গ্রামের নাম কুসুমপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, সবুজে ঘেরা, যেখানে মানুষগুলি খুবই সরল। সেখানেই বাস করতেন বৃদ্ধ হরিদাস বাবু। তার বয়স তখন প্রায় আশি। শরীর বয়সে দুর্বল হলেও তার মনে ছিল আগুন, ছিল ইতিহাসের স্পষ্ট স্মৃতি। তিনি এক সময় ভারতছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলেও গিয়েছিলেন।
হরিদাস বাবু প্রতিবার ১৫ই আগস্ট এলেই ছেলেমেয়েদের ডেকে বসাতেন, আর গল্প করতেন। তার ছোট নাতি রাহুল খুব আগ্রহ করে দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
সে বছরও ব্যতিক্রম হলো না। ১৫ই আগস্টের সকালে স্কুলের পতাকা উত্তোলন শেষে রাহুল ছুটে এলো দাদুর কাছে।
— “দাদু, তুমি বলেছিলে তোমার স্বাধীনতার গল্প আছে, আজ বলো না!”
হরিদাস বাবু একটু হাসলেন। তারপর বললেন,
“রাহুল, তখন আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলাম। আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল সাহস আর বিশ্বাস। আমি তখন তোর মতোই ছিলাম, কলেজে পড়ি। সেদিন আমি দেখেছি আমার বন্ধু অরুণ কীভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিল, শুধু স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। আমরা সবাই চোখে জল নিয়ে বলেছিলাম, ‘ইংরেজ ভারতে থাকবে না।’”
রাহুল বিস্ময়ে বলল, “তুমি ভয় পাওনি দাদু?”
— “ভয় তো লেগেছিল, রে। কিন্তু দেশের জন্য, মা-মাটির জন্য সব ভয় হার মেনে গিয়েছিল।”
তার চোখে জল চিকচিক করছিল। রাহুল এবার বলল, “দাদু, আমি বড় হয়ে কীভাবে দেশের জন্য কিছু করতে পারি?”
হরিদাস বাবু বললেন, “দেশের জন্য কাজ মানে শুধু যুদ্ধ নয়। ভালো মানুষ হও, সৎ হও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও, নিজের কাজ মন দিয়ে করো—এটাই দেশপ্রেম।”
সেদিন কুসুমপুরের ছোট্ট উঠোনে এক বৃদ্ধের কণ্ঠে জেগে উঠেছিল এক জাতির ইতিহাস। ছোট্ট রাহুলের মনে গেঁথে গিয়েছিল স্বাধীনতার অর্থ—মাটি, মা, আর মানুষের ভালোবাসা।
- রশ্মিতা দত্ত
ভবনস্ ত্রিপুরা বিদ্যমান্দির
আরশিকথা সাহিত্য
ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট
১৭ই আগস্ট, ২০২৫

