চলো ঘুরে আসি নীলাকুরুঞ্জী ফুলের পাহাড় (দ্বিতীয় পর্ব) ......ত্রিপুরা থেকে রীণা দাস - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

বুধবার, ২ অক্টোবর, ২০১৯

চলো ঘুরে আসি নীলাকুরুঞ্জী ফুলের পাহাড় (দ্বিতীয় পর্ব) ......ত্রিপুরা থেকে রীণা দাস

বাস নামিয়ে দিল উটকামন্ডে।বৃষ্টি পরছে বাইরে।মুষলধারে নয় তবে থেমেও নেই।ইলশেগুড়ি ধরণের।কোয়েম্বাটুরে বসেই ওয়োতে রুম সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম।এখন আর হোটেলে উঠতে মন চায় না।যত বারই ওয়োতে রুম নিয়েছি ততবারই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়েছি।এবারও তাই করলাম।চার্চ হিল রোডে কটেজ চার্চে।দূরত্বও মেপে নিলাম গুগল ম্যাপে।লোকেশানও দেখে নিলাম ।যে দূরত্ব তাতে কোন উবের শো করছে না,এমনকি অটোও না।তাই বৃষ্টি মেখেই ডেকে আনা হল অটোকে।ভাড়া বলল আশি টাকা।উঠে বসতেই ,সোঁ করে টান মেরে অটো থেমে গেল কটেজের সামনে।নেমে মনে হলো হাঁটা রাস্তাই তো ! তবে এমন অভিজ্ঞতা জীবনে অনেক আছে।রাস্তার দূরত্ব ও জায়গা সম্পর্কে জানা না থাকায় গোবেচারার মত অনেক টাকা বেরিয়ে গেছে তবে রাস্তার পরিপাট্যতা শেখা হয়েছে তা ঠিক।

চার্চ হিল কটেজের সুমুখে‌ পা রেখে হাঁ করে তাকিয়েছিলাম কতক্ষণ।এমন সুদৃশ্য ফুল পাতায় সাজানো বাড়ি, দেখে মনে হল ভুলবশতঃ কম ভাড়ায় তারা আমাদের দিনযাপন করতে দেবেন নয়তো আমাদের কপাল ভালো---দুটোর একটা হবে।পূব,পশ্চিম,উত্তর,দক্ষিণ নজরে এঁকে নিলাম।উত্লাতর পশ্চিম কোণ মেঘে পাহাড়ে মাখামাখি। সবে দুপুরে পা দিয়েছে দিন।রেজিষ্ট্রেশন সেরে বৃষ্টির ইঙ্গিত দিতেই ম্যানেজার বাবু ইয়া বড় এক রামধনু রঙের ছাতা আমাদের ধরিয়ে দিলেন।খুশিতে ডগমগ,এই পয়সাটাও বুঝি বেঁচে গেল।চাবি নিয়ে তরতর করে উঠে এলাম দোতলায়।রুম খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ।ড্রয়িংরুম,কিচেন রুম,বেডরুম ,সব সাজানো গোছানো।ওয়াটার ফিউরিফায়ার ,রান্নার উপকরণ সব যেন নিটোল হাতে গোছানো।জল কিনতে হয় নি এক টাকারও।ঘর দেখে মনে হয় না,কেউ এর আগে এখানে পা ফেলেছে।আমাদের পায়ে পায়ে দুটো বিড়াল ছানা ঢুকল,মনে হলো এরা আপ্যায়নের কাজে ব্যস্ত।

ব্যাগ পুটুরি নামিয়ে মোবাইল নিলাম কয়েকটা ক্লিক দেবো বলে।ছবিতে বাতিকগ্রস্ত আমি।কেননা ছবি পুরনোকে নতুন ভাবে সামনে এনে পরিবেশকে দাঁড় করায়।ঘুরে, ফিরে আসবো জায়গা ছেড়ে।তখন ছবিরাই কথা বলবে আমার সাথে।ছবি নিয়ে বের হয়ে পরলাম খাবারের উদ্দেশ্যে।তারপর খুঁজবো কোথায় কি গুঁজে রেখেছেন ঈশ্বর।কুড়ি বছর আগে একবার উটকামন্ড ,বর্তমান নাম উটি ,এসেছিলাম।তখন আর এখন অনেক পার্থক্য সময় আর পরিবেশে।আবার নতুন করে দেখার ,জানার এমন অনেক বিষয় তৈরী হয়ে গেছে।তাই সবটাই অজানা,অদেখা।বিশেষ বলে কিছু নেই আমার দৃষ্টিতে।নতুন দৃষ্টিতে সব নতুনভাবে দেখার মজাই আলাদা।খেতে হবে আগে।পেট চুঁ চুঁ করছে।ঘোর প্যাঁচে হাঁটতে হাঁটতে এলাম এমন এক হোটেলের দরজার সামনে যে ,না পারি নামতে,না পারি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে।

"সঞ্জয় হোটেল "।দরজা পুরোটা কাঁচের।ভেতরটা বেশ পরিপাটি ।মানুষ থেকে আসবাবপত্র সব।কর্তাকে আস্তে করে বললাম ফিরে আসতে।সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত বলে নামী দামী কিছু দেখলে প্রথমে ভিড়মী খেতে হয়।পকেট না কাটা যায় তাই।ফিরে আসবো ভেবে আর ফেরা হল না।হোটেলের লোকেদের ডাকাডাকিতে ভেতরে পা রাখলাম ভয়ে ভয়ে ।বিলের ভয়।ঠাকুর ডাকতে লাগলাম,এবারটা যেন বেঁচে যাই।ছেলেরা সাথে থাকলে তাদের বায়না মতই খাবারের অর্ডার দিই ,কিন্তু আমরা দুজন একসাথে থাকলে একটু হাড় কিপটেমিতে পেয়ে বসে।যাইহোক ম্যানুচার্ট দেখে নিরামিষ থালা অর্ডার করলাম।টেবিলে টাই,স্যুট পরিহিত দুজন সুবেশধারী বয় সুদৃশ্য থালা নিয়ে এল,মুখে স্মিতহাসি।থালায়  কলাপাতা বিছানো।দৃষ্টিতেই পেট ভরে যাওয়ার উপক্রম।একশ কুড়ি টাকা থালি।কি নেই তাতে--ভাত,পোলাও,রুটি,পনির,টক দই,পায়েস,পাপড়,ডাল,সব্জিতে পূর্ণ।
থালা খালি করতে পারি নি।তাদের আথিতেয়তায় মুগ্ধ হয়ে যে কদিন থাকবো ওখানেই খাব এই বলে বের হয়ে আসলাম।
হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম আমরা সব দর্শণীয় স্হানের কেন্দ্রস্হলেই আছি।সবচাইতে কাছে বোটানিক্যাল গার্ডেন।হাঁটছিলাম আর প্রত্যক্ষ করছিলাম বৃটিশদের হাতে তৈরী অপরূপা শৈলশহরকে।কোয়েম্বাটুরের ডিষ্ট্রিক্ট কালেক্টর জন সুলিভানের প্রথম দৃষ্টি পড়েছিল পার্বত্য শহরটির দিকে।আজ দিকে দিকে তার দৃষ্টিকেই অনুসরণ করে পরিমার্জন করে সেজে উঠছে পার্বতী উটি।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেইটে।গেইট পাস বড়দের জন্য চল্লিশ টাকা মাথা পিছু আর ছোটদের কুড়ি টাকা।প্রবেশ পথ ফুলের পাপড়ি ছুঁইয়ে দিয়ে সবাইকে সাদরে গ্রহণ করে নিচ্ছিল।যত এগোচ্ছি ততই মন ভালো করা সব সাতরঙা ফুলের ডালি।এক ফুলের দিকে তাকালে অন্য ফুলেরা যেন ঈর্ষান্বিত হয়।এমন মোহনীয়,রমনীয় যে দৃষ্টি নুইয়ে রাখে।পাশাপাশি নানান শেডের বাহারী পাতা।কখনো শ্যাওলা সবুজ কখনো সমুদ্র সফেন সবুজ।নীলগিরী পর্বতের সবচাইতে উঁচু চূড়া ডোডাবেত্তা শিখরের নীচের ধাঁপে টেরেসে করা পঞ্চান্ন হেক্টর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই গার্ডেন ।একশ সাতাশ প্রজাতির ফার্ণ,ক্যাকটি,বেগুনিয়া,বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড,স্যাকুল্যান্টস,বোলবোনস,সব ফুলেদের নাম মনে রাখতে চাইছিলাম,পারি নি।মাথা কান ঝিম ঝিম করার উপক্রম।কুড়ি বছরের পুরনো ফসিল উদ্ভিদ,বিশাল বৃক্ষরাজির সমন্বয়ে গঠিত এই বাগানবাড়ি।ঘুরতে ঘুরতে মনে হচ্ছিল কোন চিত্রশিল্পী তার রঙের তুলিতে ফুল পাতাকে বাহারী করে তুলেছেন।ভেতরেই চা পানের ব্যবস্হা আছে।চায়ের আড্ডায় বসে জানতে পারলাম "নীলগিরী" নামের রহস্য।এই পাহাড়ের বুকে নাকি  প্রতি বারো বছরে নীলাকুরুঞ্জি ফুল ফোটে।তখন এই নীলের ঢেউকে সামাল দিতে পারে না সবুজ পাহাড়ও।মানুষ আকর্ষিত হয়ে ছুটে আসে দূর দূরান্ত থেকে এখানে এর মোহময়ী রূপ লাবন্য মাখার জন্য।মন শূণ্য হয় এমন পরিবেশে।বাগানের মালীরূপী মানুষদের দেখলে মনে হয় এরাই ঈশ্বর।নয়তো এত সুন্দর ফুল পাতা কে সাজাতো ! শ্রদ্ধায় এদের সৃষ্টির প্রতি অবনত হতে হয়।ঘোর কাটাতে হবে।ঘড়ির কাঁটা জানিয়ে দিল সময় আগত----
সাড়ে ছয়টায় গেইট বন্ধ হওয়ার সময় আসলে আমরা বের  হয়ে এসে সামান্য ঘুরাঘুরি সেরে সেদিনের মত ঘরে চলে আসি।------

ক্রমশ...

রীণা দাস,শিক্ষিকা
ত্রিপুরা

২রা অক্টোবর ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner