আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    বিদ্যাসাগরের রসবোধঃ আরশিকথা হাইলাইটস

    আরশি কথা

    নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃত পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৬ তম জন্মবার্ষিকী ২৬ সেপ্টেম্বর। এই মহান মনিষীর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো প্রতিটি বাঙালির অবশ্য কর্তব্য  কেননা  তাঁর জন্ম বাঙালিকে বাংলা শিখিয়েছে , বাংলাকে বাঙালির মাতৃ ভাষার যথাযথ মর্যাদা এনে দিয়েছে । এই মহান বাঙালি বাঙালিকে দিয়েছে আত্মপরিচিতি, দিয়েছে আত্মগড়িমা। বাংলা ভাষার মুকুটে আজ যে মধুর ভাষার  শিরোপা ঝলমল করছে তার পেছনে অবদান রয়েছে বীরসিংহ গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মেধাবী পণ্ডিত ব্যক্তিত্বের। এই মহান মনিষীর জীবন কথায় এতো বৈচিত্র্য রয়েছে যে , উনার যেকোন প্রসঙ্গই পাঠকের কাছে মনোগ্রাহী  হয়ে উঠবে। তবে আমার আলোচ্য বিষয়  বিদ্যাসাগরের রসবোধ। সাগরের  দুএকটি রস বিন্দু এ রকম--- 

    এক ধনী ব্যক্তি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। বিদ্যাসাগরের সোনার জলে নাম লেখা বাঁধানো বইগুলি দেখে মন্তব্য করলেন -- "কী অপব্যয়, এত টাকা খরচ করে বিলেত থেকে বই বাঁধিয়ে এনেছেন, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? বিদ্যাসাগর উত্তরে বল্লেন -- এতে মাথা খারাপের কি আছে, এতে দোষ কি? লোকটি এবার বলেন-- কী বলছেন দোষ নেই? ওই টাকায় কত লোকের উপকার হতে পারত। বিদ্যাসাগর এবার তামাক টানতে টানতে আড়চোখে লক্ষ্য করলেন লোকটির গায়ে দামী শাল রয়েছে। হাতে সোনার চেন-বাঁধা ঘড়িও রয়েছে। লোকটিকে এবার বল্লেন---  ঘড়ির চেন টি তো বড় সুন্দর। দাম কত? লোকটি খুশি হয়ে  -দাম বল্লেন। এবার বিদ্যাসাগর --  আহা শাল টি আরও সুন্দর। লোকটি খুব খুশি হলেন বিদ্যাসাগরের কথায়। বিদ্যাসাগর এবার জানতে চাইলেন-- শালটির দাম কত? লোকটি উৎফুল্ল হয়ে উত্তর দিল -- আজ্ঞে পাঁচশো টাকায় খরিদ ছিল। বিদ্যাসাগর তারপর ধারালো গলায় বল্লেন -- একগাছি দড়ি দিয়েও তো ঘড়ি বাঁধা যায়। সোনার চেনের দরকার কি? পাঁচসিকে কম্বলে তো শীত ভাঙে-- পাঁচশো টাকায় শালের দরকার কি? আমি তো মোটা চাদর গায়ে দিয়ে থাকি। 

            আবার আরেক জায়গায় ঐ একই প্রশ্নের উত্তরে জনৈক ভক্তকে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন--- তুমি তোমার কুরুপা স্ত্রীকে অত রত্নালঙ্কারে সাজিয়ে টাকা নষ্ট করো কেন?

    বিদ্যাসাগরের নিজের মুখের কথায় আরেকটি ঘটনা এ রকম  ---  " ছেলেবেলায় আমি খুব দুষ্ট ছিলাম। পাড়ার লোকের বাগানে ফল পাড়িয়া চুপি চুপি খাইতাম। কেহ কাপড় শুকাইতে দিয়াছে দেখিলে তাহার উপর মলমূত্র ত্যাগ করিয়া আসিতাম।" বলাবাহুল্য, ঈশ্বরচন্দ্রের

    এই ধরণের "ত্যাগ" ক্রিয়ায় ব্যতিব্যস্ত হতেন প্রতিবেশী মথুর মণ্ডলের পরিবার। উল্টো দিকে বাল্যবজ্জাতির ফলও ভুগতে হয়েছে। খেতের উপর দিয়ে যাবার সময় অভ্যাস ছিল -- শস্যের শীষ চিবানো। একবার যবের সুতা গলায় ফুটে প্রাণ যায় যায়। এতে মনে হয়না, তাতে খুব কিছু শিক্ষা হয়েছিল।

          পিতা ঠাকুরদাস যদি বলতেন, আজ তোমাকে স্নান করতে হবে না, তখন সেই ' ঘাড়-কেঁদো' বালকের বিবেচনায় স্নান করা অবশ্য কর্তব্য। স্বেচ্ছায় তেল মেখে জলে নেমে যদি বুঝে ফেলতেন, বাবার ইচ্ছা স্নান করেন, তাহলে " জলে দাঁড়াইয়া থাকিতেন প্রাণান্তকর ডুব দিতেন না। শেষে অনেক প্রহারের পরে  বহু কষ্টে তাঁহাকে বলপূর্বক স্নান করাইতে হইত। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, উল্টো কাজ করতে হলে তবে সিধে কাজ করানো যেত। "

    বিদ্যাসাগর নিজে কখনো কাউকে ধর্মোপদেশ দেবার চেষ্টা করেননি। তিনি বলতেন- আমি বেত খাবার ভয়ে ঈশ্বরের কথা কাউকে বলি না। মনে করো, কেশব সেনকে যমদূতেরা ঈশ্বরের কাছে নিয়ে গেল। কেশব অবশ্য সংসারে পাপ-টাপ করেছে। যখন প্রমাণ হলো, তখন ঈশ্বর হয়তো বলবেন-- ওকে পঁচিশ বেত মারো। তারপর মনে করো, আমাকে নিয়ে গেল। আমি হয়তো কেশব সেনের সমাজে যাই। অনেক অন্যায় করেছি, তার জন্য বেতের হুকুম হলো। তখন আমি হয়তো যমরাজ কে বললাম, কেশব সেন আমাকে ওই রূপ বুঝিয়ে ছিলেন, তাই আমি ওই রূপ কাজ করেছি। তখন ঈশ্বর হয়তো আবার দূতদেরকে বললেন, কেশব সেনকে আবার নিয়ে আয়। এলে পরে তাকে হয়তো বলবেন-- তুই একে উপদেশ দিছিলি? তুই নিজে ঈশ্বরের বিষয়ে কিছু জানিস না, আবার পরকে উপদেশ দিছিলি? ওরে কে আছিস-- একে আরো পঁচিশ বেত দে। বিদ্যাসাগর বলেন -- আমি নিজে ঈশ্বরের বিষয়ে কিছু বুঝি না, আবার পরকে উপদেশ দিতে গিয়ে কি যমরাজের বেত খাবো!? 

            বিদ্যাসাগরের এই রকমের রস বোধের অজস্র গল্প তাঁর জীবনের কাহিনী জুড়ে রয়েছে। ২০৬ তম জন্ম বার্ষিকীতে এই মহান বাঙালির পদপ্রান্তে শতকোটি প্রণাম।


    সসীম আচার্য

    নাট্যকার ও লেখক


    আরশিকথা হাইলাইটস


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

     

    3/related/default