#জন্ম_ও_প্রারম্ভিক_জীবন:-
বিমল করের জন্ম ১৯২১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগনার টাকী অঞ্চলে। তাঁর পিতা সূর্যকুমার কর এবং মাতা নিস্তারিণী দেবী। পিতার বদলির চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে— বিহার, ঝাড়খণ্ড (তৎকালীন বিহারের অংশ) এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায়। আসানসোল, ধানবাদ, জসিডি প্রভৃতি অঞ্চলের এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর পরবর্তীকালের সাহিত্য রচনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
#সাহিত্য_সাধনা_ও_সাংবাদিকতা:--
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বহু ধরনের পেশার সাথে যুক্ত থাকলেও, পরবর্তীতে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকেই মূল ব্রত হিসেবে বেছে নেন। তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগের সঙ্গে। এ ছাড়া ‘দেশ’ পত্রিকার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন তিনি।
বিমল করের সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ছোটগল্পের মাধ্যমে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘অম্বিকানাথের চকমকি পাথর’। তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল— এক শান্ত, সংযত ও বিশ্লেষণাত্মক ভাষা। তিনি চটকদার রোমাঞ্চের চেয়ে মানুষের মনের অবদমিত ইচ্ছা, নিঃসঙ্গতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রাধান্য দিতেন।
#কিকিরা_ও_শিশুসাহিত্য:--
ছোটদের কাছে বিমল কর অমর হয়ে আছেন তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘কিকিরা’ চরিত্রের জন্য। কিকিরা (আসল নাম কিঙ্কর কিশোর রায়) প্রথাগত কোনো গোয়েন্দা নন। তিনি একজন প্রাক্তন জাদুকর, যিনি জাদুর কৌশল, প্রখর বুদ্ধি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে রহস্যের সমাধান করেন। কিকিরার সহযোগী তারাপদ ও চন্দনকে সঙ্গে নিয়ে ‘পাখির চোখ’, ‘নীল বানরের ড্যাগার’, ‘হলুদ পালক’ বা ‘জাদুকরের রহস্য’-এর মতো গল্পগুলোতে তিনি বাঙালি কিশোরদের এক ভিন্ন স্বাদের রহস্যের জগৎ উপহার দিয়েছেন, যেখানে কোনো অতিপ্রাকৃতিক ভীতি নেই, বরং আছে নিখাদ বুদ্ধির খেলা।
#প্রধান_রচনাবলি_ও_পুরস্কার:-
তাঁর সুদীর্ঘ সাহিত্য জীবনে তিনি বহু কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেছেন।
তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো:--
খড়কুটো (যা নিয়ে পরবর্তীতে বিখ্যাত চলচ্চিত্র তৈরি হয়), অসময়, দেওয়াল, পূর্ণ অপূর্ণ, যদুবংশ, বালিকা বধূ (হিন্দি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই চলচ্চিত্রায়িত) ইত্যাদি।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে ‘অসময়’ উপন্যাসের জন্য তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরৎচন্দ্র স্মৃতি পদক’, ‘আনন্দ পুরস্কার’ এবং ‘দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহ দাস পুরস্কার’-এ সম্মানিত হন।
#অবসান:--
২০০৩ সালের ২৬ আগস্ট এই মহান সাহিত্যিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। আজ তিনি সশরীরে আমাদের মধ্যে না থাকলেও, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি, জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং 'কিকিরা'র জাদুদণ্ড বাঙালির হৃদয়ে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মৃণাল কান্তি পণ্ডিত
লেখক ও কবি
ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট
১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬


