ক্রিকেট যখন রূপকথা এঁকে যায়,
ইডেনে, লর্ডসে,মেলবোর্নের ঘাসে:
আকাশের নিচে গ্যালারির সাত রঙে,
সাদা পোশাকের সোবার্সও ফিরে আসে।
সেই কোন সুদূর ছোট্টবেলায়, গুটিগুটি পায়ে স্কুল যাবার আগেই বাবার কাছে জেনেছিলাম ক্রিকেটের মহাকাব্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছ'জন খেলোয়াড়ের নাম। প্রথমত থ্রি ডাবলু'স--ওরেলউইক্স, ওয়ালকট।
দ্বিতীয়তঃ থ্রি এস'এস
সোবার্স, সোলেমান, স্মিথ। বিশাল মহাসাগরের তরঙ্গের মধ্যে যে ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, তারাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ নাম দিয়ে যখন ক্রিকেটের আসরে অবতীর্ণ হলো এবং যাঁদের প্রায় একশো ভাগ খেলোয়াড়ের গায়ের রং ছিল কালো, তাঁদের বলের গতি, ব্যাটিং প্রতিভা এবং অবিশ্বাস্য ফিল্ডিং দক্ষতা সমগ্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিলো। বিশেষ করে ডন ব্যাডম্যানের অস্ট্রেলিয়া আর ডাব্লু জি গ্রেসের ইংল্যান্ডের ক্রিকেট আভিজাত্য যেন মুখোমুখি সংঘর্ষের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল। সেই ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম একটি দ্বীপের নাম বার্বাডোজ। সেখানেই জন্ম গরিব ঘরের ছেলে গারফিল্ড সেন্ট আউব্রানের। পরবর্তীকালে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া যাঁকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার ও সুভদ্র ক্রিকেটার এবং মানুষ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে --স্যার গারফিল্ড সোবার্স নামে। (১৯৩৬-২০২৬) গত ১৭ ই জুলাই ২০২৬, বিকেল ছোঁয়া দুপুরবেলায়, কলকাতার অ্যাপেলো হসপিটালে বসে আমি যখন দুরুদুরু বুকে ভাবছি আমার পেট সিটি'র রেজাল্টটা কী আসবে? ক্যান্সার কী আবার আমাকে জাপটে ধরবে ? নাকি, আলতো আদর করে মানুষের মিছিলে হাঁটার জন্য অনুমতি দেবে ? ঠিক সেইদিন, আমার ও আমার মতোন লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্রিকেট দেবতা স্যার গারফিল্ড সোবার্স ,পাগল করা নস্টালজিয়ায় আমাদের আচ্ছন্ন করে, ডুবিয়ে-ভাসিয়ে, স্বর্গের পারিজাত বাগানে চলে গেলেন। রয়ে গেল মাইকেলের মেঘনাথ বধ কাব্যের মতো সাহিত্যের পাশাপাশি ক্রিকেটের অনন্য মহাকাব্য। না, কর্পোরেট দুনিয়ার রংবেরঙের পোশাক পরা ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নয়, চিরদিনের সাদা পোশাকের ক্রিকেটের ক্লাসিক অধ্যায়--পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেট ।
আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, সেই ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি মাসে ইডেনে ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় দিনে খেলা চলছে। স্কুলের পথে যেতে যেতে, রেশন অফিসের মোড়ে একটা চায়ের দোকানের গমগমে রেডিওতে কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার অজয় বসুর গলা তখন থরথর করে কাঁপছে -- এগিয়ে এসে তুলে মেরেছেন সোবার্স। অনেক উঁচুতে বল তারার মত লাগছে। প্রায় বাউন্ডারি লাইন থেকে ছুটে আসছেন এম এল জয়সিমা। এতো শক্ত ক্যাচ আদৌ ধরতে পারবেন কি? (আমাদের পা"গুলো তখন রেশন অফিসের সামনে রাস্তার পিচের ওপর লোহার মতো গেঁথে গেছে। পরের মুহূর্তেই অজয় বসুর কন্ঠ বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় ঘোষণা করলো)--আউট- আউট -আউট। সোবার্স আউট। বিশ্বাস করুন বন্ধুরা ,আমি জীবনেও কোনদিন সোবার্সকে চোখে দেখিনি, অথচ তিনি আমাদের আড়িয়দহ-দক্ষিণেশ্বর থেকে মাত্র পনেরো-কুড়ি কিলোমিটার দূরে,সেদিন ইডেন গার্ডেনসে রানের ফুলছুরি ছুটিয়ে, জয়সীমার অবিশ্বাস্য ক্যাচে আউট হয়ে গেলেন। সাদা পোশাক আর লাল বলের ক্রিকেট আমার মতো অনেককেই আজও পাগল করে দেয়। যাঁরা ক্রিকেট বলতে টেস্ট ক্রিকেটকেই বোঝেন, তাঁদের কাছে আমাদের গ্রামের দল আড়িয়াদহ স্পোর্টিং ক্লাবের পাঁচিল ঘেরা মাঠে,ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেট এর মতো কলকাতার সিএবি লিগের দ্বিতীয় ডিভিশনের খেলাও ছিল সমান আকর্ষক। সারাটা দিনের আয়ু হলেও আমরা যেন পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটের বিস্ময় কুড়িয়ে নিতাম সেই খেলা থেকে। আমার কাছে সাদা পোষাক আর লাল বলের ক্রিকেট আজও এতটাই আকর্ষণীয়! একজন বোলার যখন বলের পালিশ রাখতে, প্যান্টে বল ঘষতে ঘষতে বেশ খানিকটা জায়গা লাল করে দিতেন,দর্শক হয়ে সেটা দেখাও ছিল ভীষণ নস্টালজিক। ফিরে আসি সোবার্সের কথায়। ক্রিকেট দুনিয়ায় এ পর্যন্ত বিশাল মাপের যে অলরাউন্ডারদের আমরা দেখেছি, তাঁদের নামগুলো সাজাই--হ্যাডলি, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, কপিল দেব, এবং অনতি অতীতের জ্যাক ক্যালিস, বা বর্তমান ইংল্যান্ডের প্রতিভাবান অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। তবে চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়-- ক্রিকেট দুনিয়ার এই অনন্য অলরাউন্ডারদের মধ্যে অনন্যতম বা শ্রেষ্ঠ আসনটি, স্যার গারফিল্ড সোবার্সের জন্যই নির্দিষ্ট করা আছে। গত শতকের ছ'য়ের দশকে, ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই টেস্টের কথা মনে আছে? পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচকে বিরক্তিকর ড্র করা থেকে বাঁচাতে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুঃসাহসিক ও রোমান্টিক অধিনায়ক স্যার গারফিল্ড সোবার্স শেষ দিনে ইংল্যান্ডের সামনে একটা চ্যালেঞ্জিং টার্গেট রেখে ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দিয়েছিলেন!আজকের টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডের কথা ভাবলে এখন সেই ডিক্লিয়ারকে বোকামি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। কিন্তু তাঁর নাম তো স্যার গারফিল্ড সোবার্স ,সব সময়ই লার্জার দ্যান লাইফ! কাজেই,হেরে গিয়েও স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের দুর্দান্ত প্রশংসা পেছিলেন। গত ১৭ ই জুলাই তাঁর মৃত্যুর পর, সারা দুনিয়ার ক্রিকেট পাগল মানুষ টুপি খোলা স্যালুট জানাচ্ছেন তাঁকে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নেভিল কার্ডাস স্কোর বোর্ডকে গাধা বলেছিলেন বলে শুনেছি। কেন জানেন? ওয়েস্ট ইন্ডিজের জর্জ হেডলিকে সে দেশের ব্র্যাডম্যান বলা হতো। কিন্তু স্কোরবোর্ড দেখলে এত বছর বাদে জর্জ হেডলিকে নতুন প্রজন্ম কী ভাবে চিনবে? স্কোর বোর্ড দেখে কী জর্জ হেডলির প্রতিভা মাপা যায়? আর সোবার্স? রাতের আকাশে খালি চোখে লক্ষ তারা দেখার মতো ঝলমল করছে তাঁর রেকর্ডগুলো। টেস্টে আট হাজারের ওপর রান, ছাব্বিশটা সেঞ্চুরি,দুশো পঁয়ত্রিশটা টেস্ট উইকেট, শতাধিক ক্যাচ, বাঁ হাতে মিডিয়াম পেস ছাড়াও তিন রকম ভাবে স্পিন বল করতে জানা এই মহান ক্রিকেট খেলোয়াড়টি টেস্টের বাইরেও, ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে একটি ওভারের ছ'টা বলকেই ওভার বাউন্ডারি করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে ছিলেন। ভাবা যায়! প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের কখনো স্কোর বোর্ডের সীমাবদ্ধ আঙিনায় বেঁধে রাখা যায় না। আমার যে বছর জন্ম হয়েছে, মানে ১৯৫৮ সালে,সে বছর তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে, পাকিস্তান সফরে এসে, ইংল্যান্ডের লেন হাটনের টেস্ট ক্রিকেটে ৩৬৪ রান রানের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে অপরাজিত ৩৬৫ রান করলেন, আবার বলি, মাত্র ২১ বছর বয়সে! তার অনেকদিন বাদে তাঁর দেশেরই অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারা সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন (১৯৯৪সালে)।
সোবার্সের গল্প বলতে গিয়ে আমরা যেন ভুলে না যাই বিন্নু মানকড় ও বাঙালির অহংকার পঙ্কজ রায়ের টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম উইকেটের জুটিতে করা,নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ৪১৩ রানের বীরগাথার কথা!
১৯৭৪ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের আগে স্যার গারফিল্ড সোবার্স মাত্র একটি একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন বলে জানলাম। সেটাও কিন্তু সাদা পোশাক আর লাল বলের।
"রোজ কতো কী ঘটে যাহা তাহা,
এমন কেন সত্যি হয় না আহা!"
আচ্ছা যদি আজকের টি-টোয়েন্টিতে
ওয়েস্ট-ইন্ডিজ দলে স্যার গ্যারি সোবার্স র্থাকতেন?
ভাবুন একবার,ইডেনে টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে বাউন্ডারির কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ডেনিস লিলি বা টমসন বল করতে ছুটে আসছেন। মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান সোবার্স বলটিকে ব্যাকফুটে গিয়ে অনায়াসে ছয় মেরে দিলেন! সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় টি- টোয়েন্টি ক্রিকেটে টস করতে নামছেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। ১৪ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর, মুখে চুনী গোস্বামীর মতন মিষ্টি হাসি নিয়ে সোবার্স, যেন কিছুই হয়নি এমন করে, ব্যাট করতে নামলেন। বাঁ হাতি সোবার্স আম্পায়ারের থেকে ট্যান্স বুঝে দিচ্ছেন। চিয়ার লিডাররা নাচ ভুলে গিয়ে অবাক হয়ে দেখছেন। আমার মতন একজন সাধারণ ক্রিকেট দর্শক, তাঁর চিরজীবনের ক্রিকেট আইডলকে হাঁ করে দেখছে। স্বপ্ন! এ তো সেই ইডেন, যেখানে রোহান কানহাইয়ের ২৫৬, ভি ভি এস লক্সমনের ২৮৯, জন্টি রোডসের দুরন্ত ক্যাচ, কপিলদেবের পাগল করা ইনসুইং, সৈদ আনোয়ারের দুর্দান্ত ১৯৫, এম এল জয়সিমার দুর্দান্ত ক্যাচ, পতাউদি নবাবের রাজকীয় ক্যাপ্টেন্সি --সবই ঘটে গেছে এই ইডেনে!
ভাবতে ভাবতে, খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, বাড়ি ফেরার কথা ভুলে আমি একা একা আধ কিলোমিটার দূরে,গঙ্গার ধারে বাবুঘাটে কখন যেন চলে এসেছি। দেখি, গঙ্গার ঘাটে ক্রিকেটের ব্যাট হাতে বসে আছেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। কোথাও কোন সিকিউরিটি গার্ড নেই। টি-টোয়েন্টির রঙিন পোশাক ছেড়ে, টেস্ট ক্রিকেটের সাদা পোশাক পরে গুনগুন করছেন ক্যালিপসো সুর। জীবনের চাইতেও ব্যাপক জীবনবাদী ও আদ্যন্ত রোমান্টিক ক্রিকেটার ও সহজ সরল মানুষ স্যার গারফিল্ড সোবার্স কোন গানটা গাইছিলেন জানেন? জামাইকা ফেয়ারওয়েল --But I am sad to say, I am on my way,won't be back for many a day, my heart is down, my head is turning around, I had to leave a little girl in the kingston town...
হোক স্বপ্ন, তবুও আমি স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে বাবুঘাটের সিঁড়িতে বসে, গঙ্গার দিকে তাকিয়ে হাতের ব্যাটটাকে গিটার করে এই গান গাইতে শুনেছি।
হোক স্বপ্ন,তাও আমি শুনেছি।
আরণ্যক বসু
আরশিকথা অতিথি কলাম
ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট
২৬শে জুলাই, ২০২৬



.jpg)

