রোহিনী, পেশায় সে কিছুই নয় কিন্তু একজন ছাত্রী। তার জীবনে আছে পড়াশোনা, আর সেটার থেকে বেশি আসে সোশ্যাল মিডিয়া। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ,ফেইসবুক, ইত্যাদির মূল্য বেশি তার জীবনে।
রোহিণীর গল্পটা যেন আমাদের সবার গল্প। কারণ আজকালকার প্রায় সব মানুষই মোবাইল ইত্যাদি কোন কিছুরই সঠিক ব্যবহার করে না ,কাজেই মানুষের জীবনেই শুধু আছে এখন মোবাইল যা সঠিক ব্যবহার করলে ভালো কিছু হতে পারে কিন্তু মানুষ সেটা করে না।
সুলেখা, রোহিনীর বড় বোন হওয়া সত্বেও তার নাচলো মোবাইলে এক ফোটাও আগ্রহ এই মোবাইল ব্যবহার করত শুধু ও তার পড়াশোনার জন্য। সুলেখা দাবি করে যে তার নামের আগে খুব শীঘ্রই ডক্টরের পদবী বসতে চলেছে।
রোহিনী বলল-"দিদি তোর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণটা কি?"
সুলেখা বলল-"কারণ কিছুই নেই, সবটাই একজন মানুষের অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল"
রোহিনী বলল-"কি! অভ্যেস, সেটার সাথে তোর আত্মবিশ্বাসের কি যোগ, ঠিক করে বলনা এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলে কি লাভ?"
সুলেখা বলল-"দেখলি, দেখলে এখন তোর ভাবনা শক্তি ও কমে যাচ্ছে দিন দিন, যত ঘন্টা তুই মোবাইল দেখিস সেটা যদি তুই পড়াশুনায় এখনো উচিত কাজে ব্যবহার করতে তাহলে ভাব আজ অব্দি কত কিছুই না করতে পারতি তুই"
রোহিনী বলল-" তুইও ওইসব কথা বলছিস, আমার তোর সাথে এসে কথা বলাই উচিত হয়নি"
সুলেখা বলল-"বুঝবি রে, বুঝবি ,একদিন আমার কথাগুলোর মূল্য ঠিক বুঝবি"
রোহিনী বলল-"ধুর! তোর সাথে কথা বলাই ঠিক হয়নি"
সুলেখা বলল-"তোর এই বিরক্ততার একদিন না একদিন তোর অনুশোচনা ঠিক হবে"
তারপর রোহিণী বিরক্ত হয়ে তার দিদির ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার ঘরে গিয়ে আবার সে মোবাইল দেখতে লাগলো, দেখতে দেখতে পুরো রাত থেকে দিন হল।রাতের ঘুম সে স সকালে ঘুমোতে গেল, তার মা যখন খুব দেরি হয়ে যাবে তাকে স্কুলে যাবার জন্য ডাকতে এলো -
তার মা বলল-"এই রোহিনী, ওঠ স্কুলে যেতে হবে তো"
রোহিনী বলল-"না মা একটু ঘুমিয়ে নিই"
তার মা বলল-"এই হয়েছে এক নতুন ঝামেলা ।সারারাত জেগে জেগে মোবাইল দেখবে আর সকাল হলে ঘুম, ওরে তুই একটা স্কুল স্টুডেন্ট তোর এভাবে ঘুমালে চলবে?"
রোহিনী বলল-"এখনো তো ঠিক করে নয়টাও বাজে নি আমি কেন উঠবো"
তার মা বলল-"সারারাত মোবাইলে শব্দ বাড়িয়ে সে মোবাইল দেখবে আর এখন আমাকে বলছে ঠিক করে ৯ টা বাজেনি। ইচ্ছে তো করে তোর ফোনটাকে আছাড় মেরে ফেলে দেই, কিন্তু সেটাও তো হবে না এত দামী একটা জিনিস"
রোহিনী বলল-"আমার রাতে ঘুম আসেনি বলে আমি মোবাইল দেখেছি"
তার মা বলল-"তোর সাথে কথা বলাই বেকার যায়"
রোহিনী তারপর খুব চট জলদি তৈরি হয়ে, স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেল। খাবার সময়টুকু পেল না।
যখন সে ক্লাসে পৌঁছল তার মাথায় ঘুরছিল শুধু রিলস, রিলস আর রিলস। যখন ক্লাসে কিছু পড়ছিল তখন তার মনোযোগ একদমই ক্লাসে ছিল না। সে ক্লাসে খুব অমনোযোগী
যখন রোহিণী স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল ,তার বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পরেই তার একজন স্কুলের বন্ধু সোহম তার বাড়িতে এলো, কারণ সে ঐদিন স্কুলে যায়নি।
সোহম বলল-"কিরে রোহিনী আজ ক্লাসে কি কি করিয়েছে একটু বলবি"
রোহিণী বললো-"আজ তো ক্লাসে বিশেষ কিছু করায়নি"
সোহম বললো -"আচ্ছা বেশ"
সোহম রাস্তায় যেতে যেতে তার আরেকজন ক্লাসের বন্ধুর সাথে দেখা হল। যখন সোহম তাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে আজ ক্লাস কি কি করিয়েছে সে বলল "আজ তো ক্লাসে অনেক কিছুই করিয়েছে, অনেক কিছু লিখিয়েছে ও"
সোহম ভাবলো যে রোহিণী ক্লাসে এতটাই অমনোযোগী যে এত কিছু করিয়েছে ক্লাসে তারপরেও তার কিছু মনে নেই।
আর কিছুদিন পরেই ছিল রোহিনীর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা। তার কাছে কোন নোট কিছুই ছিল না যা ক্লাসে দেওয়া হয়েছিল। অনেক জনের কাছ থেকে অনেক লেখায় জোগাড় করেছিল কিন্তু সেগুলো লেখেনি সে। সে সবাইকেই মোবাইলে ফটো তুলে পাঠিয়ে দেবার কথা বলেছিল।
আর ছিল মাত্র একদিন ওর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবার আগে। সেদিন তার খাতায় কিছু লেখা ছিল না। সে সবকিছু তার মোবাইল থেকে পড়ল। যখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করত কিরে তুই পড়ছিস, তখন সে সবাইকে বলত হ্যাঁ হ্যাঁ আমি খুব ভালোই পড়ছি, আমার পড়া নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু নেই।
আজ ছিল রোহিনীর বার্ষিক পরীক্ষার প্রথম পরীক্ষা।
যখন রোহিনীর কাছে প্রশ্নপত্র আসলো, সেই প্রশ্নপত্র দেখে তার মাথা ঘুরে গেল, চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়তে শুরু হলো, সে তার কান্না থামাতে পারল না ভেবে যে সে কিভাবে পরীক্ষা দেবে সে তো কিছুই পারে না।
যখন পরীক্ষা থেকে এসে বাড়ি ফিরল তখন সে সবকিছু তার দিদি ও মাকে বিস্তারিতভাবে বলল।
দিদি ও মা বলল-" দেখ তুই মোবাইল দেখিস ভালো কথা কিন্তু এত দেখাও ভালো কথা না, মোবাইল আমাদের জীবনের একটা বস্তু মাত্র , আমাদের উপর নির্ভর করে যে আমরা ওটাকে কিভাবে ব্যবহার করব। আমরা যদি সেটাকে ভালো ভাবে বা ভালো কাজে ব্যবহার করি তাহলে আমাদের ভালো হবে নিঃসন্দেহে, কিন্তু আমরা যদি ওইটাকে সময় নষ্ট করবার জন্য ব্যবহার করি তাহলে আমাদের মূল্যবান কাজগুলো কেউ করে দিতে আসবেনা। তাই এখন থেকে একটু ভাব , ভেবে দেখ, সময় বারবার এই সুযোগ দেয় না। তুই যদি এটা উপলব্ধি করতে পারিস তাহলে তুই জীবনে এগিয়ে যেতে পারবি। সময় খুবই মূল্যবান জিনিস, সেটাকে ব্যবহার করতে শেখ।
অংকুরাজ সরকার
অষ্টম শ্রেণী
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর বিদ্যামন্দির
আগরতলা
আরশিকথা সাহিত্য
৩রা মে ২০২৬


