আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    ভালোবাসা তুমি ভালো থাকো ।।  হারিয়ে যেওনা, ফিরে এসো ।। কলমে আরণ্যক বসু ।। আরশিকথা অতিথি কলাম

    আরশি কথা

    হারিয়ে যেওনা, ফিরে এসো

                    


    কোথাও না কোথাও, হয়তো আজও আছো তুমি,

    হারিয়ে যাবার আগে, স্টেশনের কৃষ্ণচূড়া হাত নেড়েছিল?

    জন্মের মাটি কাঁদে, হাহাকারে ,হাহাকারে আজও ডাকে:

    যেমন খুঁজে বেড়ায়, বৃষ্টি ভেজা সদ্য শরতের  চিল।


    হায়রে, আমি কাদের জন্য হাহাকার করছি? যাঁরা যায় তাঁদের মধ্যে পঁচানব্বই শতাংশ মানুষই তো আর ফেরেনা। এই যে পাহাড় টপকানো নেপালের জলোচ্ছ্বাস এতগুলো মানুষকে উড়িয়ে -ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেলো,তাঁদের কজনকে ফিরে পেলাম?

    স্বামী,কিশোর- কিশোরী ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আনন্দ করতে যাওয়া কোন বাড়ির দম্পতি,অথবা ট্রেকিং করতে যাওয়া সেই যুবক ছেলের জন্য মা বাবার বুকফাটা হাহাকার চলছে। ফিরে পাবো আমরা তাঁদের? এটা না হয় প্রাকৃতিক দুর্বিপাক। প্রকৃতির কাছে মানুষ বড্ড অসহায়। একটার পর একটা প্রতীক্ষার দিন পেরিয়ে যাচ্ছে: আমরা সকালের টিভিতে, কাগজে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি, স্মার্টফোনের পর্দায় আকুল প্রার্থনা করছি। 

    এ তো গেলো হারিয়ে যাওয়ার একটা দিক। বাংলার কত বাড়িতে পুজোর দিনে বাড়ির মা দুর্গা আর আসবেনা। তাঁর সন্তানরা পাড়ার প্যান্ডেলেও হয়তো গিয়ে বসবে না। আকুল হয়ে  প্রশ্ন করবে কোন খবর পেলে? বৃদ্ধ বাবা -মা জানলা দিয়ে পুজোর প্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে- ফুঁপিয়ে কেঁদে বলবে--এ কী সর্বনাশ করলে তুমি মা!  ভয়ংকর প্রকৃতির দাপটে মাটির কোন অতলে চাপা পড়ে থাকা, আমাদের স্বজনেরা?  কিন্তু আজকে আমার প্রতিবেদন-- আমার জীবনে হারিয়ে যাওয়া কিছু মানুষের হাহাকার -গাথা।

    আমাদের এলাকায় আদ্যাপীঠের কাছে ছিল বিশুদার সেলুন। নামটা আজও আছে,ঘরটা চিরদিনের জন্য তালাবন্ধ। বিশুদা মারা গেছেন। কিন্তু আমি বলছি বিশুদার বাবার কথা। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর বাংলা জুড়ে যে প্রবল বন্যা সেই বন্যায় হুগলি জেলার খানাকুলে বিশুদাদের দেশের বাড়িতে প্রায় সবকিছুই ভেসে গিয়েছিল। দক্ষিণেশ্বরের সেলুনে বাবা আর ছেলে পালা করে সেলুন চালাতো। বাবা পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধ আশুকাকু, সেই ভয়ংকর সময়টাতে খানাকুলের বাড়িতে ছিলেন। কিছু জমি -জায়গা আর বিশুদার বয়স্কা মা আর তরুণী স্ত্রী সহ বাঁশের দর্মা দেওয়া মাটির ঘর নিমেষের মধ্যে ভেসে চলে গেলো।  কিছুদূর গিয়ে গাঁয়ের মানুষ বিশুদার মা আর স্ত্রীকে উদ্ধার করল। কিন্তু বিশুদার বাবার ঠিক সেইদিন,সেই মুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত খবর পাওয়া যায়নি। ভেসে যাওয়া বহু মানুষ, ডানা ভেঙে যাওয়া দাঁড়-কাক,শরৎ আকাশের নিচে পানকৌড়ি দু-একদিনের মধ্যে ঘরে ফিরে এলো। মহাসমুদ্র বা বিশাল চওড়া নদীও নয় , নদীর উপচে যাওয়া জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া, বিশুদার বাবা তবু কেন ফিরতে পারল না ঘরে? ছোটবেলায় সেলুনে বসে গল্প করতে করতে কী সুন্দর করে আমার চুল কেটে দিতেন। বাবার সঙ্গে গল্প করতেন। বাবা চা এনে খাওয়ালে গ্রামের মানুষের মতো খুশিতে উপচে পড়তেন। বিশুদাও খুব আলাপি মানুষ ছিল। বাবা ছেলে দুজনেই জমিয়ে এখানকার অস্থায়ী সংসারটা চালাত। তারপর বাবা দুবার -তিনবার বাস পাল্টে খানাকুলে পৌঁছে যেত,আবার মাসখানেক পরে ফিরে আসতো। খুঁজে না পাওয়ার জন্য শ্রাদ্ধ-শান্তি না হওয়া সেই মানুষটির জন্য, আমার বুকের পাঁজর এখনো কান্নায় ভেঙে পড়ে। মনে মনে ভাবি সাঁতার জানা একটা গ্রামীণ মানুষ কী অদ্ভুত দূর্বিপাকে খড়-কুটোর মতো ভেসে চলে গিয়েছিলেন!  ইতিহাসের কোন দুর্বিপাকের পাতায় কোথাও তাঁর নাম লেখা নেই। শুধু মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত বিশুদা'র দীর্ঘশ্বাসে বুড়ো বাবাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার চিহ্ন লেগে থাকতো।

              স্কুলে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাড়ার বন্ধুরা ছাড়াও আড়িয়াদহের একটি ছেলেকে এক দেখাতেই, দুর্দান্ত ভালো লেগে গেল। এই ভালোলাগার কোন ব্যকরণ নেই। আসলে আমাদের দুষ্টুমির পাশে প্রবীরের শান্ত -কোমল মুখশ্রী আর অল্প অল্প হাসি ভালো লাগার কারণ ছিল বোধহয়। ফুটবল ক্রিকেট কিছুই খেলতো না, ক্লাসে বসে ছবি আঁকতো। আমার প্রতি ছিল তাঁর অদ্ভুত ভালোবাসা। এই অপ্রতিরোধ্য বন্ধুত্ব যখন হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ঠিক তখনই দেড় বছরের মাথায় ওর বাবা সরকারি চাকরিতে বদলি হয়ে কল্যাণী শহরে চলে গেলেন। আমার তখন কল্যানী সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। তখন সবে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। জ্ঞান থাকারও কথাও নয়,  কিন্তু দুজনের কথা দেওয়া-- প্রতিদিন চিঠি লিখব, পুজোর সময় কল্যাণী যাব, সারা জীবন মনে রাখবো তোর কথা।  তারপর সপ্তাহ শেষে সোমবার ক্লাসে এসে দেখলাম আমার পাশের সিটটা ফাঁকা। তারপর এতগুলো বছরে কয়েকশো বার কল্যাণীতে গিয়ে একবারও প্রবীরের দেখা পায়নি। প্রবীরের যে শান্ত মুখশ্রী তা হারিয়ে যাবার নয়। কুড়ি-  তিরিশ বছর বাদেও সেই মুখশ্রী একই থেকে যায়, বিশ্বাস করুন।  দু-একবার চিঠি চালাচালি হবার পর প্রবীর আর পরিচয় দুজনেই দুজনের জীবন থেকে হারিয়ে গেল: না ভুল বললাম আমার জীবন থেকে প্রবীর হারায়নি। আমি আজও বিশ্বাস করি প্রবীরের সঙ্গে আবার দেখা হবে, হবেই।

            আমার একটি দীর্ঘ কবিতা নাম ছিল-- মিলুদির আকাশ প্রদীপ। অনেক ভালো আবৃত্তি শিল্পীর কন্ঠে তা ধ্বনিত হয়েছে এবং মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটে গেছে। তবুও তার কয়েকটি লাইন না বলে পারছিনা। ঠিক কবিতার লাইন নয় স্মৃতির পাতার কয়েকটি লাইন। আমাদের পাড়ার পুরনো একটা তিনতলা বাড়িতে একটা মধ্যবিত্ত সুন্দর এবং সংস্কৃতি প্রবণ পরিবার সংসার বিছিয়ে ছিল উচ্চশিক্ষিত মা- বাবা,দাদা আর বোনকে নিয়ে। কী সুন্দর সেই পরিবার। আমার দিদির ক্লাসের বন্ধু মিলুদি আমাকে তাঁর স্নেহের আঁচলে বেঁধে রেখেছিল। আমার বয়স তখন ছয় অথবা সাত। দু বাড়ির মধ্যে খুব যাতায়াতও ছিল। মিলুদির বাবা-মা আর আমার বাবা-মা আলোচনা করত --সত্যজিৎ রায়ের ছবি, বহুরূপী নান্দিকারের থিয়েটার নিয়ে ।রেডিওগ্রামে বাজতো সুন্দর সুন্দর মন কেমন করা বাংলা গান। আমরা বসে বসে শুনতাম।

    না বুঝলেও সেই আলোচনাগুলো আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে যেত। দিদি আর মিলুদি ফিসফিস করে গল্প করতো। মিলুদির দাদা -শুভেন্দু দা ভারী চশমা আর অংকের খাতা নিয়ে অবাক হয়ে সবকিছু শুনতো। মিলুদি'র মা-বাবার অনুরোধে,মা একবার গীতা দত্তের তিনটে আধুনিক বাংলা গান খুব দরদ দিয়ে খালি গলায় শুনিয়েছিল। আমি হাঁকরে শুনেছিলাম সেই গান --কত গান হারালাম তোমার মাঝে। আজকে কেন গো বলো ?,সেই গান দোলা দেয় সকাল সাঁঝে? মিলুদিদে'র অভিজাত পরিবারে গান শুনে কেউ দারুণ দারুণ বলে হাততালি দিলো না। কোন আওয়াজ নেই। মুখের অপূর্ব ভঙ্গি আর প্রত্যেকের নিজস্ব নীরবতা বুঝিয়ে দিয়েছিল এই গানটির কোন তুলনা হয় না। মিলুদির বাবা উঠে গিয়ে রেডিওগ্রামে গীতা দত্তের আরেকটি গানের রেকর্ড চালালেন। সর্বকালীন জনপ্রিয় সেই গান--ওই সুর ভরা দূর নীলিমায়,ওই তারা ঘেরা স্বপ্ন সীমায়,যেথা চন্দ্রকলার বাঁকা নায়ে, মোর মন আজ উধাও হতে চায়। 

    মিলুদিদের ভাড়া বাড়ির তিনতলার ছাদে ভাইফোঁটা পেরোনো এক হেমন্ত সন্ধ্যায় চরাচরে নিস্তব্ধতার মধ্যে মিলুদি আমাকে চিনিয়ে ছিল ছায়াপথ কাকে বলে। হেমন্ত আকাশের ছায়াপথ এক অপূর্ব দৃশ্য!  এখনকার মতো তো তখন এত আলোর সমারোহ ছিল না:  তাই অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করেছিলাম ছায়াপথ আর মিনুদের কন্ঠে গান --

    হিমের রাতের ওই গগনের দীপগুলিরে,

    হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।

    এই মিলুদি বা তাঁদের পরিবার যদি আমাদের পাড়ায় থেকে যেতেন,তাহলে আমি যে আরো কত বেশি সমৃদ্ধ হতাম তা বর্ণনা করবার ক্ষমতা আমার নেই। মিলুদির বাবা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ছিলেন। বদলির চাকরিতে বহরমপুরে চলে গেলেন। দিদির সাথে দু-একটা চিঠি লেখালেখি আর ছোট ভাই ঝন্টুকে প্রাণভরা ভালোবাসা জানানো এই পর্যন্তই। তারপর চিঠি লেখা স্তব্ধ হয়ে যায়। আমার দিদি দুঃখ পেয়ে মাঝেমধ্যে কাঁদে।কিন্তু আমি বড় হয়ে গোটা হেমন্তকাল ধরে আকাশ জোড়া ছায়াপথ দেখতে দেখতে মিলুদিকে ডাকি। ডেকেই যাই। মিলুদি নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। বয়স কত পঁচাত্তর। সেই শান্ত- সুন্দর  মূর্তি আমি কত বছর ধরে খুঁজেছি বা খুঁজি শিয়ালদা স্টেশনের ভিড়ে। যদি দেখতে পাই তাহলে  •••

            এই হারিয়ে যাওয়ার মানুষগুলোর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালবাসা আর বুকফাটা আকুলতা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত জেগে থাকবে। কেন যে এমন মানুষদের সঙ্গে দেখা হয় যাঁরা থাকবে না অথচ পাগলের মতো ভালোবেসে নীলিমায় নীলতারা হয়ে যাবে! আমি কিন্তু আজও তাঁদের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি। যদি দেখা হয়ে যায়। এত- এত বছর পরেও আমি কিন্তু ঠিক চিনতে পারব।ও আশুকাকু, এই প্রবীর,ও মিলুদি --আমি নিশ্চিত আমার ডাক শুনলেই ওরা ঘুরে দাঁড়িয়ে পথের পাঁচালীর অপুর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকবে!


    আরণ্যক বসু


    আরশিকথা অতিথি কলাম


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ 

     

    3/related/default