেই বাজিমাৎ।কোথায় সাড়ে তিন হাজার আর কোথায় দুটো টিকিটে দেড়শ টাকা।গাড়িতে জনা সাতেক যাত্রী।সময় হয়ে গেল 9.45 a.m ।গাড়ি স্টপেজ ছাড়লো।শনশন করে ছুটছে রোডের বাস মেট্টোপালায়াম রোড ধরে।শুনেছি মেট্টোপালায়ামকে উটির প্রবেশদ্বার বলা হয়। আমাদের মঞ্জিল উটি,ছুঁয়ে যাবে কুন্নুর,গুডুলুর।
মেট্টোপালায়াম পর্যন্ত শহুরে ছোঁয়া।চোখ ঘুরপাক খাচ্ছিল নীলগিরীর জন্য।যত এগুচ্ছি আবছা হয়ে সুমুখে আসতে শুরু করল পাহাড় তার রূপের ডালি নিয়ে।মাঝে মাঝে গাছ গাছালি আড়াল করছিল যদিও ,তবু সে বাঁধা আর বেশিক্ষণ টেকে নি।ধীরে ধীরে গাড়ি চড়াইয়ের মুখে বাঁকে গিয়ে পড়ল।সে এক অপূর্ব দৃশ্য,যা অনাবিল আনন্দের খোরাক।পথের বাঁক দেখে মনে হচ্ছিল একই জায়গায় আমরা ঘোরপাক খাচ্ছি।আবার সোঁ করে হঠাৎ উপরেও উঠে যাচ্ছি।নীচে চলতি গাড়িগুলোকে মনে হচ্ছিল বাচ্চাদের খেলনা গাড়ি।এমনি করে পাহাড় চড়তে চড়তে হঠাৎ করে নীচে চোখ পরতেই দেখি কোয়াম্বাটুর শহরটা পাহাড়ের নীচে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।পাহাড়ের বুক চিড়ে যত উপরে উঠছি তত মন সবুজে আচ্ছন্ন হতে লাগল।মন হারিয়ে যায় ওই গভীর সবুজ বনে।জগতের মায়া মোহ সব শুষে নেয় পাহাড়ী জঙ্গলের গভীরতা।পাহাড়ের ঘন বনানীর বুকে মেঘেরা চুপটি করে শুয়ে,আবার কখনো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে কোন ঠিকানায় ,কে জানে।।নিজেদের অবস্হানও মেঘেদের কোলেই,ভেবে মনটা কেমন শিনশিন করে উঠল।ছুঁয়ে যাচ্ছে অথচ ছুঁতে পারছি না।যেন স্বর্গের দরজা খোলা ,কেবল পা রাখতে না পারার যন্ত্রণা ।প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্যে দৃষ্টি পরা মাত্রই প্রকৃতির সাথে একটা সম্বন্ধ তৈরী হয়ে যায়।জগতের অসাড়তা এমন সময়েই সত্য হয়ে ফুটে উঠে।তাকালাম পাশে বসা ভদ্রলোকটির দিকে।দেখি চোখ বন্ধ।আশ্চর্য হই নি।জগতের সব স্বাভাবিক।যাদৃশী দৃষ্টি তাদৃশী সৃষ্টি।দৃষ্টিতেই নিবন্ধ সব।মাঝে মাঝে পাহাড়ের গহীন থেকে জনমানবের আলাপন ভেসে আসে।আবার শূণ্যতা।পাহাড় আর পাহাড়।প্রশ্ন জাগে কেমন করে তারা পাহাড়ে ঘর সাজায়? কাদের সাথে তাদের সখ্যতা?সারাদিন কাদের সাথে বার্তালাপ হয়,নাকি নীরব কথাই হয় সবুজের সাথে ?ভাবতে ভাবতে ঘোর লেগে যায়।নেশা কাটতে চায় না।না জানি কতকাল এই বন পাহাড় একই রকম আছে।সারা পাহাড় জুড়ে নাম না জানা সাত রঙা ফুলের বাহার।এদের কোন মালী নেই।মালীহীন এরা নিজেই নিজের মত করে পাহাড়কে ফুলে ফুলে আর বাহারী পাতাতে সমৃদ্ধ করে রেখেছে।
দেখতে দেখতে ছোট ছোট গ্রাম পেছনে ফেলে কুন্নুর ছুঁয়ে 7,460 ft উচ্চতাসম্পন্ন উটিতে পৌঁছে গেলাম।পাহাড়ের রাণী ।সাইনবোর্ডগুলোতে লেখা উধাগামন্ডলম /উটকামন্ড।এই নামগুলো নাকি বৃটিশ আমলের।বৃটিশরাই এর সৌন্দর্য্যকে মহিমান্বিত করার জন্য উটকামন্ডের আদুরে নাম দিয়েছিলেন উটি।
বাসে বসেই দেখছিলাম সুবিস্তীর্ণ অবিন্যস্ত উপত্যকা জুড়ে উঁচু নীচু সবুজ ভূমি একটির উপর একটি যেন উঁকি দিয়ে আছে।এর ধাপে ধাপে ফুলের ঝাঁপি নিয়ে ঘরগুলো থরে থরে দাঁড়ানো।
আমরা স্টে করবো উটকামন্ডের একটা হোম স্টে তে।নামব এবার তার উদ্দেশ্যে।

.............. ক্রমশ

রীণা দাস,শিক্ষিকা
আগরতলা,ত্রিপুরা

৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner