Type Here to Get Search Results !

ইচ্ছামতীর পাড়ে পাড়ে, টাকি ঃ অসাধারণ একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বর্ণনায় শিউলি চক্রবর্তী,ত্রিপুরা

ঘুরে ঘুরে বেড়ানোই আমার আর আমার স্বামীর নেশা।   সবাই বলে পায়ে চাকা লাগানো আছে আমাদের । সে - যে যাই বলুক বছরে দু- তিনবার ঘর থেকে না পালালে আমাদের স্বস্তি নেই। ২০১৮ সাল।  আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলকাতা যাত্রা। কিন্তু শুধু বিয়ে অ্যাটেন্ড করেই ফিরে আসব?  একটু ঘুরব না?  একদিনই সময় -- কারণ পরদিনই আগরতলা ফেরার টিকিট। 

ইচ্ছামতী নদী। নামটা প্রথম শুনেছিলাম সেই কলেজে পড়ার সময়। তখন থেকেই মনের সুপ্ত কোনে ইচ্ছে ছিল এই নদীর পাড় ধরে বেড়ানোর। দাদা বললেন ---"ইচ্ছামমতী নদী যদি দেখতে যাও তবে অবশ্যই টাকি যাবে।" দাদার কথা শুনে   মনস্থির করে ফেললাম  কর্তা- গিন্নী। 

কলকাতা থেকে টাকির দূরত্ব আটষট্টি কিলোমিটার। আমরা গড়িয়াহাট বেদুইন হোটেল থেকে সকাল আটটা নাগাদ রওয়ানা দিলাম টাকির উদ্দেশ্যে। দমদম পার হয়ে নিউব্যারাকপুর বারাসত হয়ে ছুটতে থাকে আমাদের গাড়ি।  শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনেও টাকি যাওয়া যায়। আবার এস্প্যালেন্ড থেকেও গাড়িতে যাওয়া যায় টাকি। যাইহোক মোটামুটি তিনঘণ্টা পর আমরা গিয়ে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। 

প্রথমেই চলে যাই ইচ্ছামতীর রাজবাড়ী ঘাটে।   অবাক হয়ে যাই নদীর বিস্তৃতি  দেখে। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। নদীর ওপারেই বাংলাদেশ। তাই নদীতে ভ্রাম্যমাণ ভারতীয় নৌকাতে সবসময় ভারতের জাতীয় পতাকা  লাগানো থাকে। ঘাটের পাশে একটি হোটেলে মধ্যাহ্ণ ভোজন সেরে রওয়ানা হলাম টাকি দেখার উদ্দেশ্যে। নিতান্তই ছোট্ট শহর। বসিরহাট মহকুমা শহর আর হাসনাবাদের মাঝেই হল টাকি শহর। শহর ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে গেলেই চোখে পড়বে বেশ কিছু ঐতিহ্য মন্ডিত পুরনো বাড়ি।  বাঁধানো ঘাট যুক্ত পুকুর, সুপারি গাছের সারি,আর আমবাগান সহ বাড়িগুলি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে  জমিদার বাড়ির স্মৃতি ।মা দুর্গার আগমনে প্রবাসী বাসিন্দাদের আগমনে সচল হয়ে উঠে এই বাড়িগুলো।  ঠাকুরদালানে তখন বেজে ওঠে শঙ্খ ধ্বনি,  বাজে কাসর - ঘন্টা আর মেলামেশা ঘটে  স্থানীয় লোকদের সাথে। বছরের অন্যান্য সময়  বাড়িগুলো সাধারণত ভাড়া দেওয়া হয় বাংলা সিনেমা আর সিরিয়ালের স্যুটিং এর জন্য। 

নৌকা ভ্রমণেরও সুযোগ আছে ইচ্ছামতী  নদীতে। এই ইচ্ছামতী নদীর অর্ধেক পড়েছে বাংলাদেশে আর অর্ধেক পড়েছে ভারতে।  নৌকা ভ্রমণের সময় বাংলাদেশকে দেখা যায় আরও কাছ থেকে। ইচ্ছামতী নদীতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন  টাকীর মানুষদের কাছে একটি বড়ো উৎসব। নৌকা করে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় নদীর মাঝখানে। সাথে সাথে বাজতে থাকে বির্সজনের বাজনা অন্য নৌকায়। বির্সজন দেখতে বাংলাদেশ থেকেও নাকি লোকের আগমন ঘটে। 

পুরনো একটি রাজবাড়ীরও দেখা মিলল টাকীতে। তবে এটাকে অবশ্য এখন আর রাজবাড়ী না বলে এর ধ্বংসাবশেষই বলা চলে। ঠাকুর দালানের পাশে পুরনো বটগাছটি ঝুড়ি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে কত বছর ধরে কে জানে। যেন প্রহরীর কাজ করে চলেছে। 

ত্রিপুরার মতো টাকীতেও আছে ভারত - বাংলাদেশ বর্ডার। "আপনাদের কাছে  ছবিসহ পরিচয় পত্র থাকলে মিনি সুন্দরবন দেখতে পারবেন। এখানের ভারত - বাংলাদেশ বর্ডারে মিনি সুন্দরবন আছে " -- জানাল আমাদের  ড্রাইভার। আমরা দুজনেই একসাথে বলে উঠলাম --" সব আছে, তুমি নিয়ে চল আমাদের।"   প্রবল  উৎসাহে  এগিয়ে চলল আমাদের টমটম। রাস্তার দু- ধারে গ্রামের বাড়িঘর, ছোট্ট খেলার মাঠ, ফুল - ফলের গাছ সব ছাড়িয়ে টমটম এসে থামল একটি পুলিশ চৌকির সামনে।  বলল -- "আর যেতে পারব না বাবু। এবার আপনাদের হেঁটে যেতে হবে।" কর্মরত বি.এস.এফ জওয়ানরা আমাদের পরিচয়পত্র রেখে  অনুমতি দিলেন জঙ্গলে যাবার। 

সামনেই মোটামুটি ঘন  জঙ্গল। লম্বা, বেঁটে বিভিন্ন ধরনের গাছ, বাঁশঝাড় পার হয়ে আবার নজরে এল ইচ্ছামতী নদী। জানা অজানা গাছপালা,ঝোপঝাড় সবকিছু মিলিয়ে মিনি সুন্দরবনই  বটে। নদীর এপার থেকে দেখা যাচ্ছে ওপার বাংলার ঘর বাড়ি। মনটা কেমন করে উঠল। আসলে বাংলাদেশের সাথে নাড়ীর টান ত্রিপুরার প্রতিটি মানুষের।  চেয়ে দেখি আমাদের মত আরও অনেকেই এসেছেন  মিনি সুন্দরবন  দেখতে। এই মিনি সুন্দরবনে জঙ্গলে নদী  আছে, গাছ আছে, পাখির কলরব আছে কিন্তু নেই কোনো জন্তু- জানোয়ার।  ফলে শহরের ব্যাস্ততম জীবনের বাইরে শীতের রোদ গায়ে মেখে  ইচ্ছামতীর পাড়ে পাড়ে, বন- জঙ্গলে, কোলাহল মুক্ত, দূষণ মুক্ত পরিবেশে কম খরচে বন্ধু - বান্ধব,  পরিবার পরিজন নিয়ে নিশ্চিন্তে প্রকৃতির সাথে সময় কাটানোর জন্য খুবই ভালো জায়গা এই মিনি সুন্দরবন। 

সূর্যদেবের    বিদায়   নেবার সময়  হয়ে এসেছে। বি .এস.এফ   জওয়ানরাও তাড়া লাগাচ্ছেন।  তাই বাধ্য হলাম ফিরে আসতে। আবার সেই  পুলিশ চৌকি। বি.এস. এফ জওয়ানদের কাছ থেকে আমাদের গচ্ছিত পরিচয়পত্র নিয়ে ফিরে চললাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। পেছনে পড়ে রইল ইচ্ছামতীর মুক্ত বাতাস আর মিনি সুন্দরবনের  পাখির কলরব। 


শিউলি চক্রবর্তী

ত্রিপুরা


আরশিকথা ভ্রমণ বিভাগ


ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

৮ই জানুয়ারি ২০২২


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.