"শিশুশিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা ভাবনা"......এই প্রসঙ্গে আরশি কথা'য় লিখলেন ড আশিস কুমার বৈদ্য - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

"শিশুশিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা ভাবনা"......এই প্রসঙ্গে আরশি কথা'য় লিখলেন ড আশিস কুমার বৈদ্য

প্রথম কথাই হলো - শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হতে হবে। আর এজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাও তৈরী রাখতে হবে। প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর বৌদ্ধিক বিকাশ, দৈহিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ, সমাজের সঙ্গে সঙ্গতি সাধনের যোগ্যতাসম্পন্ন করে তোলা, প্রাক্ষোভিক স্তরের উন্নয়ন সাধন, নৈতিক মূল্যবোধের সৌজন্যবোধের শিক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষসাধন, কর্মসম্পাদন ক্ষমতার বিকাশ, সৃজনী শক্তির উন্নয়ন, সুঅভ্যাস গঠন, জীবন সংগ্রামের উপযোগী করে গড়ে তোলা, সেবামূলক কর্মপ্রবাহের সঙ্গে পরিচয় প্রদান, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ তৈরী করা, কুসংস্কার থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা, মানবতার শিক্ষায় দীক্ষিত করা প্রভৃতি। প্রাথমিক শিক্ষা সম্বন্ধে শিক্ষাবিদগণ নানা কথা বলেছেন। সারকথা হলো - "কোন ব্যক্তিকে সমাজে সন্তোষজনক ও দায়িত্বশীল নাগরিক জীবনের জন্য যে শিক্ষা অপরিহার্যরূপে গ্রহণ করতে হয় তারই প্রাথমিকস্তরকে প্রাথমিক শিক্ষা বলা হয়।" ফলে এই স্তরের শিশু-শিক্ষার্থীকে শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষালয়ে নির্দিষ্ট কিছু সময় উপস্থিত থেকে শিক্ষাগ্রহণ বাঞ্ছনীয়।
শিশুশিক্ষা বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বলেছেন -"শিক্ষা জিনিষটা জৈব, যান্ত্রিক নয়। এর সম্বন্ধে কার্যপ্রণালীর প্রসঙ্গ পরে আসতে পারে, কিন্তু প্রাণ-প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ সর্বাগ্রে।" একারণেই শিক্ষক-শিক্ষিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশী। শিক্ষক শিক্ষিকাগণ তাদের গ্রহণযোগ্য জীবনাদর্শকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চারিত করবেন। তারা অর্জিত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবেন শিশুশিক্ষার্থীদের অন্তরে অন্তরে। শিক্ষায় অনুসন্ধিৎসার বিষয়টির উপরেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন, বিশেষ করে শৈশবকালীন কৌতূহল নিবৃত্তি বা অনুসন্ধিৎসাই শিশুকে আগামী দিনের জন্য তৈরী করে দেয়। পঠনপাঠন ছাড়াও স্বতঃস্ফূর্ততা, স্বাধীনতা, আনন্দময় পরিবেশ, খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ, হস্তশিল্প, কারুশিল্পের অনুশীলন, সংস্কৃতিচর্চা, স্মরণশক্তির বিকাশ সাধন, কল্পনাশক্তি, সৃজনভাবনার পরিপুষ্টিকরণ প্রক্রিয়া প্রভৃতি বিষয়ের আবশ্যিকতার শিক্ষা গোড়া থেকেই দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে - "ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।" তা' নাহলে শিশুর জীবনধারা হয়ে উঠবে নিস্তরঙ্গ, গতানুগতিক। রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শ আধ্যাত্মিকতা বর্জিত না হলেও মূলত কর্ম, ক্রীড়া, সৃজনকেন্দ্রিক ও নান্দনিকতামুখী। তিনি গোড়া থেকেই স্বাবলম্বী করার পক্ষপাতি ছিলেন। গান্ধীজীর বুনিয়াদী শিক্ষাদর্শনেও বিষয়টি লক্ষ্যনীয়। একথা অনস্বীকার্য যে, শিশু কিছু দৈহিক ও মানসিক উপকরণ নিয়েই জন্মায়। এসবের উপর ভিত্তি করেই ধীরে ধীরে তথা নামপর্যায়ে সে বিকশিত হয় কিছুটা প্রাকৃতিক নিয়মে, কিছুটা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের আনুকূল্যে।
শিশুদের কিছু মৌলিক চাহিদা আছে। যথা, ক) ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবৃত্তির চাহিদা খ) আত্মরক্ষার চাহিদা গ) জ্ঞানার্জনের চাহিদা ঘ) শারীরিক চাহিদা ঙ) মানসিক চাহিদা চ) ব্যক্তিগত চাহিদা ছ) সামাজিক চাহিদা জ) ভাষা শিক্ষার চাহিদা ঝ) আদর-যত্নের চাহিদা প্রভৃতি। ক্রমপর্যায়ে যোগ হয় স্বাধীনতার স্পৃহা, আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতার বাসনাও। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্না শিক্ষাবিদ, যিনি মন্তেসসরি শিক্ষাপদ্ধতির আবিষ্কার করে দ্বিতীয় কলম্বাসের মর্যাদায় বিভূষিতা, সেই ড মাদাম মারিয়া মন্তেসসরি শিশুদের স্বাধীনতা, আত্মসক্রিয়তা, স্বতঃস্ফূর্ততা, আত্ম-শৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, খেলাধুলা ও আনন্দপূর্ণ পরিবেশে বিজ্ঞানসম্মত পন্থায়, শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাপদ্ধতির মান্যতা দিয়ে, বইয়ের বোঝা কমিয়ে দিয়ে এক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছেন। এখানে স্কুল কথাটার বদলে এসেছে শিশু নিকেতন(children house), শিক্ষক শিক্ষিকার বদলে এসেছে পরিচালিকা(Directrees)। এখানে শিক্ষকের চেয়ে শিশু বা শিক্ষার্থীর গুরুত্বই সমাধিক। তিনি বাধানিষেধের অনুশাসন মুক্ত এক মুক্ত পরিবেশ চেয়েছেন, যেখানে থাকবে আনন্দপূর্ণ শিক্ষালাভের ব্যবস্থা। শিশু কিশোরদের উপর সিলেবাস কিংবা অল্প বয়েসেই সর্ববিদ্যা বিশারদ হবার চাপমুক্ত এক আকর্ষণীয় পরিবেশ চেয়েছেন তিনি। বলেছেন - শিক্ষার্থীর জন্যই শিক্ষক। শিক্ষকের জন্য শিক্ষার্থী নয়। যদিও পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের স্বার্থেও বটে, আবার সামাজিক বাতাবরণের সুস্থতার খাতিরেও।                                              
শিশু শিক্ষাই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা সুচারু রূপে নিষ্পন্ন না হলে পরবর্তী শিক্ষাদান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয় সমাজ সমস্যায় পড়ে যায়। রাইট টু এডুকেশন বিল পাশ হবার পর শিশু কিশোরদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। অনেকটা এগিয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি এখনো। এর মূল কারণ দারিদ্র্য। অন্যান্য কারণ থাকলেও এটাই মূল কারণ। শিশু বা শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসবে, এটা যেমন কাম্য, তেমনি তাদের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্যতায় তৈরী থাকতে হবে শিক্ষক শিক্ষিকা সমাজকেও। শিক্ষাগত যোগ্যতা তো থাকবেই। সেইসঙ্গে আশা করা যায়- তারা থাকবেন সদা হাস্যময়, স্নেহশীল ও যত্নবান, রক্তচক্ষু বিশিষ্ট বদরাগী শিক্ষক যদি কেউ থাকেন তারা জানবেন তাদের কড়া ধাতের দিন শেষ। তারা হবেন সতত অনুসন্ধিৎসু, বিশ্বের নিত্য নতুন প্রবৃদ্ধিমান জ্ঞানজগতের সঙ্গে, পরিবর্তনশীল সভ্যতার সঙ্গে তাদের পরিচয় থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, একটি প্রজ্জ্বলিত দীপশিখাই আর একটি প্রদীপকে জ্বালাতে পারে। শিশুর মনস্তাত্বিক জগত বা চাইল্ড সাইকোলজি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে একালে উত্তম শিক্ষক বা উত্তম শিক্ষিকা হওয়া যায়না। তারা হবেন সংস্কৃতিবান, সৃজনশীল, রুচিবান, সেবাপরায়ন, স্নেহশীল, সহিষ্ণু, সঠিক মূল্যায়নের অধিকারী, চরিত্রবান, বিচারক্ষম, মানবিক,উদার, ফ্রেন্ড ফিলোজফার এবং গাইড। পঠনপাঠনের যতটা সম্ভবত আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করে আধুনিক উপকরণ নিয়েই ক্লাশে যাবেন সম্পূর্ণ তৈরী হয়ে। কারণ তাদের উপরেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশী আস্থা রাখে। তাঁরা দেশ ও জাতি গড়ার মহান ব্রতধারী মহৎ মানুষ হিসেবে মান্যতা পেয়ে আসছেন। 
পরিশেষে এই কয়টি কথা বলে এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করি, সুসংহত রুচিশীল পরিবার, কুসংস্কারমুক্ত শিক্ষিত সুস্থ সমাজ, উন্নত রাষ্ট্র ও সংহতি চেতনাশ্রয়ী হিংসামুক্ত বিশ্ব গড়ার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত, তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্বও বর্তায় অভিভাভক মণ্ডলী, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সঞ্চালকদের কাঁধে। এই ত্রিধারার মিলনেই তো শিক্ষাজগতের ত্রিবেণী সঙ্গম। 



ড আশিস কুমার বৈদ্য, প্রাবন্ধিক,ত্রিপুরা                                                                                                                 
                                                                                                              
৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ইং                                                                                                                                    
                                                                                                             
                                                                                                              
       

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here