নিজস্ব সংবাদদাতা, আগরতলা, আরশিকথাঃ
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে আগরতলায় অনুষ্ঠিত হল এক বর্ণাঢ্য, মননশীল ও হৃদয়স্পর্শী সাংস্কৃতিক উৎসব। আন্তর্জাতিক সাহিত্য ঘরানার আয়োজনে এবং আগরতলা মেলারমাঠস্থিত এগিয়ে চলো সংঘের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান সাহিত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও কথাশিল্পের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।
রবিবার সন্ধ্যায় এগিয়ে চলো সংঘ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান যেন শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না, বরং ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে স্মরণ করার এক আবেগঘন প্রয়াস। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত দর্শকদের কাছে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে সুর, শব্দ ও অনুভূতির এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বরিষ্ঠ সাংবাদিক সুবল কুমার দে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য ঘরানার মুখ্য উপদেষ্টা বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ড.আশিস কুমার বৈদ্য, এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন 'এগিয়ে চলো সংঘ'-র সভাপতি চঞ্চল নন্দী, সম্পাদক সুমন্ত গুপ্ত এবং সংস্থার অপর উপদেষ্টা বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গল্পকার ড. বিথীকা চৌধুরী এবং সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক কামনা দেব সহ সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
অনুষ্ঠানের সূচনায় স্বাগত ভাষণ দেন কামনা দেব। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কেবল দুই কবির নাম নয়, তাঁরা বাঙালির চেতনা, মনন ও মানবিকতার দুই চিরন্তন আলোকবর্তিকা। একজন বিশ্বমানবতার বাণী নিয়ে এসেছেন, অন্যজন সাম্য ও মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু উভয়েরই লক্ষ্য ছিল মানুষকে জাগ্রত করা এবং মানবতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।”
এরপর আন্তর্জাতিক সাহিত্য ঘরানা-র সাংস্কৃতিক শাখা ‘ঘরানা পরম্পরা’-র গীতিআলেখ্য দিয়ে পরিবেশনায় শুভ সূচনা হয় কামনা দেব রচিত বিশেষ গীতিআলেখ্য। সঙ্গীত শিল্পী পিয়ালী দাস সহ সংস্থার সদস্য শিল্পীদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং অনুষ্ঠানের সূচনাতেই সৃষ্টি করে এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক আবহ।
সন্ধ্যার বিভিন্ন পর্বে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, আবৃত্তি, তারানা নৃত্য এবং সোহিনী সঙ্গীত কলাকেন্দ্রের ক্ষুদে শিল্পীদের দ্বারা এক মনোমুগ্ধকর তবলার লহরী-
পরিবেশনা, যা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় এবং অনুষ্ঠানকে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনোৎসবে রূপ নেয়। শুধু বিনোদন নয়, অনুষ্ঠানটির মূল উপজীব্য ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সময়ে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও মূল্যবোধের সংকটের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা এবং নজরুলের সাম্যের বাণী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সম্মাননা প্রদান পর্ব। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উত্তরীয়, স্মারক ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে সম্মানিত করা হয়। এই পর্ব উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাজ্যের সুপরিচিত কথাশিল্পী নন্দিতা ভট্টাচার্য। তাঁর সাবলীল, প্রাণবন্ত ও সাহিত্যঘন উপস্থাপনা গোটা অনুষ্ঠানকে একটি সুসংবদ্ধ শিল্পযাত্রায় রূপ দেয়। তবলায় ছিলেন কৃষ্ণ দাস এবং সিন্থেসাইজারে ছিলেন কনিষ্ঠ ক্ষুদে শিল্পী শ্রেহান দেব। যাঁদের দক্ষ পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
সন্ধ্যা যত গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে,এটি কেবল একটি জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান নয়, এটি ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই মহান পুরুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি, মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আহ্বান এবং শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজকে আরও সুন্দর করে তোলার এক আন্তরিক প্রয়াস।
উপস্থিত দর্শক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও অতিথিবৃন্দ আন্তর্জাতিক সাহিত্য ঘরানার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও এমন বৃহত্তর সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। আগরতলার সাংস্কৃতিক পরিসরে এই অনুষ্ঠান এক উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
আরশিকথা ত্রিপুরা সংবাদ
১৫ই জুন ২০২৬



.jpeg)



.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)

.jpeg)

.jpeg)
