আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    যখন থেমে গিয়েছিল পৃথিবী ।। গল্প ।। রশ্মিতা দত্ত ।। আগরতলা ।। আরশিকথা সাহিত্য

    আরশি কথা

    ০২০ সালের ২৪শে মার্চের সকালটা ছিল একেবারে অন্য রকম। অরিন্দম তখনও ঘুম থেকে পুরোপুরি উঠতে পারেনি। অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে আধো ঘুম চোখ খুলতেই ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনের আলো জ্বলে উঠতেই চোখ কুঁচকে গেল। সর্বত্র একটাই খবর ছড়িয়ে পড়েছে—লকডাউন।

    প্রধানমন্ত্রী আগের রাতে ঘোষণা করেছেন, দেশজুড়ে একুশ দিনের জন্য পূর্ণ লকডাউন থাকবে। উদ্দেশ্য একটাই—অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করা। অরিন্দম কলকাতার এক ব্যস্ত মহল্লায় বড় হয়েছে। তার চোখে শহর মানেই শব্দ—রাস্তায় ঠেলাগাড়ি, চা-স্টলে আড্ডা, স্কুলবাসের হর্ন, পাড়ার মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু আজ সকালের শহরটা অন্যরকম। একেবারে নিশ্চুপ। যেন কেউ পৃথিবীর রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে “পজ” বাটন টিপে দিয়েছে।

    প্রথম কয়েক দিন অরিন্দম লকডাউনকে অপ্রত্যাশিত ছুটি ভেবেছিল। অফিস ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমে চলছে। সে খুশি—না যাতায়াত, না ভিড়ভাট্টা। ভেবেছিল, "দারুণ! বাড়িতেই বসে কাজ করব, চা-টা খাব, একটু সিরিজ দেখব, জীবনটা মজা।"

    কিন্তু দিন যেতে না যেতেই সেই আনন্দের মোড়ক খুলে ভেতরের শূন্যতা ধরা দিল।

    প্রতিদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকাতো। যে মোড়ে চা-স্টলে সকালের আড্ডা জমত, সেখানে এখন তালা ঝুলছে। খুদেরা আর ক্রিকেট খেলছে না, ট্রাফিক সিগন্যালগুলো অকারণে লাল-সবুজ-হলুদ আলো দেখিয়ে যাচ্ছে। অরিন্দমের ছোট বোন নীলা একদিন ফিসফিস করে বলল,

    “দাদা, তোমার কি মনে হয় না শহরটা যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে?"

    অরিন্দম চুপচাপ মাথা নাড়ল। সত্যিই যেন চারপাশে এক অদৃশ্য টানটান ভয়। 

    বাইরের পৃথিবী থেমে গেলেও ঘরের ভেতর জীবন এক নতুন ছন্দে চলতে শুরু করল।অরিন্দমের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, প্রতিদিন রেডিও নিয়ে বসে থাকেন। কোন রাজ্যে কতজন আক্রান্ত, কোথায় হাসপাতাল ভর্তি হচ্ছে—সব খবরই শুনে সবাইকে শোনান। মা চেষ্টায় আছেন ঘরের লোকজনকে সুরক্ষিত রাখতে—হলুদদুধ, আদা-চা, নিত্যপ্রার্থনা সবই চলছে। নীলার অনলাইন ক্লাস, অরিন্দমের অফিস মিটিং—একই সঙ্গে চলতে থাকে। কখনও ওয়াই-ফাই সিগনাল ড্রপ করলে মা বিরক্ত হয়ে বলেন,

    “আমার সিরিয়ালটা চলছিল, তোমরা সারাদিন নেট দখল করে বসে থাকো!”

    ডাইনিং টেবিল হয়ে ওঠে ঘরের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানেই খাওয়া, গল্প, ঝগড়া, আবার নীরবতা।

    খাবার জোগাড় করা ছিল এক আলাদা চ্যালেঞ্জ। বাজারে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়ে মা নতুন নতুন রান্না করতেন। একদিন মজাদার পনির, আরেকদিন শুধু খিচুড়ি আর পাপড়। নীলা ইউটিউব দেখে কলার ব্রেড বানাল, যদিও অর্ধেকটা পুড়ে গেল। সবাই মিলে হাততালি দিল যেন ও কোনো বড় কীর্তি করেছে।

    কিন্তু সবাই যে অরিন্দমদের মতো স্বচ্ছল ছিল, তা নয়। তাদের বাড়ির পরিচারিকা সুনীতা একদিন ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

    “দাদা, বাড়িতে এক দানা চাল নেই। স্বামী কাজ পায় না, আমি তো আপনার বাড়িতে আসতেই পারছি না।” অরিন্দমের মা একটুও দেরি করলেন না। চালে-ডালে ভরা ব্যাগ গার্ডের হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু খবরের কাগজে, টিভিতে দেখা যাচ্ছিল আরও ভয়ঙ্কর দৃশ্য—শত শত অভিবাসী শ্রমিক পরিবার হেঁটে হেঁটে শত কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছে। মাথায় গামছায় বাঁধা মালপত্র, কোলে ছোট্ট শিশু। পেটে একমুঠো খাবার নেই।

    অরিন্দমের বুক কেঁপে উঠল। সে অনলাইনে কিছু সাহায্য পাঠাল ঠিকই, কিন্তু নিজের সুরক্ষিত অবস্থার জন্য একটা অপরাধবোধ ভেতরে রয়ে গেল।

    একদিন পাশের ফ্ল্যাটে এক ভদ্রলোকের জ্বর হল। পুরো বিল্ডিংয়ে হইচই পড়ে গেল। সবাই গোপনে ফিসফিস করতে লাগল, “ও তো করোনা হয়েছে!” কেউ দরজা খোলেনি, কেউ কাছে যায়নি। পরে জানা গেল, সাধারণ ফ্লু ছিল। কিন্তু সেই কয়েকদিনের আতঙ্ক কেউ ভোলেনি।

    বাজার করা হয়ে গেল এক ভয়ঙ্কর কাজ। অরিন্দম মাস্ক, গ্লাভস পরে যেত, পকেটে ছোট স্যানিটাইজারের বোতল। দোকানিরা বাঁশের লাঠি দিয়ে দূর থেকে সবজি ঝুড়িতে ফেলে দিত। টাকা নেয়ার আগে স্প্রে করে জীবাণুমুক্ত করা হত। বিশ্বাস ও আন্তরিকতার জায়গায় এসে দাঁড়াল শঙ্কা আর দূরত্ব।

    তবুও অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট আশার আলো জ্বলছিল। একদিন সন্ধ্যায় বারান্দা থেকে দেখল, সবাই থালা-বাসন বাজাচ্ছে, তালি দিচ্ছে—স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান জানাতে। আরেকদিন প্রত্যেকের জানালায় প্রদীপ জ্বলল—অন্ধকার দূর করার প্রতীক হয়ে। কেউ ছাদে দাঁড়িয়ে গান গাইছে, কেউ জানালায় রঙিন কাগজে লিখেছে—“সব ঠিক হয়ে যাবে।” রিন্দম নিজেও একটা ব্লগ শুরু করল—“লকডাউন ডায়েরি”। প্রতিদিন লিখত, কেমন কাটছে দিন। অবাক হয়ে দেখল, শত শত মানুষ পড়ছে, মন্তব্য করছে। অনেকেই লিখল, “আপনার লেখায় যেন নিজের কথাই খুঁজে পাই।”

    ২১ দিনের পর লকডাউন শেষ হল না। আবার বাড়ানো হল। আবারও। অরিন্দম ভেবেছিল কিছুদিনের ব্যাপার, কিন্তু অনিশ্চয়তা যেন অসহ্য হয়ে উঠল। অফিসে বেতন কাটা পড়ল, নীলার কলেজ ভর্তি পিছিয়ে গেল, আত্মীয়দের বিয়ে বাতিল হয়ে গেল। তবুও ধীরে ধীরে সবাই মানিয়ে নিতে শুরু করল। ভিডিও কলেই আত্মীয়দের সঙ্গে কাকভোর আড্ডা, উৎসব শুধু ঘরের চারজন মিলে, কিন্তু আনন্দ তাতে কমল না। বাবা অনলাইনে পাড়ার বাচ্চাদের পড়াতে শুরু করলেন, মা ভার্চুয়াল ভজন-সভায় যোগ দিলেন। জীবন থেমে গিয়েও যেন নতুন পথে হাঁটতে শুরু করল।

    মাস কয়েক পর যখন ধীরে ধীরে শহর খুলতে শুরু করল, অরিন্দম প্রথমবার বেরোল রাস্তায়। আকাশ যেন অনেক নীল, বাতাসে নতুন সতেজতা। গাছগুলোও যেন সবুজে ঝলমল করছে। পৃথিবীটা যেন এক নতুন রূপে জেগে উঠেছে। কিন্তু অরিন্দমের ভেতরে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। সে বুঝল—মানুষ আসলে কতটা ভঙ্গুর, জীবন কত সহজেই ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। ছোট ছোট জিনিসের দাম কত বেশি—একসাথে বসে খাওয়া, পরিবারের হাসি, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া সে শিখল, একা মানুষ কিছুই নয়। সবাই মিলে তবেই বাঁচা সম্ভব।


    বছর কয়েক পরে যখনই অরিন্দম ২০২০-র সেই দিনগুলোর কথা ভাবে, কেবল ভয় আর মৃত্যুর খবরই মনে পড়ে না। মনে পড়ে—নীলার আধপোড়া কেক খেয়ে সবাই হেসে গড়াগড়ি খাওয়া।

    মনে পড়ে—বাবার গর্বিত মুখ, যখন অনলাইনে বাচ্চাদের পড়াতেন।

    মনে পড়ে—সন্ধ্যায় পুরো শহরের জানালায় জ্বলতে থাকা প্রদীপ।

    লকডাউনের দিনগুলো ছিল কঠিন, দুঃসহ, অবিস্মরণীয়। কিন্তু একই সঙ্গে তা মনে করিয়ে দিয়েছিল—পৃথিবী থেমে গেলেও মানুষের মনোবল থামে না।


    রশ্মিতা দত্ত

    দশম শ্রেণি

    ভবনস্ ত্রিপুরা বিদ্যামন্দির 


    আরশিকথা সাহিত্য


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ৩রা অক্টোবর ২০২৫


     

    3/related/default