আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    জোড়াসাঁকোয় শারদোৎসব ও রবীন্দ্রনাথ ।। মৃণাল কান্তি পণ্ডিত ।। আরশিকথা অতিথি কলাম

    আরশি কথা

    ভূমিকা:

    বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো দুর্গাপূজা। আর সংস্কৃতির বিবর্তনের সঙ্গে কলকাতার যে বাড়িটির নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে, তা হলো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। এই ঠাকুরবাড়িতেই একসময় কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা উদযাপিত হতো। পরবর্তীকালে মতাদর্শের বিবর্তনে সেই প্রথাগত আচার-সর্বস্ব প্রতিমা পূজা বন্ধ হয়ে গেলেও, শারদীয় উৎসবের মূল চেতনাটি বরং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছিল—যা  ছিল প্রকৃতির আনন্দ এবং মানুষের মিলন উৎসব তথা ‘শারদোৎসব’।


    জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপূজার আদি ইতিহাস ও রাজকীয় বৈভব সূচনা :

    জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জন্মের বহু আগে, তাঁর পূর্বপুরুষদের হাত ধরে। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে নীলমণি ঠাকুর যখন বৈষ্ণবচরণ শেঠের কাছ থেকে জমি নিয়ে জোড়াসাঁকোয় বসতি স্থাপন করেন, তখন থেকেই সেখানে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। প্রথম দিকে এটি একটি খোলা ঘরে সাধারণভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই পূজার রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং এই পূজা চরম রাজকীয় রূপ ধারণ করে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলে। দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় জোড়াসাঁকোর দুর্গাপূজা কলকাতার বাবু সংস্কৃতির এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল। দ্বারকানাথের রাজকীয় জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটত এই পূজায়। কথিত আছে দেবীর ভোগ নিবেদন করা হতো সোনার থালা-বাসনে। মায়ের ভোগের জন্য তৈরি হতো ৫১ রকমের রাজসিক ব্যঞ্জন ভোগ। যেহেতু ঠাকুর পরিবার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন ছিল, তাই জোড়াসাঁকোর পূজায় কখনোই কোনো পশু বলি দেওয়া হতো না। বলির বদলে ছাঁচি কুমড়ো, আখ বা শসা উৎসর্গ করার নিয়ম ছিল। বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের এক অনন্য প্রথা ছিল এই বাড়িতে। বিসর্জনের যাত্রা শুরু হওয়ার আগে জোড়াসাঁকোর আকাশ স্পর্শ করে উড়ে যেত ‘নীলকণ্ঠ’ বা ‘শঙ্খচিল’ পাখি। সেই পাখি ওড়ানোর পরই কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হতো গঙ্গার ঘাটে। দ্বারকানাথের আমলের এই পূজা ছিল একাধারে ধর্মীয় আচার এবং অন্যধারে ক্ষমতার এক বিরাট প্রদর্শন।

    পূজা বন্ধ হওয়ার কারণ এবং ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব: 

    দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর জোড়াসাঁকোর এই জাঁকজমকপূর্ণ পূজায় এক বিশাল পরিবর্তন আসে। প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজা রামমোহন রায়ের সংস্পর্শে আসার পর তিনি তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি পৌত্তলিকা বা মূর্তিপূজা ত্যাগ করেন। ব্রাহ্মধর্মের মূল ভিত্তিই ছিল একেশ্বরবাদ এবং পৌত্তলিকতা বা প্রতিমা পূজার বিরোধিতা। 

    জোড়াসাঁকোয় পূজা বন্ধ: 

    ১৮৫৬ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যাঠতুতো ভাই জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করায় পারিবারিক সম্পত্তির ভাগাভাগি এবং দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম ভাবধারার কারণে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মূল আঙিনায় প্রথাগত দুর্গাপূজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, ১৮৬১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়, তখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কোনো মূর্তিপূজার অস্তিত্ব ছিল না।

    রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও তাঁর শারদীয় দিনগুলি: 

    যদিও রবীন্দ্রনাথের শৈশবে জোড়াসাঁকোয় কোনো ঢাকের আওয়াজ বা চণ্ডীপাঠ হতো না, তা সত্ত্বেও পুজোর দিনগুলো তাঁর কাছে এক বিশেষ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসত। জোড়াসাঁকোর বাইরে তখন সমগ্র কলকাতা মেতে উঠত পূজার আলো আর কোলাহলে। বাড়ির জানালা দিয়ে বা ছাদ থেকে বালক রবি দেখতেন মানুষের এই অনাবিল আনন্দযাত্রা।

    সবচেয়ে বড় কথা, পূজার এই সময়টাতেই জোড়াসাঁকোর চাটুজ্জে মশাই বা দাসী-চাকরদের কাছ থেকে তিনি শুনতেন দুর্গা, শিব আর কার্তিক-গণেশের নানা পৌরাণিক গল্প। এই গল্পগুলো তাঁর শিশুমনকে গভীরভাবে নাড়া দিত। এছাড়া, পূজার দিনগুলোতে জোড়াসাঁকোয় নতুন জামাকাপড় পরার আনন্দ এবং আত্মীয়স্বজনদের মেলবন্ধন ঠিকই বজায় ছিল। প্রথাগত পূজা না থাকলেও, শরৎকালের সেই উৎসবের দিনগুলো রবীন্দ্রনাথের মনে এক গভীর নস্টালজিয়া তৈরি করেছিল।

    মূর্তি পূজা বনাম রবীন্দ্র-ভাবনায় শারদোৎসব: 

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনো মূর্তি পূজার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু তিনি দুর্গাপূজার ভেতরের যে মানবিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক সুর—তাকে অত্যন্ত উচ্চে স্থান দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চোখে শারদোৎসব কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার ছিল না, তাঁর চোখে তা ছিল এক সর্বজনীন মিলন উৎসব। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালি জাতি তার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে এক পরম আনন্দে মেতে ওঠে।

    রবীন্দ্রনাথের দুর্গাপূজা ভাবনার দুটি প্রধান দিক ছিল:

              ১. প্রকৃতির উৎসব: শরৎকালের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, শিউলি ফুলের গন্ধ আর নদীর ধারের কাশবনের দোল—রবীন্দ্রনাথের কাছে এগুলো ছিল ঈশ্বরের আনন্দের প্রকাশ। তিনি মনে করতেন, মানুষ যখন প্রকৃতির এই রূপের সঙ্গে নিজের মনকে মিলিয়ে দিতে পারে, সেটাই হলো আসল উৎসব।

             ২. মানবিক মিলন: তিনি দুর্গাপূজাকে দেখতেন মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের সেতু হিসেবে। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ যখন একে অপরকে আলিঙ্গন করে, সেটাই শারদোৎসবের আসল সার্থকতা।

    বাঙালির ঘরের মেয়ে উমা- কন্যারূপী দুর্গা: 

     রবীন্দ্রনাথের গানে ও লেখায় দুর্গাপূজা বা ঘরের মেয়ে উমার বাপের বাড়ি ফিরে আসার আনন্দ ও বিদায়ের এক অনন্য বেদনাকাতর মানবিক রূপ পেয়েছে। পৌরাণিক দেবী দুর্গাকে তিনি স্বর্গের ঐশ্বর্যময়ী রূপের চেয়ে বাংলার ঘরের সাধারণ মেয়ে ‘উমা’ হিসেবে দেখতে বেশি ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন— 'আমাদের বাংলাদেশের একটা কঠিন অন্তর্বেদনা আছে, যা হলো মেয়েকে অল্প বয়সে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো। এই যে মা ও মেয়ের বিচ্ছেদের সকরুণ কাতর স্নেহ, তা প্রতি বছর শারদোৎসবে এসে এক স্বর্গীয় রূপ লাভ করিয়াছে।'  বিজয়ার বিদায়বেলার বেদনাকে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ঘরের নিজস্ব দুঃখ বলে আপন করে নিয়েছিলেন।

    শান্তিনিকেতনে শারদোৎসবের সূচনা ও নাটক: 

    জোড়াসাঁকো থেকে দূরে, রাঙামাটির দেশ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ দুর্গাপূজার এক সম্পূর্ণ নতুন বিকল্প রূপ তৈরি করেন। পূজার দিনগুলো তিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক ও ছাত্রদের নিয়ে উদযাপন করতেন ‘শারদোৎসব’। সেখানে কোনো মাটির প্রতিমা থাকত না, কোনো পুরোহিত লাগত না। ধূপ-দীপ, পদ্মফুল, শিউলি মালা আর স্তোত্রপাঠের মাধ্যমে মণ্ডপ সেজে উঠত। প্রকৃতির মাঝেই মূর্ত হয়ে উঠত আনন্দময়ী মা। এই শারদোৎসব উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ একাধিক নাটক রচনা করেন, যার মধ্যে অন্যতম ‘শারদোৎসব’ (পরবর্তীকালে যা ‘ঋণশোধ’ নামে পুনর্লিখিত হয়)। এই নাটকের মূল ভাবনা ছিল প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণ স্বীকার করা এবং আনন্দের মাধ্যমে সেই ঋণ শোধ করা। নাটকের ‘ঠাকুর্দা’ বা ‘সন্ন্যাসী’ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে রাজকীয় আড়ম্বর ছেড়ে প্রকৃতির সহজ আনন্দের মধ্যে মুক্তি পাওয়া যায়।

    রবীন্দ্রসংগীতে শরতের আগমনী ও বিজয়া: 

    রবীন্দ্রনাথের ‘পূজা’ ও ‘প্রকৃতি’ পর্যায়ের গানগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে শরতের গান, যা আসলে তাঁর নিজস্ব ‘আগমনী গান’। ঐতিহ্যবাহী আগমনী গানে যেখানে মেনকার উমার জন্য কান্নার সুর থাকে, রবীন্দ্রনাথের গানে সেখানে থাকে বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দের আহ্বান।

    যেমন তাঁর বিখ্যাত গান:


    "আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকো-চুরির খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা 

    নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।"

    এই গানের মধ্যে শরতের যে অনাবিল আনন্দ তা মূর্ত হয়ে উঠেছে। 


    আবার বিজয়া দশমীর বিদায়কে তিনি আধ্যাত্মিক রূপ দিয়েছেন তাঁর গানে:

    "ঐ ম্লান মুখে ও কার ছায়া পড়িল।

    আঁধারে ভুবন মেলিল, নয়ন সজল হইল।"

    তিনি বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনকে দেখেছেন এক উৎসবের সমাপ্তি এবং শান্ত স্নিগ্ধ মিলনের প্রারম্ভ হিসেবে।

    উপসংহার: 

    জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস এবং জীবন দর্শন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলের সেই সোনার থালায় ভোগ আর নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রাজকীয় দুর্গাপূজা হয়তো মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সময়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু তারপরও উৎসবের সেই প্রাণভোমরাটি হারিয়ে যায়নি।

      জোড়াসাঁকোর ঐতিহ্যবাহী আভিজাত্য আর শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির মেলবন্ধনে রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন যে, দুর্গাপূজা কেবল মাটির মূর্তির আরাধনা নয়—তা হলো মানুষের হৃদয়ের ভেতরের মলিনতা ধুয়ে মুছে ফেলে, প্রকৃতির সৌন্দর্যে অবগাহন করে, একে অপরকে ভালোবাসার এক পরম উৎসব। আর এখানেই ‘জোড়াসাঁকোয় শারদোৎসব ও রবীন্দ্রনাথ’ এক চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতায় ভাস্বর হয়ে রয়েছে।


    মৃণাল কান্তি পণ্ডিত 

    কবি ও সাহিত্যিক


    আরশিকথা অতিথি কলাম


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

     

    3/related/default