খনা চরিত " (ধারাবাহিক নাটক) ......অষ্টম পর্বের পর ৯ম,১০ম এবং ১১তম পর্ব - অস্ট্রেলিয়া থেকে রবিরশ্মি ঘোষ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

খনা চরিত " (ধারাবাহিক নাটক) ......অষ্টম পর্বের পর ৯ম,১০ম এবং ১১তম পর্ব - অস্ট্রেলিয়া থেকে রবিরশ্মি ঘোষ

মুখবন্ধ: খনা কিংবদন্তীর অন্তরাল থেকে উঠে আসা বিস্মৃতপ্রায় এক নাম। ইতিহাসের কাছে তার থাকার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। শুধু লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে তার বচন। সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের জন্য বলে যাওয়া কিছু কথা।আমার বিনীত প্রয়াস শুধু প্রাচীন বাংলার আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক বিদুষী নারীর অস্তিত্বের লড়াই কে তুলে ধরা। যে সেচ্ছায় নিজের বাকরুদ্ধ করেছিল তার কথা কে গল্পের ছলে সবার কাছে নিয়ে আসা।

অষ্টম পর্বের পর...


দৃশ্য ৯


(রাজা চক্রকেতুর বিশেষ সভা| বরাহ পন্ডিত, দিব্যদর্শী, খনা, মিহির উপস্থিত|)

রাজা: অভিযোগ গুরুতর| তদ্যপি সিংহলরাজের সহিত বঙ্গদেশের মৈত্রীবন্ধনের কথা স্মরণে রেখে এই অভিযোগ সাধারণ সভায় উত্থাপন না করে এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছে|
খনা: (করজোড়ে) মহারাজ আপনি আমার পিতৃতুল্য| অত্যন্ত সদয় হয়ে এই বঙ্গ দেশে আমাদের আশ্রয় প্রদান করেছেন| তার জন্য আমরা আপনার নিকট চিরঋণী| জ্ঞানতঃ কোনো অপরাধ আমরা করি নি তবে কি অভিযোগ তা জানতে আগ্রহ করি|
রাজা: রাজ জ্যোতিষী মহোদয় অভিযোগ এনেছেন যে তোমরা কুহক বিদ্যার চর্চা করছ আর কৃষক কুল কে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করছ|আর্যাবর্তের জ্যোতিষ আজ অবলুপ্তির পথে|
খনা: মহারাজ, আর্যাবর্তের জ্যোতিষ শাস্ত্র কি এতই দুর্বল যে আমার মত সামান্যা নারীর জন্য তা আজ অবলুপ্তির পথে?
বরাহ পন্ডিত: আত্মবিশ্বাস ভালো কিন্তু অত্যধিক মাত্রায় তা দুঃসাহসেরই নামান্তর| আর্যাবর্তের জ্যোতিষ শাস্ত্র দুর্বল নয়| কিন্তু মুর্খ কৃষক গণ কি ভাবে তার মর্ম উদ্ধার করবে? তাই তাদের কে ছেলে ভুলানো ছড়া শুনিয়ে বশ করা খুব একটা কঠিন কার্য নয়|
খনা: ক্ষমা করবেন আচার্য দেব কিন্তু আমি আর্যাবর্তের জ্যোতিষ শাস্ত্রেও পারদর্শী তার প্রমান আমি দিতে পারি| যদি আপনার গণনা আমি ভুল প্রমাণিত করতে পারি তাহলে কি স্বীকার করবেন সেই সত্য?
মিহির: কি বলছ খনা? (বরাহ পন্ডিতের দিকে করজোড়ে) ক্ষমা করবেন আচার্য, আপনার আপত্তি থাকলে আমরা আজই এই দেশ ছেড়ে অন্যত্র প্রস্থান করব|
খনা: না| দেশ ছেড়ে যেতে যদি হয় তো যাব তবে তার আগে আচার্য দেবকে প্রমাণ দিয়ে যাব যে আর্যাবর্তের জ্যোতিষ শাস্ত্রের শিক্ষা আমার যথার্থ|
বরাহ পন্ডিত: সে প্রমাণ না দিয়ে এ দেশ ছেড়ে যেতেও তোমরা পারবে না| বল কোন আমার গণনা যা তুমি ভুল প্রমাণ করবে?
খনা: আচার্য দেব স্মরণ করুন বহু বছর আগে এক নবজাতকের ভাগ্য গণনা করেছিলেন এবং সে স্বল্পায়ু দেখে তাকে নদী তে এক ডালির মধ্যে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন|
(মিহির চক্ষু বিস্ফারিত করে খনার দিকে তাকায়|)
বরাহ পন্ডিত: (বিস্মিত চোখে) সে কি? একথা তুমি জানলে কি করে?
খনা: আমার গুরুর কাছ থেকে| তিনি সেই বালক কে ডালি থেকে উদ্ধার করেন এবং তার সাথে তার ভাগ্য গণনার কাগজ ও পান| জ্যোতিষ বিদ্যার শিক্ষা পাওয়ার পর আমি সেই গণনা নিয়ে বসি, কারণ সেই গণনা যে বালককে নিয়ে সে তার ভাগ্য গণনা অগ্রাহ্য করে যৌবনের দ্বারদেশে পদার্পণ করেছে| পুনরায় গণনা করে আমি পাই যে এই জাতকের জীবনরেখা সুদীর্ঘ একশত বছর পর্যন্ত বিদ্যমান|
বরাহ পন্ডিত: তা কি করে সম্ভব? সুর্যসিদ্ধান্ত মতে করা আমার এই গণনা অভ্রান্ত|
সপ্তমে ভবনে চন্দ্র রবি রাহুস্চ মঙ্গল|
সপ্তমে দিবসে মৃত্যুঃ সপ্তমাসে নঃ সংশয়||
খনা: (বরাহ পন্ডিতের দিকে কিছু কাগজ এগিয়ে দিয়ে)এই আমার গণনা আচার্য দেব| সূর্যের অপভূ গণনায় সেদিন আপনার কিছু ভ্রান্তি ঘটেছিল তাই জাতকের সপ্তম ভবনে তার মৃত্যুযোগ দেখেছিলেন|
বরাহ পন্ডিত: (কিছুক্ষণ ধরে খনার গণনা দেখে|)সত্যিইতো, কি করে করেছিলাম সেদিন এই অতি সাধারণ ভুল? (খনার দিকে চোখ তুলে) কিন্তু কোথায় আমার পুত্র?
খনা: আপনার সামনেই| আমার স্বামীই আপনার পুত্র|
বরাহ পন্ডিত: আমার পুত্র .... আমার একমাত্র পুত্র ... (আসন ত্যাগ করে মিহির কে গিয়ে ধরে)নিয়তির একি খেলা ...... এত বছর পর (খনার দিকে ফিরে) মা ধন্য তোমার জ্যোতিষ বিদ্যার সাধনা| আজ এই বরাহ পন্ডিতের সমস্ত অহংকার সমস্ত স্পর্ধা তুমি ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছ|
(রাজা চক্রকেতুর দিকে চেয়ে) মহারাজ আজ বঙ্গ দেশে এসে এ আমার পরম প্রাপ্তি| আর এক মুহূর্তও আমি আমার পুত্র ও পুত্রবধু কে ছাড়া থাকতে চাই না| আপনি আজ্ঞা করুন এরা যাতে আমার সাথে আমার বাসভবনেই থাকতে পারে|

রাজা: আমি অভিভূত আচার্য| আমার আজ্ঞার কি প্রয়োজন, আপনার পুত্র ও পুত্রবধু আপনার সাথে থাকবে এই তো স্বাভাবিক নিয়ম| আমি এখনই ব্যবস্থা করছি যাতে খনা এবং মিহিরের সাংসারিক সামগ্রী আপনার বাসভবনে স্থানান্তরিত করা হয়|

(বরাহ পন্ডিতের মিহির ও খনাকে সঙ্গে নিয়ে নিষ্ক্রমণ)

দৃশ্য ১


কথক ঠাকুর:
বরাহ পন্ডিত বহু আনন্দ পাইলা|
পুত্র পুত্রবধু সনে বাসস্থানে গেলা||
বহুকাল পরে গৃহে পাইয়া পুত্ররে|
সরমা বরণ করে অতি সমাদরে||
কিন্তু তার পরে কি হইল? টান তো পুত্রের প্রতি, পুত্রবধুর সহিত কিরূপ ব্যবহার করলা সরমা? চলেন দেখা যাক|

(সময় সকাল| খনা তার পুঁথি ও গণনার কাগজ একত্রিত করতে নিরত| সরমার প্রবেশ|)
সরমা: একি? এই প্রাতঃকালে তুমি এই পুঁথি পত্রাদি একত্রিত করছ কেন?
খনা: আমাকে যে কিছুক্ষণ পরেই পিতার সহিত রাজভবনে যেতে হবে| তাই ওই গণনার কাগজ সঙ্গে নিচ্ছিলাম|
সরমা: ও আচ্ছা| ভেবেছিলাম আজ তোমাকে গৃহকার্যের কিছু দায়িত্ব সমর্পণ করব কিন্তু তা বুঝি আমার ভাগ্যে নেই|
খনা: সে আমি ফিরে এসেই আপনার কাছ থেকে বুঝে নেব খন|
সরমা: গৃহকার্য তো আর তোমার ফিরে আশার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না| না বাছা তুমি বরং গণনার কার্যেই যাও| আমার ভাগ্যে যখন পুত্রবধুর সঙ্গসুখ নেই তখন আর কি করা|
খনা: মা, আমারও তো অনেক ইচ্ছা আপনার সেবা করার, আপনার সাথে সময় ব্যতীত করার| কিন্তু পিতার ইচ্ছার ও তো অবমাননা করতে পারি না| আমি যে উভয়সংকটে|
সরমা: থাক বাছা, তোমার আর দুঃখপ্রকাশ করার প্রয়োজন নেই| আমি বরঞ্চ আমার গৃহকর্মে মন দিই|
(সরমার প্রস্থান| খনা স্থানুর মত দাড়িয়ে থাকে|)



 দৃশ্য ১১

কথক ঠাকুর:
ইহার পরেতে গেল কাটি মাস কয়|
ঘটনার ঘনঘটা অন্য রূপ লয়||
প্রাথমিক প্রয়াসেতে না হইল ফল|
দিব্যদর্শী ভাবিলেন নুতন কৌশল||
বরাহ পন্ডিত যদি না হইবে বশ|
মিহির সরমা দোঁহে করিব পরশ||
এই ভাবি দিব্যদর্শী মানস করিলা|
মিহিরের দর্শনার্থে বাসস্থানে গেলা||
মিহির সরমা সনে কি হইল কথা|
জানিতে হইলে দেখ বাকি গল্প হেথা||

(বরাহ পন্ডিতের বাসভবন| মিহির, সরমা ও দিব্যদর্শী উপবিষ্ট|)

মিহির: আজ এই প্রাতঃকালে রাজ জ্যোতিষী মহাশয়ের পদধুলি লাভের সৌভাগ্য কি ভাবে ঘটল?
দিব্যদর্শী: না এই দিক দিয়েই যাচ্ছিলাম প্রাতঃভ্রমনে, ভাবলাম একবার আচার্য দেবের দর্শন করেই যাই| আজকাল তো আর মহারাজ সভাতেও ডাকেন না আর আচার্য দেবের সাথে দেখাও হয় না| তা তিনি কোথায়?
মিহির: পিতা তো ব্রাহ্মমুহুর্তে উঠেই খনাকে সঙ্গে নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে গেলেন| সেখানে কৃষিকার্য সংক্রান্ত বিষয়ে মহারাজের কিছু পরামর্শ প্রয়োজন|
দিব্যদর্শী: মহারাজও কৃষিকার্য নিয়ে মেতেছেন দেখছি|তা বৎস তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন না আচার্য দেব?
মিহির: আজ্ঞে না| কৃষি কেন্দ্রিক বিষয়ে খনার পান্ডিত্য গভীর| তাই তাকে নিয়েই গেলেন|
দিব্যদর্শী: তা বটে| আচ্ছা আচার্য দেব নিশ্চই অন্যান্য জ্যোতিষ সংক্রান্ত বিষয়ে তোমার সাহায্য গ্রহণ করেন|
মিহির: না, ঠিক তা নয়| পিতৃদেব খনার সাথেই বেশি আলোচনা করেন জ্যোতিষ সংক্রান্ত বিষয়ে|
সরমা: সর্বক্ষণ ওই আলোচনায় তো চলছে| গৃহকার্যে তো তাকে পাওয়াই যায় না|
দিব্যদর্শী: এত ভালো লক্ষণ নয়| পুত্র কে তার যোগ্য স্থান না দিয়ে পুত্রবধুর সাধে সব আলোচনা| আচার্যদেব অত্যন্ত শ্রধ্যেয় কিন্তু তার এই ব্যবহার ঠিক মানতে পারলাম না| তা ছাড়া ভদ্রে সরমা বলছেন গৃহ্কার্য়েও খনাকে পাওয়া যায় না| গৃহ কে যে ধারণ করে রাখে সেই তো গৃহিনী|
সরমা: কি যে বলি| এত বছর পর পুত্র কে পেলাম শান্তি পেলাম না| সে মায়াবিনী কি জাল যে বিস্তার করেছে আচার্য দেবের ওপর...
দিব্যদর্শী: সাবধানে থাকবেন ভদ্রে| ঘোর কলি... আমি এও জানতে পেরেছি যে মহারাজ নাকি আজকাল আচার্য দেবের থেকেও খনার ওপর কিঞ্চিত বেশি নির্ভর করছেন| ভাবি শেষে না আচার্য দেবের সম্মান কোন ভাবে খর্ব হয়|
মিহির: না না, খনা পিতার সম্মানহানি ঘটুক এমন কোন কাজই করবে না|
দিব্যদর্শী: সে তো ভবিষ্যত| তেমন কাজ তো সে অতীতেও করেছে|
মিহির: কি ভাবে?
দিব্যদর্শী: কেন রাজ সভায় আচার্য দেবকে সে দ্বন্দে আহ্বান করে নি? আচার্য দেবের জন্য সেটা অপমান ছিল না?
মিহির: না মানে সে তো......
দিব্যদর্শী: সত্য কে স্বীকার করতে শেখো মিহির| পত্নীপ্রেমে অন্ধ হয়ো না|
সরমা: আমার ভয় করছে| কোনদিন আরো বড় কোন সম্মানহানি না ঘটে আচার্যদেবের| মিহির, বৎস আমার মনে হয় এর একটা বিহিত প্রয়োজন|
মিহির: ঠিক আছে মা| আমি খনার সাথে কথা বলব|
দিব্যদর্শী: অবশ্যই বল বৎস| তোমার গুরুত্ব তো সে লঘু করেই দিয়েছে, এখন আচার্যদেবের যাতে কোন সম্মানহানি না হয় সেটাই আমাদের দেখতে হবে| আমি তা হলে আজ প্রস্থান করি, অনুমতি দিন ভদ্রে|
সরমা: ভদ্র দিব্যদর্শী আজ আপনি আমাদের অশেষ উপকার করলেন| আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা নেই|
দিব্যদর্শী: আমি সামান্য মানুষ, তবে সম্মানীয় ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটুক কোন মতেই তা আমার কাম্য নয়|
মিহির: আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এর একটা বিহিত আমি করবই|
(দিব্যদর্শীর প্রস্থান)

 ক্রমশ 
 .......................................

রবিরশ্মি ঘোষ, অস্ট্রেলিয়া

২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner