Type Here to Get Search Results !

"শক্তির উৎস ও আরাধনা" ঃ মনীষা গুপ্ত পাল, ত্রিপুরা

জ্ঞানই আলো ,জ্ঞানই জ্যোতি, জ্ঞানের ভান্ডার অসীম অনন্ত ।এই জ্ঞানকে লাভ করতে হবে অন্তরে। বহু সাধুসন্ত ও মহাত্মা ভারতবর্ষের পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করে তাদের মহৎ বাণী ও জ্ঞানের ভান্ডার উজাড় করে দিয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন পুত্তলিকা নির্মাণ করে তাদের ঈশ্বর রূপ দান করেন ।এগুলো সবই অন্তরের যৌগিক প্রকাশ অর্থাৎ নিজেকে তার সঙ্গে যুক্ত করা। তবেই হবে জ্ঞানলাভ। সারা বিশ্বের মধ্যে ভারত বর্ষ হচ্ছে আধ্যাত্মিক মহাপীঠ স্থান, ভারত বর্ষ হচ্ছে মহাকাল।

পুরানে কথিত আছে দক্ষ রাজার কন্যা সতী পিতার অনিচ্ছায় মহাদেবের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।দক্ষরাজ মহাদেব কে একদম পছন্দ করতেন না, কারণ তিনি আপনভোলা মহাযোগী। শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়ান। আসলে শিব অর্থে পরমাত্মা যিনি পরম পুরুষের সঙ্গে যুক্ত এবং সতী হলেন প্রকৃতি ।প্রকৃতি বিনা সৃষ্টিকার্য চলা সম্ভব নয় ।

পুরাণের কথা অনুসারে  একবার স্বর্গের দেবতারা এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেখানে দেবতা, মুনি ঋষি, গন্ধর্ব, কিন্নর সবাই উপস্থিত ছিলেন। শিবের শ্বশুর মহাপ্রজাপতি  দক্ষও আমন্ত্রিত হয়ে সভায় উপস্থিত হলে ব্রক্ষ্মা-- বিষ্ণু-- মহেশ্বর ছাড়া সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু জামাতা মহেশ্বর উঠে না দাঁড়ানোয় শ্বশুর দক্ষ খুব অপমানিত বোধ করেন। তিনি এমনিতেই জামাতা শিবকে পছন্দ করতেন না, তাই মনে মনে স্থির করলেন এই অপমানের প্রতিশোধ নেবেন তিনি  অচিরেই।


কিছু দিনের মধ্যে মহা প্রজাপতি দক্ষও এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই মহাযজ্ঞে তিনি স্বর্গের সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও স্বাভাবিকভাবেই আপন জামাতার সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাকে নিমন্ত্রণ করলেন না।  এছাড়া  দক্ষরাজ ছিলেন বৈদিক ক্রিয়াকান্ডের পক্ষে আর শিব ছিলেন যৌগিক ক্রিয়াকান্ডের পক্ষে ।যোগসাধনা ছিল তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য। যজ্ঞের কথা শুনে কন্যা সতী স্বামীর আদেশ অমান্য করে পিত্রালয়ে গমন করলেন । কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সতী পিত্রালয়ে এসেছিলেন তা সফল হলো না। স্বামীর উদ্দেশ্যে পিতার কটুকথা ও যজ্ঞ সভায় অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্ম হননের পথ ধরলেন ,দেবীর এই কাজে মহাদেবের বা শিবের আসন টললো। অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে তিনি শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হয়ে মৃতা পত্নীর শবদেহ কাঁধে নিয়ে শুরু করলেন তাণ্ডব। শব কাঁধে তিনি সমগ্র ভারত ভ্রমণে নেমে পড়লেন। তার তাণ্ডবে সমগ্র সৃষ্টি রসাতলে যাবার উপক্রম হল। দেবতারা প্রমাদ গুনলেন। তখন বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্রের দ্বারা দেবীর দেহকে ৫১ টি খন্ডে বিভক্ত করলেন । 


এই একান্নটি খন্ড পরে একান্ন পীঠস্থান রূপে পরিচয় লাভ করলো। পীঠ অর্থ যেখানে শক্তির অবস্থান। 

ভারতের বিভিন্ন স্থানে সতীর দেহের বিভিন্ন অংশ পড়েছিল। আর তা থেকেই পরবর্তীকালে এক একটি পীঠস্থান গড়ে ওঠে তীর্থক্ষেত্র হয়েছে। তেমনি একটি তীর্থস্থান রাঙ্গামাটি তে(বর্তমান আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর মাতাবাড়ি) ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের মন্দির ।

মা কালী দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী ।দেবী দুর্গার একটি রূপ। তন্ত্র সাহিত্যে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায় যেমন দক্ষিণা কালী ,মহাকালী ,শ্মশান কালী,গুহ্য কালী ,ভদ্রকালী, সিদ্ধ কালী ,আদ্দা কালী, চামুণ্ডা কালী, এইসব রূপের মাঝে দক্ষিণাকালী সর্বাধিক  পূজিত। তিনি চতুর্ভূজা।

শিব পুরাণ মতে মায়ের দক্ষিণ পদ রাঙ্গামাটিতে( বর্তমান উদয়পুর )পতিত হয়েছিল। তবে অন্যান্য পীঠ দেবীর মত ত্রিপুরেশ্বরী মাতা বরাবরই এই স্থানে থাকেননি কোন এক সময়ে তিনি রুষ্ট হয় চট্টলের চন্দ্রনাথ পর্বতে অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ধন্য মানিক্য স্বপ্নাদেশ পান যে তাদের রাজলক্ষ্মী ত্রিপুরেশ্বরী চট্টলে অবস্থান করছেন ও মগদের হাতে পূজা পাচ্ছেন ।দেবীর আদেশে ত্রিপুরার রাজা ধন্য মানিক্য মগদের যুদ্ধে পরাজিত করে মা ত্রিপুরেশ্বরী কে উদ্ধার করেন । দৈববাণী হলো দেবীকে নিয়ে আসার সময় যেখানে ভোর হবে সেখানেই মন্দির স্থাপিত হবে। উদয়পুর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অনুচ্চ টিলার উপরে (কচ্ছপের পিঠের আকারে) অবস্থিত একটি স্থানে ভোর হলো , সেই থেকে এই স্থানে দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে ।মায়ের মূর্তি খানি কালো কষ্টিপাথরের ষোড়শী মাতৃকা। ত্রিদেবের পঞ্চমুন্ডি আসন বেদীতে দণ্ডায়মান। দেবী সমপদে শিব বক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন। চারহাত, ডানদিকে উপর  ও নীচের হাতে যথাক্রমে বর- মুদ্রা ও অভয় মুদ্রা, বাম দিকের উপর হাতে খড়্গ  ও নীচের হাতে অসুর মুন্ড। দেবী ধারিণী গলায় তেরোটি নর মুন্ডমালা ,মুখাবয়ব পাহাড়ি রমণীর মত সরলা। প্রতি অমাবস্যা ও দীপাবলিতে এই ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে  নিষ্ঠাভরে দেবী পূজা সম্পন্ন হয়। অন্যান্য পীঠস্থানের মত এটিও একটি বিখ্যাত পীঠস্থান।


শক্তিরূপিণী মায়ের আরাধনায় মেতে উঠবে বাঙালি, মেতে উঠবে  আনন্দে উৎসবে।মা মঙ্গল দায়িনী তাই মায়ের কাছে সকলের করজোড়ে প্রার্থণা ---- সবার মঙ্গল করো মা। কল্যাণ করো সর্বজীবে। শান্তি সুধা ঢালো ধরণীতে।।

"সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে

 শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তুতে।"


মনীষা গুপ্ত পাল

ত্রিপুরা







আরশিকথা অত্তিথি কলাম


ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

৩রা নভেম্বর ২০২১

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.