আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    বিশ্ব কবিতা দিবসে ধর্মনগর যাত্রা: এক স্মরণীয় সাহিত্যিক সফর ।। দীপেন নাথশর্ম্মা ।। আরশিকথা অতিথি কলাম

    আরশি কথা

    ১শে মার্চ—বিশ্ব কবিতা দিবস। এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করে ধর্মনগরের “পয়েটস ইউনিট”-এর আন্তরিক আমন্ত্রণে আমরা কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক এক আনন্দঘন সাহিত্যিক সফরে অংশগ্রহণ করি। আমার সহযাত্রী ছিলেন কবি বন্ধু শ্রীমতী করুণা দেবনাথ, শ্রীমতী সুমিতা রায়, কবি সুব্রত আচার্য, কবি রাজীব আচার্য, কবি সুব্রত দেব, কবি অনিমেষ ঋষিদাস, কবি ও পাঠক গৌতম অধিকারী এবং আমার পুত্র শ্রীমান দীপ্যমান।


    ভোরের নির্মল আলোয়, সকাল ৬টায় আমরা খোয়াই থেকে তেলিয়ামুড়া রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। নির্ধারিত সময়ে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে আগরতলা–করিমগঞ্জ লোকাল ট্রেনে উঠে পড়ি। সেদিন ট্রেনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় আমাদের যাত্রাকে কিছুটা ক্লান্তিকর করে তুললেও, আমবাসা স্টেশন অতিক্রম করার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয় এবং আমরা বসার আসন লাভ করি। ট্রেনের মৃদু দোলায়, গল্প ও হাস্যরসে ভর করে সময় যেন অজান্তেই বয়ে যায়।

    অবশেষে প্রায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমরা ধর্মনগরে পৌঁছাই। স্টেশন থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল ধর্মনগর শহরের কিরণ গেস্ট হাউস। “পয়েটস ইউনিট”-এর সম্পাদক, বিশিষ্ট সমাজসেবক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও সুপরিচিত এডভোকেট শ্রী হৃষিকেশ নাথ মহোদয় আমাদের জন্য পূর্বেই অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থাপনা করে রেখেছিলেন। গেস্ট হাউসে পৌঁছেই ধর্মনগরের বিশিষ্ট কবি শ্রী হেমন্ত দেবনাথ মহোদয়ের আন্তরিক অভ্যর্থনায় আমরা আপ্লুত হই। তাঁর সৌজন্য ও আতিথেয়তায় আমাদের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।

    অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সঙ্গে যোগ দেন কবি, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক শ্রী নিবারণ নাথ এবং বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী সঞ্জীব রায়। আমরা স্নান-সেরে, কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে দিনের মূল অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হই। মধ্যাহ্নভোজের সুনিপুণ আয়োজন আমাদের নতুন উদ্যমে ভরিয়ে তোলে।

    দুপুর ২টায় আমরা অনুষ্ঠানস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিই এবং বিকেল ৩টায় প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। ত্রিপুরা ও আসামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক মহৎ সাহিত্যিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

    অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও পরিচালনার গুরুদায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেন কবি নিবারণ নাথ। তাঁকে সহযোগিতা করেন কবি হেমন্ত দেবনাথ, কবি মধুমিতা ভট্টাচার্য্য, কবি জয়ত্রী চক্রবর্তী এবং নাট্যকার সঞ্জীব রায়—যাঁদের দক্ষ উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও সুশৃঙ্খল।

    এক এক করে প্রায় ৮০ জন কবি তাঁদের সৃষ্টিকর্ম পাঠ করেন। কবিতার আবেগ, শব্দের সৌন্দর্য ও ভাবের গভীরতা শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। মাঝে মাঝে সঙ্গীত পরিবেশন অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য করে তোলে।

    অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব ছিল সংবর্ধনা প্রদান। কবি সুজিত দেব, কবি রত্নময় দে এবং কবি দীপক নাথ মহোদয়কে  এবারের ২০২৬- সাহিত্য সম্মাননা প্রদান করা হয়, যা উপস্থিত সকলের মধ্যে বিশেষ আনন্দ ও গর্বের সঞ্চার করে।

    এছাড়াও অনুষ্ঠানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিন ও গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। “পয়েটস ইউনিট”-এর বার্ষিক কবিতাপত্র "শব্দনীল" (সম্পাদক: হৃষিকেশ নাথ), "অনার্য" (সম্পাদক: রসরাজ নাথ), "মঙ্গলদীপ" (সম্পাদক: মধুমঙ্গল সিনহা) প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি কবি মিলন দেব-এর কাব্যগ্রন্থ "মা" এবং উপন্যাসিক আলপনা নাথ-এর অনুগল্প সংকলন "অনুগল্প সম্ভার" প্রকাশ পায়—যা অনুষ্ঠানে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

    স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন অনুষ্ঠানের আয়োজক, “পয়েটস ইউনিট”-এর সম্পাদক তথা কবি নাট্যকার গবেষক এডভোকেট শ্রী হৃষিকেশ নাথ মহোদয়। তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।


    পরবর্তীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সন্তকবি হিসেবে পরিচিত কবি মিলন কান্তি দত্ত, গবেষক ও সাহিত্যিক মন্টু দাস, কবি ও প্রকাশক গোবিন্দ ধর, ধর্মনগর বুক সেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শ্রী দ্বিজেশ ভট্টাচার্য্য, বিশিষ্ট লেখিকা চিরশ্রী দেবনাথ, কবি রসরাজ দেবনাথ, কবি গোপাল চন্দ্র দাস, কবি হারাধন বৈরাগী, কবি দিব্যেন্দু নাথ, ধাঁধা কবি দীপক নাথ, আসাম থেকে আগত কবি পরিমল কর্মকার ও তাঁর সহধর্মিনী শ্রীমতী জয়ন্তী কর্মকার এবং আমি সহ অন্যান্য বিশিষ্টজন তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে তাঁদের বিশ্লেষণ আমাদের চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

    দিনব্যাপী এই সাহিত্যোৎসব আমাদের মনে এক গভীর আনন্দ ও প্রেরণার সঞ্চার করে। অপরিচিত মানুষের মধ্যেও যে এত আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা লুকিয়ে থাকতে পারে—এই সফর তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

    সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হালকা বৃষ্টি—মনে হয় যেন প্রকৃতিও এই সাহিত্য উৎসবকে আশীর্বাদ জানাচ্ছে। এই সময়ে উদ্যোক্তাগণ সবার জন্য হালকা টিফিন, রসগোল্লা এবং চায়ের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা করেন, যা উপস্থিত সকলের মধ্যে এক উষ্ণ ও আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

    অনুষ্ঠান শেষে সকল কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে একটি স্মরণীয় ফটো সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দিনভর সাহিত্যচর্চার আনন্দ ও মিলনমেলার মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি হয়ে থাকে।

    রাত সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলেও, আমাদের মন তখনও ভরে ছিল দিনের অমলিন স্মৃতিতে। আমরা অনুষ্ঠান শেষে গেস্ট হাউসে ফিরে আসি, কিন্তু তখনও আমাদের মধ্যে সেই আনন্দময় মুহূর্তগুলোর রেশ স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছিল। সাড়ে নয়টার সময় নিকটবর্তী  রামঠাকুর হোটেলে রাতের খাবার সেরে আমরা আবার নিজ নিজ কক্ষে ফিরে আসি।

    পরের দিন, ২২শে মার্চ, ভোরের স্নিগ্ধ প্রহরে সকাল ৫টা ৪০ মিনিটের ট্রেনে আমরা ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ফিরে আসার পথেও মনে পড়ছিল সেই উষ্ণ অভ্যর্থনা, আন্তরিকতা আর একাত্মতার অনুভূতি।

    উদ্যোক্তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা আমাদের সকলকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে—যা দীর্ঘদিন আমাদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।


    দীপেন নাথশর্ম্মা

    খোয়াই, ত্রিপুরা


    আরশিকথা অতিথি কলাম

    ২৩ মার্চ ২০২৬


     

    3/related/default