রোদ'টা অনেক্ষণ আগেই চলে গেছে। নভেম্বর মাসের এই সময়টায় রোদের তেজ অনেকটাই কমে আসে। এই নরম রোদ গায়ে মেখে নিতে বরাবরই খুব ভালো লাগে পরিমল বাবুর। আজকে আর কিছুই ভালো লাগছে না। তবুও অভ্যাস বোধহয় মানুষ সহজে ছাড়তে পারেনা। শুধু কী সেই কারণেই নাকি অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বারান্দার একদম শেষ প্রান্তে ইজি চেয়ারে বসে আছেন পরিমলবাবু। কনে দেখা আলো এসে পড়েছে বাগানের গাছগুলোর ওপর। পরম যত্নে ওদের লালন পালন করতো পরমা। ছেলে বড় হয়ে বাইরে চলে যাবার পর থেকে বাগানটাই ওর সন্তান হয়ে উঠেছিল। পরমা চলে গেছে আজ তেরো দিন হয়ে গেলো। আজ নিয়মভঙ্গের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল। বাড়ি ভর্তি লোকজন। এত ভিড় ভালো লাগছিল না পরিমলবাবুর। বরাবরই নির্জনতা প্রিয় মানুষ তিনি। অবশ্য এখন থেকে তো নির্জনতা ও একাকীত্ব তাঁর একমাত্র সঙ্গী। এত দুঃখের মধ্যেও ঠোঁটের কোণে অল্প হাসির ঝিলিক খেলে যায়। একাকীত্ব? এটাই বরাবর তাঁর মন চেয়েছিল না? সামান্য প্রশ্নের উত্তর দিতেও যে বিরক্তি গ্রাস করত তাঁকে, সেই মানুষটাও তো আজ আর নেই। দু'দিন বাদে ছেলেও বাইরে চলে যাবে। অফিস আছে, বৌমার স্কুল আছে, ছোট্ট তাথই'য়ের পড়াশোনা আছে। পুরো সংসার ফেলে কতদিন বা এখানে পড়ে থাকতে পারবে ওরা? ছেলে অনেক করে বলেছে-- বাবা তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। রাজি হননি পরিমল বাবু। এত বড় বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া যে অসম্ভব সেটাই তিনি ছেলেকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি পরমার স্মৃতি আঁকড়েই জীবনের শেষ কটা দিন বেঁচে থাকতে চান তিনি।
সবার থেকে আলাদা হয়েওনির্জনতাকে সেই ভাবে উপভোগ করতে পারছেন না পরিমলবাবু। টুকরো টুকরো হাসি আর কথার শব্দ ভেসে আছে নিচ থেকে। হিন্দুদের এই নিয়মটাকে মানতে বাধ্য হলেও খুব একটা মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। একটা মানুষ চলে যাওয়ার ঠিক এগারো দিনের মাথায়, তাঁর আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে যে ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন হয় এবং লোকসমাগম হয়, তাতে কতটা শ্রদ্ধা নিবেদন থাকে সেই বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায় মনে। শ্রদ্ধা নিবেদন? নাকি, দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার মাধ্যম? এতটা বয়স হয়ে যাওয়ার পর তিনি আজও বুঝে উঠতে পারেননি। যদি এই অনুষ্ঠান কষ্টের হয়, তবে মানুষ দুঃখ ভুলে হাসতে পারে কি করে? নাকি তাঁর নিজের যুক্তি সম্পূর্ণ ভুল? একটা দুঃখকে আঁকড়ে তো বেশি দিন বেঁচে থাকা যায় না? যাতে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, সেই কারণেই কি এই অনুষ্ঠান? না, এই প্রশ্নের উত্তর আজও জানা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পরমা ? তাঁকে ভুলবে কী করে?
মাত্র উনিশ বছর বয়সে লাল বেনারসি শাড়িতে প্রথম এই রায় বাড়িতে পা রেখেছিল পরমা। বাবাই পছন্দ করে নিয়ে এসেছিলেন। পরমার যত্ন,প্রতিমুহূর্তে পরিমল বাবুকে বুঝিয়ে দিত-- বাবার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে একদম সঠিক কাজ করেছিলেন তিনি। অনেক ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছেন পরিমল বাবু। বাবা আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথা ভাবেননি। খুব যত্ন করে বড় করেছিলেন তাঁকে। বিয়ের পর পুরো সংসারের দায়িত্ব নিজের ছোট্ট কাঁধে তুলে নিয়েছিল পরমা।
বাবার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবাকে সেবা -যত্নের এতোটুকু ত্রুটি বুঝতে দেয়নি মেয়েটা। পরম যত্নে সংসারটাকে আগলে রেখেছে সারা জীবন। কিন্তু পরিমলবাবু ? তিনি কী পরমাকে মূল্য দিতে পেরেছিলেন? চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। কী চেয়েছিল তাঁর কাছ থেকে তাঁর স্ত্রী? একটু সময়। সেটুকুও তো সেই ভাবে দেননি কোনদিন। অল্প কথা বলা পরমা কোনদিন তো সেভাবে অভিযোগও করলো না! হয়তো মাঝেমধ্যে একটু ঘুরতে যেতে চেয়েছে বিকেল বা সন্ধ্যাবেলা। কতদিন হয়েছে তৈরি হয়ে বসে থেকেছে বেচারা, অফিস থেকে ফিরতে পারেনি পরিমল বাবু। মৃদু অভিযোগ জানাতে গিয়েও স্বামীর কাছে ধমক খেয়ে
চুপ করে গেছেন। সময় দিতে পারেননি? নাকি সময় দেওয়াটা প্রয়োজন বলে মনে করেননি?
পরমা একটু আবদার করলেই পরিমল বাবু বলেছেন -- বিয়ের কিছু বছর বাদে নিজের জগৎ তৈরি করে নিতে হয়। সব সময় স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে যাব বললে হয় না। আচ্ছা, নিজের জগৎ কি তৈরি হয়েছিল পরমার ? আর সেই ভাবে বলতোও না তো, পরিমলবাবুকে সময় দেওয়ার জন্য। ছেলেকে নিয়েই কাটিয়ে দিত বেশিরভাগ সময়। শ্বশুরের সঙ্গে খুব ভাব ছিল বৌমার। দুজনের মধ্যে অনেক গল্প চলতো। কিন্তু বাবা চলে যাবার পর সেভাবে তো আর কথা বলার লোকও ছিল না। ছেলেটা ছিল, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে সেও তো পুনেতে সেটল হয়ে গেলো। ছেলেটা চলে যাবার পর পরমা একদম একা হয়ে গিয়েছিল। আচ্ছা, তখন কেন পরিমল বাবুর একবারও এই কথাগুলো মনে হয়নি! রিটায়ারমেন্টর পরেও কেন পরমার সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে উঠল না তাঁর? খবর শোনা, রোজ মর্নিংওয়াক আর সন্ধ্যাবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজবেই তো কেটে গেল অনেকগুলো দিন। পরমা'কে তো বোঝাই হয়ে উঠল না কোনদিন। সংসারের কাজ করার পর বইয়ের মধ্যে ডুব দেওয়া পরমাকে একবারও বোঝার চেষ্টা করলেন না কেন তিনি?
সন্ধে নেমে গেছে অনেকক্ষণ। তুলসীতলার দিকে চোখ যায় পরিমলবাবুর। এই সময় ওখানে রোজ সন্ধ্যা দিতে পরমা। আজ তুলসী তলাটা ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। আচ্ছা, গাছগুলো কী দীর্ঘশ্বাস ফেলছে? প্রথম থেকেই গাছের শখ ছিল পরমার। কতদিন মর্নিংওয়াক থেকে ফেরার পর
গেট দিয়ে ঢোকার সময় লক্ষ্য করেছেন, পরম যত্নে গাছগুলোর পাতায় হাত বোলাচ্ছে পরমা। মনে হতো যেন ফিসফিস করে কথা বলছে ওদের সঙ্গে।
আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে ---কী বলতো পরমা ওদের? ওদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তো কোনো উত্তর পাবেন না। আর যাঁর থেকে উত্তরটা জানা যেতো, সে তো আজ না ফেরার দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। যে পরমা একদিন নিজের সব কথাগুলো বলতে চেয়েছিল তার সব থেকে নিজের মানুষটাকে, সেই কথাগুলোই শোনা হয়ে ওঠেনি। সময় বার করতে পারেননি তিনি। তবে আজ কেন ••••
নিচে থেকে ওপরে উঠে আসে বৌমা। পরিমল বাবুর দিকে চা'টা এগিয়ে দিয়ে বলল -- এবার ঘরে চলুন বাবা। একটু একটু ঠান্ডা পড়ছে। এই সময় বাইরে আর বসে থাকবেন না। আর দূ'দিন বাদেই আমাদের চলে যেতে হবে, আপনি কিছুতেই আমাদের সঙ্গে গেলেন না, এত বড় বাড়িতে একা থাকবেন, খুব চিন্তা নিয়ে যাব আমরা। চলুন না বাবা আমাদের সঙ্গে।
শুধুমাত্র কাজের লোকের ওপর নির্ভর করে থাকা যায়?-- বৌমার কথায় আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না পরিমল বাবু।
হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন ছোট্ট বাচ্চাদের মতন।
তারপর বললেন--না বৌমা, আমি কোথাও যাবো না।
পাশে সঙ্গিনী থাকতেও নিজের মধ্যে বসবাস করতেই তো আমি বেশি চেয়েছি। আজ মনে কত প্রশ্ন আমার। অথচ উত্তর দেওয়ার জন্য যে একদিন ব্যাকুল হয়েছিল, সেই মানুষটা আজ আর কোথাও নেই। তবুও প্রশ্নগুলো তো আছেই। আমি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবো।উত্তরগুলো খুঁজবো ওর নিজের হাতে গোছানো এই সংসারটার মধ্যে, সন্তান স্নেহে যে গাছগুলোকে ও লালন -পালন করেছিল, উত্তর খুঁজবো ওদের কাছে।
উত্তর পাবো কিনা জানিনা। তবুও আমি আমার পরমাকে খুঁজবো তাঁর পরম যত্নে সাজানো এই সংসারটার মধ্যে। তুমি নিচে যাও বৌমা। দিদিভাইকে কিছু খাইয়ে দাও। আমি আবার আমার একাকিত্বের মধ্যে ডুব দিয়ে দেখি, পরমাকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা ••••
কলমেঃ সঙ্ঘমিত্রা চৌধুরী
শ্রীরামপুর, হুগলি
আরশিকথা সাহিত্য
ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট
২রা আগস্ট ২০২৬

.jpg)
