এমপি দুর্জয় পত্নী এখন ‘মাটি খেকো ভাবি’ - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২০

এমপি দুর্জয় পত্নী এখন ‘মাটি খেকো ভাবি’

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ব্যুরো অফিস: বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ-১ আসনের এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে ঘিরে জেলার সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দুর্জয় এমপি ও তার ঘনিষ্ঠজনদের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি নিয়ে প্রকাশিত খবরাখবরই এখন আলোচনা সমালোচনার শীর্ষে রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চায়ের দোকান সর্বত্রই চলছে আলোচনার ঝড়। এদিকে, এমপির চাচা টিপু জায়গা কেনাবেচা থেকে কমিশন হাতানোর অপকর্ম করলেও দুর্জয় পত্নীর পরিচয় ছড়িয়ে পড়ছে ‘মাটি খেকো ভাবি‘ হিসেবে। সর্বত্রই জায়গা জমির মাটি খনন করে তা বিক্রি করা এবং খাল-নদী ড্রেজিং করে বালু বাণিজ্যের নেশা পেয়ে বসেছে তাকে। আরিচা ঘাটের অদূরে নদীর ভাঙ্গন ঠেকানোর নাম করে সরকারী টাকায় বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার দিয়ে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে নিহালপুর এলাকায় যে মজুত গড়ে তোলা হয়েছিল সে বালুও এখন এমপি দুর্জয় পত্নী ফারহানা রহমান হ্যাপীর নেতৃত্বে ধুমছে বেচাকেনা চলছে। বিআইডব্লিউটিএ সাধারণ নাব্যতা সংকটের কারণে ড্রেজিং করে থাকে। কিন্তু এখানে এবার কোন নাব্যতা সংকট হয়নি। শুধু এমপি পত্নীর বালুর ব্যবসার জন্যই কেবল এ ড্রেজিং করা হয়। যে কারণে এবার বর্ষা আসার আগেই আরিচায় নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। মূলত বালু বাণিজ্যই এখন আরিচাঘাটের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বিভিন্ন এলাকায় তিন ফসলি আবাদী জমি থেকে মাটি কেটে পার্শ্ববর্তী কয়েটি ইটভাটা ও স্থানীয়দের কাছে বিক্রয় করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যেখান থেকে এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কেটে মাটিবাহী ট্রাক এবং ট্রাক্টরে যুক্ত ট্রলি দিয়ে ভাটাগুলোতে পৌঁছে দিচ্ছে এসব মাটি ব্যবসায়ীরা। আবার কৃষকদের বেশি অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ফসলের জমি কেটে নিয়ে বিক্রয় করছে। অপ্রতিরোধ্য এ মাটি ব্যবসায়িরা প্রায় সকলেই দোর্দণ্ড দাপুটে। পান থেকে চুন খসলেই তারা সবাই এমপি পত্নীর ক্ষমতা ব্যবহার করে থাকেন। যে কারণে তাদের অবৈধ মাটি বাণিজ্যে বাধা দেয়ার সাধ্য কারো নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক, ট্রাক্টর, মিনি ট্রাক করে মাটি নিয়ে ভাটাগুলোতে পৌঁছে দিচ্ছে। উপজেলার ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কের মেগা ফিড কারখানার পেছনে অন্তত তিনটি স্পটে ফসলি জমি কেটে প্রায় ১৫-২০টি মাটিবাহী ট্রাক দিয়ে ফসলি জমির ওপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে জোরপূর্বক মাটি ট্রাকে নিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বেলতা, জমদুয়ারা, কৃষ্ণপুর, বিলপাড়া, উথুলী, বাড়াদিয়া, আড়পাড়া, আমডালা, উলাইল, ফলসাটিয়া, মানিকনগর, বুতুনী, ঢাকাইজোড়া, নয়াবাড়ি, পয়লাসহ অর্ধশতাধিক স্পট থেকে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উথুলী এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, জোর করে আমার ফসলি জমির ওপর দিয়ে মাটি নেওয়ার রাস্তা বানিয়েছে। আমরা কৃষক মানুষ কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো জানি না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়েছি। মেগাফিড এলাকার কৃষক চাঁন মিয়ার কাছে মাটি কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, আমার জমি আমি মাটি বিক্রয় করছি, এতে আপনার কোনো সমস্যা আছে কি না? প্রশাসনের লোক তো আমাদের কিছু বলে না। ভূমি অফিসের মাধ্যেমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন কি না বললে তার কোনো উত্তর দিতে পারেননি। শিবালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউর রহমান জানান, কৃষি জমির ফসল উৎপাদনের প্রাণ হলো টপ সয়েল। মাটির ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত থাকে এ উর্বরতা। তা কেটে নিলে কখনও ভালো ফসল হবে না। জমি ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা হারাবে। যে হারে মাটি কাটা হচ্ছে তাতে এ উপজেলায় আবাদী জমির পরিমাণ কমে যাবে। যা আমাদের কৃষির জন্য খারাপ। শিবালয় উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ উথলী-জাফরগঞ্জ সড়কের পাশে বাশাইল-কলাবাগান নামক স্থানে কান্তাবতী নদী থেকে কতিপয় ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। মাটি বোঝাই ছোট-বড় ট্রাকসহ যানবাহনের চাপে গ্রামের রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে, ধুলা-বালিতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। ফলে এলাকাবাসীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, যমুনার শাখা কান্তাবতী নদী জাফরগঞ্জ থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরবর্তী বাড়াদিয়ায় এসে ইছামতিতে মিশেছে। বর্ষায় নদীতে প্রবল স্রোত থাকলেও শুষ্ক মওসুমে নদী বক্ষের অনেকাংশে পলি জমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নদী বক্ষে ড্রেজার ও এস্কেবেটর দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে বর্ষায় কান্তাবতী নদীর পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নদীবক্ষে যত্রতত্র মাটি কাটায় বর্ষায় এর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পার্শ্ববর্তী সড়ক, ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয় থেকে সরকারি অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা নিষেধ হলেও প্রভাবশালীরা এর কোনো তোয়াক্কা না করে দিবা-রাত্রি এমন অপৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। মাটি-বালিকে কেন্দ্র করে ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় থানা এলাকায় বহুমুখী বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে চক্রটি। তারা এমপি পত্নী ফারহানা রহমান হ্যাপী ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেই মাটি বাণিজ্যকে নির্বিঘ্ন রেখেছে। সেখানে মাটি ও বালু উত্তোলন, বিক্রি এমনকি সরবরাহ কাজ থেকে আলাদা আলাদা বখড়া আদায়ের ঘটনাও ঘটে। ঘিওরের জোঁকা এলাকায় গড়ে ওঠা অটো ব্রিকফিল্ডে মাটি সরবরাহকারীরা জানান, সেখানে প্রতি ট্রাক মাটি সরবরাহ দিতে এমপি'র ক্যাডারদের ২০০ টাকা হারে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু মাটির ঠিকাদারী কিংবা বালু বাণিজ্যের কথা সরাসরি অস্বীকার করে ফারহানা রহমান হ্যাপী বলেন, বালু-মাটির ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে দলীয় ছেলেপেলেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হলে, বিবাদের সৃষ্টি হলে তাদের ডেকে ঝামেলা মিটিয়ে দেয়াটা তো অপরাধ না। ফারহানা রহমান হ্যাপী আরও বলেন, আমি কোনো রকম ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক কোনো ফায়দা হাসিল করতে চায়। এক প্রশ্নের জবাবে ফারহানা রহমান হ্যাপী জানান, এলাকার সাংগঠনিক নেতা-কর্মীরা চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে জড়িত নয়। তবে তাদের মধ্যে নানা কারণেই বিরোধের সূত্রপাত ঘটতে পারে। এছাড়া নদী খনন বা বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এমপি সাহেব বরাবরই কঠোর। সেখানে আমাদের মাটি-বালু বাণিজ্যে আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। অন্যদিকে, এমপির চাচা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তায়েবুর রহমান টিপুর অত্যাচারে শিবালয় এলাকায় কেউ জমি কিনতে পারছে না। কোন শিল্পপতি জমি কিনতে গেলেই তিনি প্রতি শতাংশে ৫ হাজার টাকা করে দাবি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে গত এক বছরে অন্তত ২০টি শিল্প গ্রুপের মালিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উথলী, শিবালয় ও পাটুরিয়া এলাকায় বিস্তর জায়গা জমি কেনার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সেসব জায়গা জমি রেজিস্ট্রি করার পূর্ব মুহূর্তে টিপুর সহযোগিরা প্রতি শতাংশ বাবদ বখড়া পরিশোধের দাবি জানায়। ফলে ভবিষ্যতে নানা ঝক্কি ঝামেলার আশঙ্কায় ওই শিল্প গ্রুপগুলো সেখানে জায়গা কেনা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কর্মকাণ্ড থেকে পিছু হটে যায়। শিবালয়ের আলোকদিয়ার চরে সোলার বিদ্যুৎ প্লান্টের কাজ থমকে গেছে এমপির জন্য। কারণ ওই প্লান্টের মাটি ভরাটের কাজে বাজার দরের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দাবি করায় ওই কোম্পানি আর এগোয়নি।

১১ই জুন ২০২০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner