নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র মাসখানেক। এরই মধ্যে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—রাজ্যের বিভিন্ন রেল স্টেশন থেকে শুরু করে বড় বড় বাজার এলাকায় হকার উচ্ছেদ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
আমার যেহেতু অশোকনগর রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বসবাস, তাই এই বিষয়টির সঙ্গে আমার আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসা অনেকের তুলনায় বেশি জড়িয়ে আছে। আমার কাছে এটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি বাস্তবতা।
বর্তমানে অনেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের মতামত প্রকাশ করছেন। জনমানসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে উন্নয়নের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ দেখছেন জীবিকা হারানোর আশঙ্কা হিসেবে। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, আগামী দিনে এর ইতিবাচক দিকের তুলনায় নেতিবাচক প্রভাবই হয়তো বেশি প্রকট হয়ে উঠবে।
গতকাল তার একটি বাস্তব চিত্র দেখলাম। অশোকনগরের পাশের স্টেশন হাবড়ায়, যেখানে কিছুদিন আগেই হকার উচ্ছেদ হয়েছে। ব্যক্তিগত কাজে বাড়ি ফেরার পথে প্রায় আধঘণ্টা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেই সময় সামান্য একটি পানীয় বা খাবারও সহজে পাওয়া গেল না। চারদিকে শুধু ভাঙা কাঠামোর স্তূপ আর একরাশ হতাশা নিয়ে বসে থাকা কিছু মানুষের মুখ চোখে পড়ল। সেই দৃশ্য মনে এক অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল।
রেল স্টেশন শুধু যাতায়াতের জায়গা নয়। আমাদের মতো বহু পরিবারের কাছে এটি প্রয়োজনের সময় ভরসার জায়গা। বাড়িতে রান্নার সমস্যা হলে আমরা স্টেশন সংলগ্ন দোকান থেকে স্বল্প খরচে খাবার কিনে খেয়েছি। কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাই সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর সময়ও আমরা দেখেছি, এই মানুষগুলোর অনেকেই ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন।
আজ সেই মানুষগুলোর জীবন-জীবিকা একটা অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। কয়েক লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। তাদের পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও গভীরভাবে প্রভাবিত হবে। এর পাশাপাশি আগামী দিনে সামাজিক অবক্ষয় ও যুবসমাজের অসন্তোষ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। শহর সুন্দর হওয়াও জরুরি। কিন্তু উন্নয়নের অর্থ কখনোই মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হতে পারে না। তাই সরকারের কাছে আবেদন, উচ্ছেদের আগে কর্মহীন মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
কারণ, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। একটি সভ্য সমাজের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষ থাকে।
শহর সুন্দর হোক, কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমার এই আবেদন।
দেবাশীষ মজুমদার
অশোকনগর, কোলকাতা
আরশিকথা অতিথি কলাম
১৮ই জুন ২০২৬

.jpg)