প্রসঙ্গ ত্রিপুরা : সংগ্রহ ও সংরক্ষণে রমাপ্রসাদ দও - সৌম্যদীপ দেব, ত্রিপুরা - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০২১

প্রসঙ্গ ত্রিপুরা : সংগ্রহ ও সংরক্ষণে রমাপ্রসাদ দও - সৌম্যদীপ দেব, ত্রিপুরা

ত্রিপুরা নামটির সাথে পুরাণের সম্পর্ক হয়তো নেই তবে রাজ্যটি প্রচীন। ভারতীয় ডোমিনিয়নে উওর- পূর্বের এই পার্বত্য রাজ্য যোগ দেওয়ার পূর্বে প্রায় ১৮০ জন রাজা ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে এই রাজ্য শাসন করেছেন। তাদের শৌর্য  ও বীর্যের নিদর্শন রেখে গেছেন। কিন্তু রাজ আমল থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক সরকার বা প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালিত হওয়ার এই সুদীর্ঘ সময়কালে ত্রিপুরায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা সর্বদাই অবহেলিত হয়েছে। জানা যায় রাজ আমলে ত্রিপুরার রাজ বাড়িতে রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ও সংরক্ষণের নিদর্শন হিসাবে বেশ কিছু বইসহ একটি গ্রন্থাগার ছিলো। কিন্তু তাতে কি কি গ্রন্থ রক্ষিত ছিলো তার সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় না। আমার এই নিবন্ধে আমি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং এই ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব রমাপ্রসাদ দওের অবদান সংক্ষিপ্ত পরিসরে সামগ্রিক রূপ তুলে ধরেতে চেষ্টা করবো। 


ত্রিপুরা থেকে প্রতি বছর বিশাল পরিমাণ গ্রন্থ ও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় - কিন্তু তার কোনো সামগ্রিক পঞ্জিকরণের পদ্ধতি নেই। রাজ্য  আর্কাইভের দৈন্যদশা আজ আর নতুন কিছু নয়। যেখানে রাজ আমলের ঐতিহাসিক তথ্য তো বহুদূর, ১৯৭১ এর কোনো তথ্য স্বযত্নে সংরক্ষিত আছে কিনা তা সন্দেহের অবকাশ রাখে । এতে রাজ্যের সামগ্রিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সংরক্ষণ তো শুধু মাত্র একটা সময়ের ধারাবাহিকতা বা পরিচায়ক শুধু নয় - একটা সময়ের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তুলে রাখা। দেশ- সমাজ  ও কালের প্রক্ষাপটে প্রত্যেক নাগরিক ও রাষ্ট্রের এটা  কর্তব্য। সেগুরে বালি দেখে কেউ কেউ হতাশ হন।পরবর্তীতে যখন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় তখন আশার বুক বেঁধেছেন অনেকেই,  যে এবার হয়তো কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের এই ভগ্ন ও জরাজীর্ণ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করবে কিন্তু তাতেও সফলতা অধরাই রয়ে গেছে। বাংলা ভাষা চর্চার অন্যতম দুটি  স্থান কোলকাতা ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবশ্য এই চিত্রটা অন্যরকম। কেলকাতায় ন্যাশনাল লাইব্রেরি, লিটল ম্যাগাজিন সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে, সাহিত্য একাডেমি  এবং বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সহ আরো বেশ কিছু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে - যেগুলো অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করে চলেছে। বিদেশে এই ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন হলেও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় অবহেলার চিত্র সচেতন মহলে খুব প্রাসঙ্গিক। অনলাইনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সফটকপি সংরক্ষণ করা হয় ভবিষ্যত কালের জন্য। কিন্তু পার্বত্য ও প্রত্যন্ত রাজ্য ত্রিপুরায় তা কতটা সক্ষম এবং কার্যকরী ?  এই প্রশ্ন অবশ্যই ভাবনার দাবি রাখে। 


অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন সাহিত্যিক, আলোচক, সংগ্রাহক  শ্রী রমাপ্রসাদ দও। এই নামের থেকেও 'পল্টু দা' হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব, ত্রিপুরায় সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অন্যতম আদিপুরুষ ও পথিকৃৎ হয়ে রয়েছে তিনি। যেকাজ সরকারী আনুকূল্য ব্যতিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, সেই অসম্ভব ও দুরূহ কাজকে তিনি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সম্ভব করে এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন।এই সংগ্রহশালার নাম ' রমাপ্রসাদ গ্রন্থাগার'। সংসারের নিত্যদিনের বাজারের হিসাবের খাতা, বিয়ের কার্ড, আগেকার দিনে সিনেমা হলে ঢোকার পূর্বে দেওয়া লিফ্লেট, বহু গানের খাতা, বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ছবি সম্বলিত ফাইল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নথিপত্র, ত্রিপুরার আশি জুনের দাঙ্গার তথ্যাদি,ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার কাগজপত্র, নাটক সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের ফাইল, নির্বাচনের বিভিন্ন কাগজপত্র, যাত্রাপালার বিভিন্ন টিকেট ও তথ্যাদি, শচীন দেববর্মণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য মূলক ফাইল, ত্রিপুরার থেকে প্রকাশিত প্রায় সব লিটল ম্যাগাজিন এবং রাজ্যের বাইরের বিভিন্ন ম্যাগাজিন,রাজ্য সরকারের বিভিন্ন গেজেট-দলিল- নথিপত্র, বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সংখ্যা, জওহরলাল নেহেরু - ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীর মৃত্যুদিনের পত্রিকার কপি, 'রবি' পত্রিকার বেশকিছু সংখ্যা সহ অসংখ্য মূল্যবান তথ্যাদি ও নথিতে তাঁর সংগ্রহশালা পরিপূর্ণ ছিলো।যত্ন সহকারে একটু একটু করে বড়ো করেছেন এই গবেষণাগারকে। সন্তান স্নেহে লালন করেছেন মননের মনিকোঠায়।  এই সকল তথ্য সমূহের যেমন ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে তেমনি সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। এই সংরক্ষণ দেখে সহজেই অনুমেয় হয় যে রমাপ্রসাদ দও আধুনিক চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম ও তারও পরবর্তী এক এক প্রজন্ম যেনো  তাঁর সংগ্রহশালা থেকে তথ্য নিয়ে উপকৃত হতে পারে। 


জানা যায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ছিলো তাঁর এই সংগ্রহে।যেমন - ভক্তিযোগ - অশ্বিনীকুমার দত্ত, বিষাদসিন্ধু - মীর মোশারেফ হোসেন, দুর্দ্দিনের যাত্রী - নজরুল ইসলাম, প্রাচীন রাজমালা - শ্রীরামপ্রাণ গুপ্ত, শোকগাথা - শ্রী অনঙ্গমোহিনী দেবী, হিন্দুর ভূগোল বিদ্যা - শ্রীশীতলচন্দ্র চক্রবর্তী, বঙ্গবিলাপ - শ্রীকালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য প্রণীত, রত্নমালা - প্রাণতোষ ঘটক, রাজমালা- কালীপ্রসন্ন সেন সম্পাদিত, চম্পকবিজয় - কবি মহদ্দিন, প্রেম চতুর্দশী - রামগঙ্গা শর্মা, ক্রিয়াযোগসার - চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদ ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা স্মৃতি - শ্রীসমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, বৈজয়ন্তী - রাজকুমারী কমলপ্রভা দেবী,পঞ্চমাণিক্য - কালীপ্রসন্ন সেনগুপ্ত বিদ্যাভূষণ, সিপাহীযুদ্ধের ইতিহাস - শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রভৃতি গ্রন্থ এই সংগ্রহশালার গুরুত্ব শতগুণ বৃদ্ধি করেছে। এছাড়াও কয়েক হাজার গ্রন্থ এই রমাপ্রসাদ দও সংগ্রহশালার বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো । যেখানে ত্রিপুরা, কোলকাতা, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন জায়গার প্রকাশিত বই যত্নসহকারে সংরক্ষিত রেখেছিলেন সংগ্রাহক রমাপ্রসাদ দও। যেখানেই যা তথ্য পেয়েছেন এনে রেখেছেন - এতে করে ত্রিপুরা পেয়েছিলো এক পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা। 

ত্রিপুরায় এমন গবেষক - অধ্যাপক পাওয়া দুর্লভ যাঁরা গবেষণা ও অধ্যাপনার সুবাদে একবার হলেও রমাপ্রসাদ দও গবেষণাগারের দারস্থ হননি। এমনকি বহিঃরাজ্যের বহু সাহিত্যিক ও গবেষক, পাঠক নানা সময়ে ত্রিপুরার এই গবেষণাগারে এসেছেন ও আপন পাঠের ভূমিকে আরোও সমৃদ্ধ করেছেন। কেউ কেউ রমাপ্রসাদ দও প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন তিনি 'ত্রিপুর যক্ষ'  আবার কারো কাছে তিনি 'ত্রিপুরার অহংকার ' কেউ বলেন 'গ্রন্থাগারিক'। সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়ে তিনি হলেন 'জিজ্ঞাসু- অনুসন্ধানী সংগ্রাহক ও সংরক্ষক'।


রমাপ্রসাদ দও সম্পর্কে কাজ খুব কম। এতো বড়ো সংগ্রাহক অথচ অনেকের কাছেই তিনি ব্রাত্য থেকে গেছেন৷ রমাপ্রসাদ দওকে নিয়ে অন্যতম একটি গ্রন্থ হলো দিলীপ দাস ও দেবানন্দ দাম সম্পাদিত  'রমাপ্রসাদ প্রত্ন - সংরক্ষক ও গবেষক ' ; গ্রন্থে সম্পাদকদ্বয়ের কথায় স্পষ্টতা পেয়েছে রমাপ্রসাদ দওের একনিষ্ঠতা ও মনন -


" অর্থ নয়, মান নয়, শিক্ষার স্ফীতবর্গ আস্ফালন নয়, শুধু নীরবে, নির্জনে,নিজেকে তিনি ব্যয় করেছিলেন আগামী ইতিহাসের সামগ্রী অন্বেষণে। ইতিহাস নিজেকে অনেক কিছুতেই নীরবে রেখে যায়। প্রত্নবস্তু থেকে, প্রত্ন ধুলোর মাঝেও যেমন ইতিহাস সুপ্ত হয়ে থাকে, তেমনি ইতিহাস সুপ্ত হয়ে থাকে কাগজের পৃষ্ঠায়, প্রকট অক্ষরে।  রমাপ্রসাদ দও এই অক্ষর- বদ্ধ ইতিহাসকেই নিজের একক প্রয়াসে, অান্তরিক যত্নে অর্ধ শতাব্দীরও অধিক কাল ধরে সযত্নে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে গেছেন। "(পৃষ্ঠা ৭ ও ৮) 

বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল শক্তি ও সুনীল রমাপ্রসাদ দওের এই গ্রন্থাগার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বাক্য ব্যয় করেছিলেন। সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে - " রমাপ্রসাদ দও মহাশয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাটি বিস্ময়কর। নিজের চেষ্টায় তিনি ত্রিপুরার ইতিহাস ও সাহিত্যের এক রত্নভান্ডার সৃষ্টি করে চলেছেন। পরে কোনো এক সময় আবার এসে সব কিছু ভালো করে দেখে যাবার ইচ্ছে রইলো। " ( রমাপ্রসাদ দও প্রত্ন- সংরক্ষক ও গবেষক সম্পাদনা দিলীপ দাস ও দেবানন্দ দাম। পৃ- ১৩৭)। আর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতে - " গন্ডূষে সমুদ্র পান অগস্ত্যের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। রমাপ্রসাদ দও মহাশয়ের সংগৃহীত মহাসমুদ্র সামান্য সময়ে দেখা একেবারেই অসম্ভব। একবার নয়, বহুবারই তাঁর কাছে আসতে হবে / হবেই"( ঐ,  পৃ- ১৩৮)। এর থেকেই স্পষ্ট হয় রমাপ্রসাদ দওের সংগ্রহশালার কলেবর সমগ্র বঙ্গ ভূখন্ডে প্রসংশিত হয়েছিলো। 


অনেক সমালোচক ও আলোচক সমালোচনার সার্থে বলতে চেয়েছেন রমাপ্রসাদ দও সাহিত্য করতে আসেননি। তিনি গ্রন্থাগারের কর্মী হওয়ার সুবাদে সাহিত্যের অনুসঙ্গ লাভ করেছিলেন। কিন্তু কথাটি একেবারে অসত্য না হলেও, সম্পূর্ণ সমর্থন করা যায় না। নিজস্ব, একক সম্পাদিত, যৌথ সম্পাদনা মিলিয়ে তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ রয়েছে । যেখানে ত্রিপুরা বিষয়ক গ্রন্থের আধিক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।জীবদ্দশায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার, সম্মাননা ও সংবর্ধনা লাভ করেছিলেন তিনি৷ এছাড়াও রাজ্য ও বহিঃরাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় বহুবার যোগদান করেছেন। ছিলেন বিভিন্ন সংস্থার সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ-মর্যাদা সম্পন্ন পদের অধিকারী। 

এক সাক্ষাৎকারে প্রবাদপ্রতিম সংগ্রাহক রমাপ্রসাদ দওকে প্রশ্ন করা হয়েছিল " রমাপ্রসাদ গবেষণাগারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনি ভাবছেন? "(ঐ। পৃ- ১২৩)  এই প্রশ্নের উওরে তিনি যা বলেছিলেন যা সর্বজন গ্রাহ্য " রমাপ্রসাদ গবেষণাগার সুদীর্ঘকাল যাবৎ এ রাজ্যের গবেষক, অধ্যাপক,শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের তথ্য সংগ্রহের ভান্ডার। এই গবেষণাগার অশেষ নিষ্ঠা ও শ্রমের ফসল। সুতরাং রমাপ্রসাদ গবেষণাগার সম্পর্কে কী ভাবছি, এক কথায় উওর দেয়া যাবে না। এটা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্থা। অন্য কোনো সংস্থার অধীনে এটি যাক, সেটা আমার কাম্য নয়। এটার নাম কোনো অবস্থাতেই বদলানো যাবে না। 


'বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি',' বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ' বা ' এশিয়াটিক সোসাইটি'র আদলে ত্রিপুরায় রমাপ্রসাদ গবেষণাগারটি হোক এবং এই গবেষণাগার ত্রিপুরার জনগণ ব্যবহার করুক। এর ফলে শিক্ষার বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হোক এটাই আমি চাই। 


এর নিজস্ব কোনো জমি নেই। নিজস্ব বাড়ি নেই। একা ব্যয় নির্বাহ করার মতো অর্থ নেই - তবু সীমিত ক্ষমতা নিয়ে এটা বেঁচে আছে। তবে এভাবে এটা কদিন বাঁচবে সেটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে। " (ঐ। পৃ- ১২৩)


এই প্রশ্নের উওরে তিনি যা বলেছিলেন এটাই ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তাঁর বার্তা। তবে এই বার্তা কতটা রক্ষিত হয়েছে?  এই প্রশ্ন সচেতন নাগরিক ও পাঠক মহলের বিবেচনার উপযুক্ত সময় সমাগত। রাজ্যের বহু গ্রন্থ লেখক রমাপ্রসাদ গবেষণাগারের সাহায্য নিচ্ছেন অহরহ, তাঁদের গ্রন্থের কাজ করতে গিয়ে। কিন্তু কোথাও সামান্য কৃতজ্ঞতা স্বীকারটুকুর উল্লেখ থাকে না অনেকের ক্ষেত্রেই - এটা দেশ- কাল ও আধুনিক সভ্য সমাজের জন্য গভীর ভাবনার বিষয়। একসময় রমাপ্রসাদ গবেষণাগারের কলেবর দেখে গল্পকার ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, নন্দগোপাল সেনগুপ্ত, দক্ষিণারঞ্জন বসু, করুণারঞ্জন ভট্টাচার্য, সাহিত্যিক বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানা, সুখময় মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যিক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সান্তনু কায়সার, সাহিত্যিক নিমাইসাধন বসু, নবকান্ত বড়ুয়া, সাহিত্যিক ভূদেব চৌধুরী সহ প্রমুখ বিদ্ধ জনেরা প্রসংশা করেছেন। আর আজ এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বলতে দ্বিধা নেই " রমাপ্রসাদ গবেষণাগার ভগ্নপ্রায়, লুপ্তপ্রায় অবহেলিত হয়ে কালের আয়ু গুণছে "। অনেক আলোচক নানা সময় বলেন সৃষ্টির ব্রাক্ষ্মমুহুর্তে রমাপ্রসাদ গবেষণাগার যে পরিমাণ সমৃদ্ধ ছিলো তার প্রায় সত্তর শতাংশ আজ নষ্ট হয়ে গেছে।রমাপ্রসাদ দও চেয়েছিলেন রাজ্যের মানুষ এটি ব্যবহার করুক, কিন্তু অনতিদূর ভবিষতেই এই গবেষণাগার বিনষ্ট হবে এই কল্পনা রমাপ্রসাদ দও করতে পারেননি বা পারার কথাও নয়। যে গবেষণাগারকে তিনি প্রাণাধিক ভালোবেসেছেন তার এহেন দশা হবে এটা সত্যিই অকল্পনীয়।  এর পেছনে অবশ্য বেশ কিছু  কৌশলগত কারণ বিদ্যমান। গবেষক - পাঠকদের গবেষণাগার ব্যবহারে যত্নহীনতা ও যথেচ্ছাচার , গবেষণাগারের জন্য জায়গার সংকুলান, সরকারি আনুকূল্যের অভাব, সর্বোপরি পুরনো দলিল- দস্তাবেজ - গ্রন্থাদি  সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অনিহা, রমাপ্রসাদ দওের সাধের ও ত্রিপুরাবাসীর বহু স্বপ্নের কাঙ্খিত রত্ন ভান্ডারকে ভগ্নপ্রায় ধ্বংস প্রায় স্তূপে পরিণত করে চলেছে। ২০১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর রমাপ্রসাদ গবেষণাগারের সংরক্ষণের প্রতি অবহেলা অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে। 


একটি স্থানের সামগ্রিক সাহিত্য - সমাজ - সভ্যতা - স্থানিকতা লেখা থাকে তার ইতিহাসের গায়ে। আর এই ইতিহাস ঝা চকচকে প্রাসাদের মধ্যে নয়; লব্ধ হয় সংরক্ষিত গবেষণাগারে। তাই ত্রিপুরার সাহিত্য ও প্রত্ন সংরক্ষণের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ' রমাপ্রসাদ গবেষণাগার ' দশকের পর দশক হয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে আগ্রহী পাঠকের কৌতূহল মেটাতে সক্ষম হবে এই আশা করাই বাঞ্ছনীয়।


তথ্য সূত্র : -

১) রমাপ্রসাদ দও - ঐতিহাসিক প্রবন্ধ সংকলন, হাবেলী, ২০১০


২) দিলীপ দাস ও দেবানন্দ দাম সম্পাদিত - রমাপ্রসাদ প্রত্ন- সংরক্ষক ও গবেষক, বুক ওয়ার্ল্ড, ২০১১


৩) ড. শিশির কুমার সিংহ - ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিহাস, অক্ষর পাবলিকেশানস্ , ২০১৮ 


৪) দুর্গাচন্দ্র সান্যাল - বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস, মডেল পাবলিশিং হাউস, ১৪১০





সৌম্যদীপ দেব, ত্রিপুরা 

৫ই মার্চ ২০২১

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner