সন্দেশ"...আরশিকথা'য় এই বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখলেন সুনির্মল দেব - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

রবিবার, ১ জুলাই, ২০১৮

সন্দেশ"...আরশিকথা'য় এই বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখলেন সুনির্মল দেব

সন্দেশ  -নামটা শুনলে কেমন যেন জিভে জল আসে । জীবনে তিন  রকমের "সন্দেশ" এর নাম শুনেছি । এক- কিশোরদের মাসিক পত্রিকা, যা উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৯১৩ সালে প্রথম প্রকাশ করেন, পরে তার সুযোগ্য ছেলে সত্যজিৎ রায়ও তা সম্পাদনা করেন । দুই- ক্ষীরের সন্দেশ, আর তিন- নারকেলের সন্দেশ ।
সন্দেশের নামে এখনো জিভে জল আসে । আমার ঠাকুমাকে আমি মূর্তি গড়ার আঁঠালো মাটি এনে দিতাম, তা দিয়ে ঠাকুমা সন্দেশের সাজ তৈরি করতেন । পরে রোদে শুকিয়ে গেলে, বাড়ির রান্না হয়ে যাবার পর মাটির চুলায় ঢুকিয়ে দিতেন । আর সেই সাজ দিয়ে তৈরি করতেন ক্ষীরের আর নারকেলের সন্দেশ ।
সেই আবেগ মেশানো সন্দেশ এর স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে । সন্দেশ বানানো হতো বিশেষ অনুষ্ঠানে । পূজা-পার্বণ এ আর বিয়ের অনুষ্ঠানে । হরেক রকমের সাজ, কোনটা মাছ, শঙ্খ, পাখি, ফুল আর বিয়ের অনুষ্ঠান এর জন্য বড় বড় সন্দেশ, বর-কনের  জন্য স্পেশাল সাইজের সন্দেশ । 
মাঝে মাঝে আমরা চুরি করে খেয়ে মজা পেতাম, তখন ঠাকুমার মাথা গরম হয়ে যেত । ঠাকুমা ঠিক বুঝতেন, তাই দু-চার পিস এক্সট্রা রাখতেন ।
আমি যখন প্রাইমারি সকলে পড়ি, আমাদের পাড়ায় একজন লোক দুধ দিয়ে যেতেন, নাম ছিল -ননী ঘোষ । মনু নদী পার হয়ে আসতেন, মাঝে মাঝে তার দুধের পাত্র নদীর জলে ডুবে "জল" খেতো, আমরা লক্ষ্য করতাম । আমার ঠাকুমা সেদিন হয়তো বলতেন- কী ঘোষ, আজকের দুধ এত পাতলা কেন ? ঘোষ মশাই উত্তর দিতেন- গরু বোধহয় বেশি জল খেয়ে ফেলেছে, তাই দুধও পাতলা । আমরা হাসতাম, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড জানতাম । লক্ষী পূজা বা সরস্বতী পূজায় তিনি পেড়া আর সন্দেশও বিক্রি করতেন । তার সন্দেশে আটার গন্ধ করতো । সেইবারও ঠাকুমার প্রশ্ন - সন্দেশে আটার গন্ধ  কেন ! ননী ঘোষের রেডিমেড  উত্তর - গরুটা দড়ি ছিড়ে দোকানে ঢুকে আটার বস্তা থেকে তিন কেজি আটা খেয়ে ফেলেছিল । ঠাকুমা অখুশি হয়ে গিয়ে আওয়াজ করতেন - হুম । ননী ঘোষ তখন আক্ষেপের সুরে সুর মিলিয়ে বলতেন - যত দোষ, ননী ঘোষ
আমার এক মেজো মাসী বটতলা থেকে ক্ষীরের সন্দেশ কিনে আনেন । উপর থেকে দেখলে মনে হবে পুরোটাই ভরাট, উল্টো দিকে দেখলে ঝিনুকের খোল ।
আমার শ্বাশুড়ী মা, সেই সন্দেশ দিল্লীতে নাতিনের জন্য মাঝে মাঝে পাঠান । পোস্ট অফিস চৌমুহনীর এক নামকরা কুরিয়ার এর অফিসে নিয়ে গেলেন সুন্দর প্যাকেট করে । আমি বাক্সের উপর স্বর্ণাক্ষরে নাম ঠিকানা লিখে দিলাম । সেখানে গিয়েও বিপত্তি । কুরিয়ার এর লোকেরা ভেতরে কী আছে না দেখে কোনোমতেই প্যাকেট পাঠাবেন না । দৃঢ় প্রতিজ্ঞা । যতই আমার মা বলেন-
ভেতরে সন্দেশ আছে, অন্য কিছু নেই, ওরা মানতে নারাজ । শেষমেশ দাঁড়ি কামানোর ব্লেড কিনে এনে যখন প্যাকেট খোলা হলো, তখন ছাড়পত্র মিললো । কিন্তু এর মাঝেই কুরিয়ার এর লোকদের মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছিলেন- শিক্ষিকার পদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত শ্বাশুড়ী মা । কুরিয়ারের লোকেদের লকলকে লোভী জিভ নিজস্ব অভিজ্ঞতায় চিনতে পেরে গিয়েছিলেন । তাদেরকে চারখানা সন্দেশ দিয়ে বলেছিলেন- আরো লাগলে নাও বাবা, তোমরা তো আমার নাত-নাতনির বয়সী । লজ্জায় এরপর থেকে আর কোনদিন মাকে প্যাকেট খুলে দেখাতে হয় নি । ভালো সন্দেশের এমনি গুণ !
বছর পাঁচেক আগেও আমি বিশেষ দিনে, মানে নববর্ষ আর বিজয়া দশমীতে কাউকে ম্যাসেজ পাঠাতাম না । সবাইকে ফোন করতাম । মনে হতো, এটা একটা কর্তব্য । শুরু করতাম কলেজটিলার শ্রদ্ধেয় অমিতাভদা কে দিয়ে । প্রতি বছর আমাদের মধ্যে কম্পিটিশন হতো- কে আগে কাকে ফোন করবে । তারপর অন্যদেরকে একে একে ফোন করতাম । আবার বিপদ । প্রায় দু'ঘন্টা ধরে ফোন নিয়ে বসে থাকতাম বলে বাড়ির লোকরা ফিসফিস করতেন- মাছ, মাংস কিছুই বাজার হয়নি, কি যে আজ খাওয়া হবে, উপরওয়ালাই জানেন । যাদের ফোন করতাম, উত্তর শুনে মনে হতো বাজারে বা মিষ্টির দোকানে আছেন, কিছুটা হলেও বিরক্ত হতেন, পরে বুঝতে পেরেছি, তার চাইতে এস. এম. এস. পাঠালেই ভালো হতো ।
এস. এম. এস. পুরোনো পদ্ধতি হয়ে গেছে, এসে গেছে- হোয়াটস আপ । কথা, ছবি, গান, আওয়াজ -একেবারে অডিও ভিসুয়াল পূর্ণতা প্রাপ্তির নতুন আনন্দ ।
এবার হোয়াটস আপে অনেকেই রসগোল্লা ভর্তি মিষ্টির হাঁড়ি পাঠিয়েছেন । আসল মিষ্টি পাঠান নি ! হয়তো বা ভেবেছেন- বেশি  মিষ্টি খেলে  যদি "সুগার"বেড়ে যায় । তাদের  সবাইকে ধন্যবাদ, শুভ চিন্তার জন্য ।
মনে মনে ভাবছি- এই বছর দশমীর আগে বেশ কিছু সন্দেশ এর প্যাকেট তৈরি করবো ।
কার্টুন বাক্সের ভেতরে পত্রিকা কাগজ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মাত্র দুইটা "সন্দেশ"  দেওয়া প্যাকেট কুরিয়ার দিয়ে পাঠিয়ে দেবো আমার প্রিয় শুভাকাঙ্খীর বাড়ি, চিরকুটে লেখা থাকবে- প্রীতি ও শুভেচ্ছা সহ বিজয়ার "সন্দেশ" গ্রহণ করুন । 

লেখকঃ সুনির্মল দেব,আগরতলা
         বিশিষ্ট উদ্যোগপতি
ছবিঃ সংগৃহীত                                                                      
১লা জুলাই ২০১৮ইং   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here