Type Here to Get Search Results !

‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে: শেখ হাসিনা

আবু আলী, ঢাকা, আরশিকথা ॥

‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে,’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশ ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এবং ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠারও ৫০তম বছরে পা রেখেছে।’ তিনি এ সম্পর্কে আরো বলেন, ‘আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উৎযাপন করছি। মাত্র কয়েক মাস আগে, আপনাদের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী আমরা উদযাপন শেষ করেছি।’ ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত ভার্চুয়াল সামিটের উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। প্রতিবেশী দেশদু’টির মধ্যে প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এই বিষয়ে অনুঘটক হিসাবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বড় উদাহরণ হল চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করা যা আমরা আজ উদ্বোধন।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে গণভবন থেকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়াদিল্লী থেকে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব প্রদান করেন। হাসিনা আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতিকে আরও সংহত করতে হবে। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উভয় দেশ বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ভ্যালু-চেইন আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, উভয় দেশ বিদ্যমান সহযোগিতামূলক ঐক্যমতের সুযোগ নিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে আরও সংহত করে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ভ্যালু-চেইন আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। ‘বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতা আমরা আনন্দের সঙ্গে স্বীকৃতি দেই,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে নিযুক্ত রয়েছেন এবং তারা নিজ দেশ ভারতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীকে ভারত গ্রহণ করে। ‘বাংলাদেশে আমরা বাপুজির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে একটি বিশেষ ডাক টিকিট অবমুক্ত করেছি। আমরা আজ বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ভারতের ডাক বিভাগের একটি স্ট্যাম্পের উদ্বোধন করবো,’ বলেন তিনি। এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো যৌথভাবে উদযাপনের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত হওয়ায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার এবং জনগণের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মানুষ আনন্দ, মুক্তি এবং উদযাপনের চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে উঠে।’ তিনি এই মাহেন্দ্রণে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর শহিদ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ভারত সরকার ও জনগণকে জানাই কৃতজ্ঞতা।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিনটিকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকের দিনটি আমার জন্য একটি বিশেষ দিন। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অধীনে তখনও আমার মা, ছোট বোন রেহানা, রাসেল এবং ছোট্ট ৪ মাসের শিশু পুত্র জয়সহ আমরা বন্দি ছিলাম। ভারতের কর্নেল অশোক তারা (তৎকালীন মেজর) পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বন্দিদশা থেকে আমাদের মুক্ত করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত হলেও আমরা মুক্ত হয়েছিলাম ১৭ ডিসেম্বর। আজকেই সেই দিনটি।’ তিনি বলেন, ‘আমি কর্নেল অশোক তারার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। সেই সাথে ভারতের সশস্র বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী সবার প্রতিই আমার ধন্যবাদ। সেদিন আমরা যারা মুক্ত হয়েছিলাম তাদের মধ্যে আমি, রেহনা এবং জয়-আমরা তিন জনই বেঁচে আছি, আর কেউ বেঁচে নেই (৭৫’ এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকের নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন বঙ্গমাতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা)।’ ভারতকে বাংলাদেশের ‘অকৃত্রিম বন্ধু’ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী, ২০১৯ সালের অক্টোবরে নয়াদিল্লীর গ্র্যান্ড হায়দ্রাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ বৈঠক এবং ভারতের আতিথেয়তার কথা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী এর পরই কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উদ্ভবে বিশ^ব্যাপী লাখো মানুষের মৃত্যু, জীবন-জীবিকা বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘সম্ভবত কোভিড-১৯ মহামারির সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা।’ তিনি বলেন, ‘এই বছরের গোড়ার দিকে ঢাকায় আপনাকে স্বাগত জানানোর ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেছে। তবুও, আমাদের গত শীর্ষ সম্মেলনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ক্রান্তিকালে উভয় পরে সংশিষ্ট কর্তৃপ যেভাবে আমাদের দ্বিপীয় সহযোগিতা এগিয়ে নিয়েছে-তা প্রশংসাযোগ্য।’ তিনি ২০২০ সাল জুড়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান রেল রুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চ-পর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্য সামগ্রীর প্রথম পরীামূলক চালান প্রেরণ এবং কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা ভারতের মত জনবহুল দেশে কার্যকর ভাবে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম তিগ্রস্ত ও জনবহুল অঞ্চলে কোভিড-১৯ যেভাবে আপনার সরকার মোকাবেলা করেছে তার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজগুলো ছাড়াও, ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর উদ্যোগে প্রবর্তিত অর্থনৈতিক প্যাকেজগুলো প্রশংসনীয়।’ ‘আমরা বিশ্বাস করি, আপনার গৃহীত নীতিমালার মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে,’ বলেন তিনি। এ সময় কোভিড-১৯ মোকাবেলায় তাঁর সরকারের পদেেপর উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশেও এই মহামারির অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব উপশম করতে আমরা ১৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি।’ তিনি বলেন, মার্চের গোড়ার দিকে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর সরকার আড়াই কোটিরও বেশি মানুষকে সহায়তা প্রদানের জন্য সামাজিক সুরার আওতা সম্প্রসারিত করেছে। একই সঙ্গে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটা এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সম হয়েছে, বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা আগামী বছর ঢাকায় অনুষ্ঠেয় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সকল ভারতীয় নাগরিকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সব ভারতীয় নাগরিকের পক্ষ থেকে আমি শুভ কামনা জানাই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করাকে আমি অগ্রাধিকার দিয়েছি।’ এ সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ আত্মত্যাগকারী সবার প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান। তিনি ২০২১ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে বলেন, ‘আগামী বছর বাংলাদেশ সফরে বঙ্গবুন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাওয়া আমার জন্য সম্মানজনক। ’ করোনা মোকাবেলায় ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ভারত এবং বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলেও এ সময় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার সাতটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। দুই দেশের ভার্চুয়াল সামিট শুরুর আগেই ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দুই দেশের মধ্যে এসব সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। বাংলাদেশের পে স্ব স্ব বিভাগের প্রধান কর্মকর্তারা এবং ভারতের পে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী এসব স্মারকে স্বার করেন। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ভার্চ্যুয়াল দ্বিপাকি বৈঠকে এসব চুক্তি স্বার আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া, ৫৫ বছর পর আবারও নীলফামারীর চিলাহাটি সীমান্ত থেকে পশ্চিমঙ্গের হলদিবাড়ি পর্যন্ত রেল যোগাযোগেরও উদ্বোধন করা হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ওই রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ভারতের ডাক বিভাগ প্রকাশিত একটি স্মারক ডাকটিকেট অবমুক্ত করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল এক্সিবিশনে’র উদ্বোধন করেন।


আরশিকথা বাংলাদেশ সংবাদ

১৭ই ডিসেম্বর ২০২০
 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.