২০০৭ সালের ৭ মার্চ। বনানীর ‘হাওয়া ভবন’ থেকে যখন তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘতম এবং কণ্টকাকীর্ণ প্রবাস জীবনের সূচনা হতে যাচ্ছে। ২০ বছর পর রাজসিক প্রত্যাবর্তন হলো তারেক রহমানের। আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন।
২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যখন তিনি জামিনে মুক্তি পান, তখন তিনি কেবল একজন অসুস্থ মানুষ ছিলেন না, ছিলেন এক অপরাজেয় সংগ্রামের প্রতীক। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সেই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনে পাড়ি জমান। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, এই নির্বাসনই তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানবে। কিন্তু ফিনিক্স পাখি যেমন ছাই থেকে জেগে ওঠে, তারেক রহমানও লন্ডনের নির্বাসিত জীবনকে কেবল চিকিৎসার সময় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পাঠশালা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
নির্বাসনে থেকেও দলের প্রাণভোমরা
১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসনে আটলান্টিকের ওপারে থেকেও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বিশাল রাজনৈতিক দলকে সুসংগঠিত রাখার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন তারেক রহমান। লন্ডনের কিংস্টনে থাকা অবস্থা অবস্থায় ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিপুল জনমতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এটি ছিল তৃণমূলে তার জনপ্রিয়তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
যখন বাংলাদেশের মাটিতে বিএনপি এক চরম দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারেক রহমান স্কাইপ এবং জুমের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা শুরু করেন। তাঁর এই ‘ভার্চুয়াল নেতৃত্ব’ ছিল তৎকালীন সরকারের জন্য এক মস্ত বড় আতঙ্ক।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া এক বিতর্কিত মামলায় কারাবরণ করলে বিএনপির নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দেন আরও একবার।
তিনি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে সকল সিনিয়র নেতাকে এক মঞ্চে রাখতে সক্ষম হন। বেগম জিয়ার অনুপস্থিতিতে তিনি কেবল দলীয় প্রধানের ভূমিকা পালন করেননি, বরং প্রতিটি কর্মীর কাছে ‘আস্থার অভিভাবক’ হিসেবে আবির্ভূত হন। তার নির্দেশনায় বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শুরুতেই তারেক রহমান বিএনপির সকল অঙ্গ-সংগঠনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে সাধারণ ছাত্রদের পাশে ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে। তার এই নির্দেশনার ফলে ছাত্রদল ও যুবদল রাজপথে সক্রিয় হয়, যা আন্দোলনের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
তারেক রহমানের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল দেশের সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ‘এক দফা’ দাবির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাম-ডান সব মতাদর্শের দলগুলো এক প্ল্যাটফর্মে এসে দাড়ায়, যা শেখ হাসিনা সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে, বিশেষ করে ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ সফল করতে তিনি সর্বস্তরের মানুষকে রাজপথে নামার চূড়ান্ত ডাক দেন।
বীরের বেশে দেশে ফেরা
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের বীরের বেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট (জলাই-৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে) পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেদিন বিকেলে পূর্বাচলের বিশাল জনসভায় তিনি এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের ঐতিহাসিক 'আই হ্যাভ প্ল্যান' ভাষণের আদলে তিনি ঘোষণা করেন, 'আমার একটি পরিকল্পনা আছে'। দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব এবং অসুস্থতার সাথে লড়াই করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন গোটা জাতি স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। বেগম জিয়ার প্রয়াণের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে তৃণমূলের গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত শোকের মায়া নেমে আসে। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়া ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক। তার মৃত্যুতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার মতো একমাত্র ব্যক্তিত্ব ছিলেন তারেক রহমান।
দলের স্থায়ী কমিটি এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তারেক রহমানকে 'চেয়ারম্যান' হিসেবে অভিষিক্ত করার। শোকের সেই আবহে নয়াপল্টনে সমবেত লাখো নেতাকর্মীর অশ্রুসিক্ত নয়নে তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বিরামহীন প্রচারণায় নতুন জাগরণ
নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারেক রহমানের দেশব্যাপী ঝটিকা সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। গত ২২ জানুয়ারি সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহ পরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারণায় বিরামহীন পথসভা ও জনসভা করেন তারেক রহমান।
এবারের প্রচারণায় তারেক রহমান প্রচলিত জনসভার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার কৌশল বেছে নেন। অনেক সমাবেশে তিনি দর্শকদের মঞ্চে ডেকে নিয়ে তাদের সমস্যার কথা শোনেন।
প্রচারণার প্রতিটি মঞ্চে তারেক রহমান একটি সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, কৃষক ও পরিবারের জন্য বিশেষ কার্ড এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ভাতার প্রতিশ্রুতি দেন।
নির্বাচনী যুদ্ধ ও ভূমিধস বিজয়
দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরল বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং মিত্রদের নিয়ে গঠিত জোট মোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারেক রহমান নিজে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ হয়। বঙ্গভবনের দরবার হলের প্রথা ভেঙে এবারই প্রথমবারের মতো এখানে শপথ নিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা।
আজকের এই রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের শৈশব ছিল অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর করাচিতে তার জন্ম। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাত্র চার বছর বয়সে তিনি মায়ের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন।আশির দশকের শেষ দিকে তারেক রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করেন। তিনি ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন এবং সরাসরি তৃণমূল থেকে কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়ের নেপথ্যেও অবদান ছিল তারেক রহমানের। সে সময় তিনি 'হাওয়া ভবন'কে একটি আধুনিক থিঙ্ক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ডাটাবেজ তৈরি, নির্বাচনী প্রচারণা এবং তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য তার আধুনিক সব পরিকল্পনা বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সাহায্য করে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারের কোনো প্রশাসনিক পদে বসেননি। এই সময়ে তিনি দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ঘুরে ঘুরে 'তৃণমূল প্রতিনিধি সভা' করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নেতার তৃণমূলের প্রতিটি স্তরে যাওয়ার এমন নজির বিরল। তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন, 'তৃণমূলের শক্তি, বিএনপির মুক্তি।'
আরশিকথা বিদেশ সংবাদ
১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

