আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    সোনাইছড়ির সোনামনি অস্মিতা দে । এক অপরাজেয় সংগ্রামের উপাখ্যান । মৃণাল কান্তি পণ্ডিত । ত্রিপুরা

    আরশি কথা

    দক্ষিণ ত্রিপুরার সোনাইছড়ি গ্রামের অস্মিতা দে ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমসে জুডোর ৪৮ কেজি বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অভাবনীয় গৌরব এনে দিয়েছেন। ভারতের ইতিহাসে তিনিই প্রথম জুডোকা যিনি কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চ থেকে দেশের জন্য সোনা ছিনিয়ে এনেছেন। তাঁর এই অনন্য এবং ঐতিহাসিক কৃতিত্বের কারণে আজ তিনি আপামর দেশবাসীর কাছে এবং বিশেষ করে ত্রিপুরার মানুষের কাছে 'সোনাইছড়ির সোনামনি' নামে সমাদৃত। নিচে তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে একটি মৌলিক প্রবন্ধ তুলে ধরা হলো:

    ------------------------------

    ## ভূমিকা

    প্রবাদ আছে, "ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।" কিন্তু অস্মিতা দে-র ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও একটু বাড়িয়ে বলা যায়—অদম্য জেদ আর মানসিক দৃঢ়তা থাকলে দারিদ্র্যের পাহাড় ডিঙিয়েও বিশ্বমঞ্চ জয় করা যায়। ত্রিপুরার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে বিশ্ব ক্রীড়ার মানচিত্রে ভারতের নাম উজ্জ্বল করা এই কন্যার গল্প রূপকথাকেও হার মানায়। নাম 'অস্মিতা', যার আভিধানিক অর্থ আত্মসম্মান বা আত্মসচেতনতা। নিজের নামের সার্থকতা বজায় রেখেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সুযোগের অভাব কখনো স্বপ্নের পথে স্থায়ী প্রাচীর হতে পারে না।

    ## জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

    অস্মিতা দে ২০০৩ সালের ২২শে মার্চ দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়া মহকুমার অন্তর্গত সোনাইছড়ি নামক এক অতি সাধারণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অত্যন্ত দরিদ্র এবং সাধারণ পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা অর্জুন দে পেশায় একজন সাইকেল সারাই মিস্ত্রি ছিলেন, যাঁর মাসিক আয় ছিল অত্যন্ত সামান্য। এই সামান্য আয় দিয়ে তিন সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং অস্মিতার মতো প্রতিভার ক্রীড়াচর্চার খরচ চালানো ছিল এক বিশাল সংগ্রাম। তা সত্ত্বেও অস্মিতার বাবা তাঁর মেয়ের চোখে ডানা মেলা স্বপ্নগুলোকে কখনো ঝরে যেতে দেননি; বরং নিজের সামর্থ্যের শেষবিন্দু দিয়ে মেয়েকে সবসময় উৎসাহিত করে গেছেন।

    ## জুডো খেলায় আগমন ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণ

    সোনাইছড়ির স্থানীয় স্কুলেই অস্মিতার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মাত্র সাত-আট বছর বয়সে নিজের এক আত্মীয়কে দেখে প্রথম জুডোর প্রতি তাঁর আকর্ষণ জন্মায়। শুরুতে তিনি ৮০০ মিটার দৌড়ে অ্যাথলেট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে তাঁর প্রথম কোচের পরামর্শে জুডো ম্যাটে পা রাখেন। ২০১৫ সালে তিনি ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। ন্যাশনাল স্কুল গেমস এবং খেলো ইন্ডিয়ার মঞ্চে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০১৮ সালে তিনি ভূপালের 'সাই' (SAI) আঞ্চলিক কেন্দ্রে (NCOE) উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। এখান থেকেই মূলত তাঁর পেশাদার জুডোকা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে ওঠার ভিত তৈরি হয়।

    ## একের পর এক আন্তর্জাতিক সাফল্য

    ভূপালে কঠোর অনুশীলনের পর অস্মিতাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর সাফল্যের খতিয়ান বেশ দীর্ঘঃ


    * ২০২২ সাল: থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ক্যাডেট এবং জুনিয়র জুডো প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ জিতে তিনি ত্রিপুরার প্রথম জুডোকা হিসেবে আন্তর্জাতিক পদক পান।

    * ২০২৩ সাল: ম্যাকাও জুনিয়র এশিয়ান কাপে স্বর্ণপদক এবং কুয়েত এশিয়ান ওপেনে রৌপ্য পদক জয় করেন।

    * ২০২৫ সাল: মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা আফ্রিকান ওপেনে সিনিয়র ক্যাটাগরিতে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক সোনা জেতেন।

    * ২০২৬ সাল: সিনিয়র এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পঞ্চম স্থান অধিকার করে এশিয়ার অন্যতম সেরা জুডোকা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন।


    ## জীবনের চরম ট্র্যাজেডি ও মানসিক দৃঢ়তা

    সাফল্যের এই সুউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পথটি অস্মিতার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। একবার এক মারাত্মক হাঁটুর চোট তাঁর পুরো ক্যারিয়ারকে প্রায় শেষ করে দিতে বসেছিল। তখন তাঁর বাবা ধার-দেনা করে তাঁকে চিকিৎসার জন্য দিল্লিতে নিয়ে যান এবং সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু নিয়তির ক্রূর পরিহাসে, ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমসের ট্রায়ালের ঠিক কয়েকদিন আগে অস্মিতা দে-র বাবা অর্জুন কুমার দে ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোকে (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

    বাবার এই আকস্মিক মৃত্যুতে অস্মিতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। কারণ বাবাই ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ। কিন্তু তাঁর মা এই কঠিন সময়ে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মাত্র ১০ দিন পরেই মা চোখের জল মুছে অস্মিতাকে বলেন, "আজ যদি আমি তোকে আটকে রাখি, তবে তোর প্রয়াত বাবা ভাববেন আমি তাঁর মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছি।" মায়ের এই কথাই অস্মিতার মনে আবার নতুন করে লড়াইয়ের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি বাবার ছবি সামনে রেখে সোনা জয়ের প্রতিজ্ঞা নিয়ে গ্লাসগোর উদ্দেশ্যে রওনা হন।

    ## কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬: ইতিহাস সৃষ্টি

    স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমসের জুডো আসরে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে অংশ নেন অস্মিতা। কোয়ার্টার ফাইনালে স্কটল্যান্ডের ইভা ইউইং এবং সেমিফাইনালে সামার শ-কে হারিয়ে তিনি ফাইনালে পৌঁছান। ফাইনালে কানাডার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হেইডি কুয়াচের মুখোমুখি হন তিনি। ম্যাচের শুরুর দিকে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও অসামান্য মানসিক শক্তি এবং টেকনিকের জোরে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। রোমাঞ্চকর 'গোল্ডেন স্কোর' পিরিয়ডে কানাডিয়ান জুডোকাকে পরাস্ত করে ভারতের জন্য ছিনিয়ে আনেন ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক। এই জয়ের মাধ্যমে ভারতের কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে প্রথম জুডোকা হিসেবে সোনা জয়ের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়।

    ## উপসংহার

    বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত অস্মিতা দে আজ দেশের কোটি কোটি যুবসমাজের কাছে এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। সোনাইছড়ির মাটি মাখা সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ বিশ্বমঞ্চে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকাকে সর্বোচ্চ স্থানে তুলে ধরেছে। দারিদ্র্য, চোট আর অভিভাবক হারানোর গভীর শোক—সবকিছুকে একপাশে সরিয়ে রেখে অস্মিতা যে রূপকথা লিখেছেন, তা ক্রীড়াজগতে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ইচ্ছাশক্তি এবং নিষ্ঠা থাকলে মাটির কুঁড়েঘর থেকেও বিশ্বজয়ী 'সোনামনি' হয়ে ওঠা সম্ভব।


    কলমে - ইঞ্জিনিয়ার ডাঃ মৃণাল কান্তি পণ্ডিত

    ত্রিপুরা


    আরশিকথা হাইলাইট


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ১২ই আগস্ট ২০২৬

     

    3/related/default