আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    উপহার ।। ছোট গল্প ।। ক্যামেলিয়া ভট্টাচার্য ।। আগরতলা ।। আরশিকথা সাহিত্য

    আরশি কথা

    শ্রীমতী বন্দনা গোস্বামী, স্বর্গীয় বিপুল চন্দ্র গোস্বামী, যিনি বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, চা পাতার ব্যবসা করতেন, মুলত আসাম, দার্জিলিং, সিকিম, সব জায়গায় ফ্যাক্টরি আছে, ওনার স্ত্রী । এখন সবকিছু দুই ছেলের নামে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে । একজন আছে আসাম, আরেকজন আছে দার্জিলিং । কিন্তু বন্দনা দেবী থাকেন গ্যাংটকে । বড় ছেলের দুই মেয়ে, বিন্দিয়া ও কণিকা । ছোটো ছেলের দুই ছেলে নবারুন ও দিব্যজ্যোতি । থাকে ঠাকুরমা এর কাছে । কারণ খুব আদর পাচ্ছে ।  ঘরে  চারজন চাকর আছে । সবকিছু রুটিন অনুসারে হচ্ছে । যা চাইছে, তাই পাচ্ছে । কিন্তু পড়াশোনা করার একদম আগ্রহ নেই । বিন্দিয়া দশ বছর, কণিকা পাচ বছর, নবারুন নয় বছর, দিব্যজ্যোতি চোদ্দ বছর । তাই ঠাকুর মা খুব চিন্তিত ওদের ভবিষ্যত চিন্তা করে । একদিন বিপুল বাবুর এক বন্ধু বেড়াতে আসেন । সবার সঙ্গে কথা বললেন, সবার সঙ্গে সময় কাটালেন, খুব ভালো লাগলো ওনার ।

      যাবার আগে বন্দনা দেবী কে একটি মূল্যবান কথা বলে গেলেন । বললেন, “আমার একজন পরিচিত শিক্ষিকা আছে, টিউশন পড়ায় । বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ এর মধ্যে । নাম শিমুল চৌধুরী । আপনি বললে সে এসে পড়াতে পারবে ।”  সব একদিন ঠিক হয়ে গেলো । ফি চাইলো পাচ হাজার টাকা । কারণ চার জন কে পড়াতে হবে । শিমুল কাছাকাছি থাকে, বেশী দূরে নয়, তাই হেঁটে যাওয়া, আসা করতে পারবে । সময় ঠিক হলো বিকেল পাচ টা থেকে সাত টা । ঠাকুরমা খুব খুশি হলেন । মেয়েটা এসেছে কলকাতা থেকে, আজ প্রায় পাচ বছর হয়ে গেলো,সে শুধু টিউশন করছে । এমনিতে মাস্টার্স করেছে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে । কিন্তু এখন মোটামুটি সব বিষয়ই পড়াতে পারে । তার সঙ্গে তার মা, বাবা, ও বড় ভাই থাকে । ছোটো বেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছে ছিল মেয়েটার । তাই কম বয়সেই অনেক টাকা রোজগার করেছে । যাইহোক, প্রথম দিন সোমবার, বিকেলে শিমুল আসলো, ও পড়ার ঘর এ গিয়ে ঢুকলো । দেখলো টেবিল সব আলাদা । দিব্যজ্যোতি কে ইশারা করলো । সে সব বই দেখালো । তারপর, বাকিরা একে একে দেখালো । প্রায় এক ঘন্টা কেটে গেলো । শিমুল লক্ষ করলো, সবার মধ্যে মনোযোগের অভাব আছে । কিন্তু, পড়াশোনায় কেউ খারাপ নয় । কারণ, আদর ওরা যথেষ্ট পাচ্ছে । কোনো কিছুর অভাব নেই । বাবারা টাকা পাঠাচ্ছে, সব কিছুই তাদের কাছে সহজলভ্য । শিমুল অনেক হোম ওয়ার্ক দিলো । সে বন্দনা দেবীর সাথে যাওয়ার আগে বললো, “আপনি চিন্তা করবেন না । কিছুদিনের মধ্যেই ওরা স্কুল যাওয়া শুরু করবে ।” শুনে তিনি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন । 

     কেটে গেলো প্রায় তিন মাস । “নবারুন বললো, ম্যাডাম আমরা তো অনেক কিছু শিখে ফেলেছি, যা গত একবছর এও পারিনি ।”  শুনে শিমুল বলে, “একদম ঠিক বলেছো বাবা, পরের বছর থেকে তোমরা আবার স্কুল যাওয়া শুরু করবে । এখন তো বছরের প্রায় শেষ হয়ে আসছে ।” কণিকা এক লাফ দিয়ে বলে উঠলো, “আমরা কেউ স্কুলে যাবো না । যা পড়ব, ঘরেই পড়ব, শিখবো, জানবো ।”  সবাই মুখ ভার করে বসে রইলো । শিমুল বুঝলো, মানুষের সাথে মেলামেশা না করার ফলে, ওদের বাইরে যাবার ভয় আছে । সে এই কথাটা বন্দনা দেবী কে জানাল । বাড়ির গিয়ে সে মা কে বলে, “জানো মা, বাচ্চা গুলো স্কুলে যেতে চায়না, বলে, যা করার ঘরে করবে, কোথাও যাবেনা । এ আবার কি কথা বলো ।”  মা বললেন, “ওরা কি আর এইসব বুঝে বলেছে রে, না রে, মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে, পারবে না, তাই বলেছে । সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে. তার জন্যে যথেষ্ট সময় দিতে হয় ।”  শিমুল ভাবলো, এই চার জন কে বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতে হবে, বন্ধুত্ব করার সুযোগ দিতে হবে । একদিন সে সবাইকে একটি পার্কে  নিয়ে গেলো, সঙ্গে ওদের ঠাকুরমা গেলেন । সেখানে অনেক ছেলেমেয়ে এসেছে । খেলা করছে, দৌড়চ্ছে । কণিকা চুপ করে বসে রইলো. কিছুক্ষণ পর একটি সুন্দর ছোট্ট মেয়ে আসলো তার কাছে, বললো, “তুমি খেলবে না.... চলো, আমরা কানামাছি খেলব.... কি বলো, আমার আরো বন্ধু আছে ।”  কণিকা কোনো কথাই বললো না । শিমুল তার কাছে গিয়ে বললো, “যাও খেলতে, না হলে তোমাকে কেউ ভালবাসবেনা । গিয়ে দেখবে, অনেক ছেলেমেয়েরা খেলা করছে । সবার সঙ্গে কথা বলবে, যাও সোনা ।”ছোট্ট মেয়ে টা এক টান মেরে কণিকা কে তুলে নিয়ে গেলো । নবারুন ও বিন্দিয়া পেছনে গেলো । দিব্যজ্যোতি দেখলো, দূরে কতগুলো ছেলে বসে চেস খেলছে । ও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো,কারণ একা বসে থাকতে ভালো লাগছে না । গিয়ে খেলায় মন দিলো । শিমুল কানামাছি খেলা দেখেই তৃপ্ত বোধ করলো । পেরিয়ে গেলো প্রায় দু ঘন্টা । বন্দনা দেবী বললেন, “চলো, এবার বাড়ি ফেরা যাক । আবার না হয় পরে এসো ।”  তাই হলো । ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাচ্চারা ঘর এ ফিরে এলো । ওদের মুখের ভাব বদ্‌লে গেলো । খুব আনন্দ পেলো । 

                    শিমুল মনে মনে খুশি হলো, কারণ এখন সে লক্ষ করলো, বাচ্চা গুলো কথা বলতে, গল্প করতে, মজা করতে ভালোবাসে । পড়াশোনা খুব মন দিয়ে করছে, হোম ওয়ার্ক সবসময় তৈরী রাখছে, শিমুল এতটা পরিবর্তন দেখে অভিভূত হয়ে গেলো । এরপর, সে একদিন ওদের মন্দির, বন্ধু দের বাড়ি, ইত্যাদি জায়গায় কিছুদিন পর পর বেড়াতে নিয়ে গেলো । সবার সাথে এত সুন্দর ওরা মিশে গেলো, যেনো মনেই হলো না, একসময় ওরা কথাই বলতে চাইতো না । দিন গড়িয়ে গেলো দিনে দিনে । একদিন শিমুলের বাড়ি এসে উঠল সবাই । দাদা তো কণিকা কে দেখেই কোলে তুলে নিলো । কণিকা চিৎকার করে বললো, “নামাও, নামাও, আমি এখন বড় হয়ে গেছি, সব কাজ করতে পারি ।”  নবারুন হেসে বললো, “হা আঙ্কেল, বেশী দিন ছোট হয়ে থাকতে ভালো লাগে না ।”  সবাই জোর গলায় হেসে উঠলো । শিমুলের বাবা বললেন, “তুই তো সব গুলো কে বড় নয়, একেবারে পাকা ঝুনো বানিয়ে ফেলেছিস । আর কোনো চিন্তা নেই ।”  মেয়ে বলে, “না বাবা, পাকা শুধুই কথায়.... এখনো স্কুল যাওয়ার মতো সাহস হয়নি ।”  কণিকা দৌড়ে এসে শিমুল কে জড়িয়ে ধরে বলে, “কে বলেছে আন্টি, তোমাকে এসব কথা । আমরা সবাই স্কুল যাবো । না হলে সবকিছু শিখবো কেমন করে ।”  শুনেই তার মা, বাবার চোখ কপালে উঠে গেলো । মা মেয়ে কে চুপি, চুপি বললেন, “তুই সত্যই কি জাদু করেছিস ওদের উপর । কি ছিল, আর ছয় মাসে দেখি মানসিকতা পাল্টে গেলো ।” শিমুল বললো, “ওদের তাকার অভাব নেই, শুধু ছিল না, আদর ও শাসন । এই ভাবেই ছোটদের মন বুঝতে হয় । সব হাতের কাছে দিয়ে রাখলেই স্নেহ প্রকাশ পায় না । সময় মতো সবকিছু পাওয়া হলো আসল কথা ।”  একদিন, বন্দনা দেবী শিমুল কে বললেন, “তুমি ওদের প্রাইভেট টিউটর থাকবে সবসময় । রাতেই এসে পড়াবে, কারণ এখন ওরা স্কুল যাওয়া শুরু করেছে. তুমি প্রমাণ করেছো, শুধুমাত্র বই পড়ালে শিক্ষিকা হওয়া যায় না । তার জন্যে দরকার, ভালোবাসা, বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস । তাই আমি হয়তো যেটা পারতাম না, সেটা তুমি করেছো । ব্যবসায়ী বাড়িতে মূল্যবোধ গড়ে তুলেছো ”  শিমুল স্বলজ্জিত চিত্তে মাথা নিচু করে রাখলো । কিছুদিন পর ছেলেরা বউ নিয়ে বেড়াতে এলো । মা এর মুখে সব কথা শুনলো । শিমুল কে যে ওরা কি বলে ধন্যবাদ দেবে, তা বুঝেই পেলো না । নবারুন ও দিব্যজ্যোতি খাবারের টেবিল এ বসে ওদের আন্টির খুব প্রশংসা করলো । কিছু দিন পর কথা বলতে বলতে বন্দনা দেবীর ছেলেরা শিমুল কে পাচ লাখ টাকা উপহার স্বরূপ দিতে চাইল । কিন্তু সে খুব কষ্ট পেলো মনে মনে আর বললো, “দাদা,  টাকা দিয়ে কখনো জ্ঞানের মুল্য বিচার করা যায় না । বাচ্চারা ভালো মানুষ হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, আত্মনির্ভর হবে, এবং সেটাই হবে আমার জন্যে সবচেয়ে দামী উপহার ।”


     
    ক্যামেলিয়া ভট্টাচার্য

    আগরতলা

    আরশিকথা সাহিত্য

    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ৫ই আগস্ট ২০২৬

     

    3/related/default