ত্রিপুরার খোয়াই সিঙ্গিছড়া আচার্য পাড়ায় প্রতি বছরের মতো এ বছরও গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্যের গরিমা এবং প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে বাসন্তী পূজা। ২০০৬ সালে সূচিত এই পূজা আজ একুশতম বর্ষে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় পূজাটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পাড়ার মানুষের ঐক্য, সংস্কৃতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সামাজিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
এই পূজার সূচনালগ্নের কথা স্মরণ করলে আজও গর্বে ভরে ওঠে পাড়ার মানুষের হৃদয়। প্রথম বছরে সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিবব্রত আচার্য, সভাপতি ছিলেন মনু আচার্য এবং কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন সুব্রত আচার্য। তাঁদের সঙ্গে বিষ্ণুপদ আচার্য, প্রাণেশ আচার্য, পরেশ আচার্য, সুজিত আচার্য, যোগেন্দ্র শুক্লবৈদ্য, রাকেশ শীল সহ আচার্য পাড়ার বহু উৎসাহী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি একত্রিত হয়ে এই মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তাঁদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও দূরদর্শিতার ফলেই একটি ছোট্ট উদ্যোগ আজ একটি বৃহৎ ও সুসংগঠিত সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।
খোয়াই সিঙ্গিছড়া আচার্য পাড়ার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল—এখানে অধিকাংশ মানুষই আচার্য সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তারা একে অপরের নিকট আত্মীয় ও স্বজাতি হিসেবে মিলেমিশে বসবাস করেন। ফলে এই পূজা শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এক বিশাল পারিবারিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
পাড়ার ছোট-বড় সকলেই পূজার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সমগ্র আয়োজনের প্রতিটি পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কেউ মণ্ডপ নির্মাণে ব্যস্ত, কেউ আলোকসজ্জায়, কেউ আবার ভোগ রান্না ও প্রসাদ বিতরণে—সব মিলিয়ে পাড়া জুড়ে এক কর্মচাঞ্চল্য ও আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে।
এ বছর পূজা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সমীর আচার্য, সম্পাদক ঝুটন শীল এবং কোষাধ্যক্ষ অভিজিৎ আচার্য। তাঁদের দক্ষ নেতৃত্ব, সুপরিকল্পনা এবং সকলের সহযোগিতায় এবারের পূজার আয়োজন আরও সুশৃঙ্খল, আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস।
সৃজনশীল প্যান্ডেল, দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা, মনোমুগ্ধকর আলোকসজ্জা এবং পরিপাটি ব্যবস্থাপনায় এবছর পূজামণ্ডপ এক অনন্য নান্দনিক রূপ ধারণ করবে।
প্রতি বছর বাসন্তী পূজা উপলক্ষে প্রতিদিনই ভক্তদের ভিড় চোখে পড়ার মতো হয়। ভোরের পূজা থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আরতি পর্যন্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ভক্তদের আন্তরিক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। সন্ধ্যাবেলায় ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও পবিত্র ও আবেগময়।
এছাড়াও, পূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—যেমন সঙ্গীত পরিবেশনা, নৃত্য, আবৃত্তি প্রভৃতি—পাড়ার মানুষকে এক অন্যরকম আনন্দের অনুভূতি প্রদান করে।
এ বছরের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে প্রথমবারের মতো খোয়াই শহরের বিশিষ্ট কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে নবমী তিথিতে স্বরচিত ধর্মীয় কবিতা পাঠের জন্য। এই উদ্যোগ পূজার সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে সকলের প্রত্যাশা। কবিদের উপস্থিতিতে নবমীর অনুষ্ঠান এক অনন্য সাহিত্যিক আবহ তৈরি করবে, যা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য হবে এক নতুন অভিজ্ঞতা।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণও এবারের পূজায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করে তাদের নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দেবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে। পাশাপাশি প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা পূজার সার্বিক আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।
ভোগ প্রসাদ বিতরণ, অতিথি আপ্যায়ন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায়ও পাড়ার মানুষের আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্য বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্ত ও অতিথিরাও এই পূজার উষ্ণ আতিথেয়তা ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।
এই বাসন্তী পূজার সূচনালগ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েকজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁদের অম্লান স্মৃতিতে পাড়ার মানুষ আজও আবেগাপ্লুত। প্রয়াত হয়েছেন এই পূজার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা দু'জন সম্পাদক শিবব্রত আচার্য এবং কুটি আচার্য, সভাপতি মনু আচার্য এবং দীর্ঘদিনের বাসন্তী পূজার পূজারী প্রাণেশ আচার্য। বিশেষ করে, প্রাণেশ আচার্য মহাশয় গতকাল সোমবার ২৩/০৩/২০২৬ তারিখে পরলোকগমন করেছেন, যা এই পূজার সঙ্গে যুক্ত সকলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তাঁদের নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রমই এই বাসন্তী পূজাকে আজকের এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁদের স্মৃতি ও আদর্শ চিরকাল পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ঐতিহ্য রক্ষায় অনুপ্রাণিত করবে।
সব মিলিয়ে, খোয়াই সিঙ্গিছড়া আচার্য পাড়ার বাসন্তী পূজা কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি একতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার এক অপূর্ব সম্মিলন।
বছরের পর বছর ধরে এই পূজা পাড়ার মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্য একইভাবে অটুট থাকবে এবং আরও ব্যাপক আকারে বিকশিত হবে—এই আশাই ব্যক্ত করছেন উদ্যোক্তাগণ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিক তথা প্রথম কমিটির কোষাধ্যক্ষ শ্রী সুব্রত আচার্য মহোদয়।
দীপেন নাথশর্ম্মা
খোয়াই, ত্রিপুরা
আরশিকথা অতিথি কলাম
২৪ মার্চ ২০২৬



