বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক চিরউজ্জ্বল ধ্রুবতারা। যিনি তাঁর জাদুকরী লেখনী দিয়ে শুধু গ্রন্থপৃষ্ঠা ভরাননি, জয় করেছিলেন কোটি বাঙালির হৃদয়। হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে ১৮৭৬ সালের আজকের এই দিনে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তিনি পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বেশি অনূদিত হওয়া 'অপরাজেয় কথাশিল্পী'। আজ তাঁর সার্ধশততম (১৫০ তম) জন্মলগ্নে জানাই আমাদের গভীর প্রণাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
#সমাজ ও সাধারণ মানুষের অকপট কথক:--
শরৎচন্দ্র যখন লিখতে শুরু করেছিলেন, তখন বাংলা সাহিত্য মূলত অভিজাত ও উচ্চবিত্তের পরিमंडলে আবর্তিত হচ্ছিল। তিনিই প্রথম সাহিত্যের আলোকবৃত্তে নিয়ে এলেন অবহেলিত, অন্ত্যজ ও সমাজ-বর্জিত সাধারণ মানুষকে।
পল্লী সমাজের রেষারেষি, গ্রামীণ কুসংস্কার ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে।
শোষিত ও লাঞ্ছিত মানুষের দুঃখ-কষ্টকে তিনি এমন এক দরদি ভাষায় তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের মনের মণিকোঠায় আঘাত করে।
#অমর চরিত্রের ক্যানভাস: অন্তহীন মানবিকতার রূপায়ণ:--
শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি করা চরিত্রগুলো কেবল কাল্পনিক ছিল না, সেই চরিত্রগুলো ছিল বাঙালির ঘরের মানুষ, আমাদের পল্লীসমাজের চিরন্তন আবেগের অংশ। তাঁর উপন্যাসের প্রধান স্তম্ভগুলোকে চার ভাগে দেখা যায়:--
#শ্রীকান্ত (ভবঘুরে মনস্তত্ত্ব): চার খণ্ডে বিস্তৃত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসের নায়ক শ্রীকান্ত আসলে এক চিরন্তন পরিব্রাজক। সমাজের নিয়মের বাইরে গিয়ে জীবনের সত্যকে খোঁজার যে ব্যাকুলতা, তা শরৎচন্দ্র শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথের নিখুঁত রসায়নে ফুটিয়ে তুলেছেন।
#দেবদাস-পার্বতী-চন্দ্রমুখী (প্রেম ও ট্র্যাজেডি): আত্মহননকারী প্রেমের এক চিরায়ত প্রতীক 'দেবদাস'। পার্বতীর সামাজিক বন্ধন আর চন্দ্রমুখীর নিঃসশর্ত আত্মত্যাগ—এই ত্রিমাত্রিক প্রেমের টানাপোড়েন শতাব্দী পেরিয়েও পাঠককে কাঁদায়।
#সব্যসাচী (দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা): 'পথের দাবী' উপন্যাসের ডাক্তার বাবু বা সব্যসাচী চরিত্রটি ছিল বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক। তাঁর অদম্য সাহস ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র তৎকালীন যুবসমাজকে এতটাই উদ্বেলিত করেছিল যে ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।
#গফুর ও মহেশ (প্রান্তিক জীবনের হাহাকার): 'মহেশ' গল্পের দরিদ্র কৃষক গফুর এবং তার পোষা ষাঁড় মহেশের মধ্যকার ভালোবাসা ও গ্রামীণ শোষণের চিত্রটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ও বেদনাবিধুর ট্র্যাজেডি।
#নারী হৃদয়ের অতলান্ত রূপকার:--
বাংলা সাহিত্যে নারীর মনস্তত্ত্ব এবং তাঁদের সামাজিক অবস্থান শরৎচন্দ্রের মতো এত গভীরভাবে খুব কম লেখকই অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি নারীদের কেবল দেবী বা গৃহবধূ হিসেবে দেখেননি; দেখিয়েছেন তাঁদের আত্মসম্মান, ত্যাগ ও ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে।
#চরিত্রহীন-এর সাবিত্রী বা কিরণময়ী, #দেবদাস-এর পার্বতী ও চন্দ্রমুখী, #দত্তা-র বিজয়া কিংবা #শ্রীকান্ত-এর রাজলক্ষ্মী—প্রতিটি চরিত্রই সমাজের তৈরি সংস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পতিতা বা সমাজ-পরিত্যক্ত নারীদের মধ্যেও যে গভীর মানবিকতা এবং মাতৃত্ববোধ থাকতে পারে, তা শরৎচন্দ্র অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
#নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি কবিতা:
#শিরোনাম:-সার্ধশতবর্ষের অর্ঘ্য
#কলমে:- মৃণাল কান্তি পণ্ডিত
#তারিখ:- ১৫-০৯-২০২৬
পর্ণকুটিরে জ্বেলেছ যে আলো, হে অমর কথাশিল্পী,
তোমার ছোঁয়ায় দোলা লেগেছে বাঙালির হৃদয়-ঝিল্লি।
সেই আলোতেই চিনেছে বাঙালি—কাকে বলে পরম আরতি,
চোখের জলেতে রিক্ত করেছ নিখিল ধরণী-ভারতী।
রাজলক্ষ্মীর আঁচল-ছায়ায় কিংবা দেবদাস-ঝড়-তুফানে,
অনন্ত এক প্রেমের জোয়ার এনেছ দেশবাসীর ব্যাকুল পরাণে।
সমাজের বুকে শোষিত ও আর্ত, বঞ্চিত যত নারী,
তোমার পরশে পেয়েছে তাহারা, আশার নতুন এক তরণী।
সার্ধশতবর্ষের পুণ্য তিথিতে জানাই বিনম্র প্রণাম,
হে অপরাজেয় জাদুকর, তুমি অক্ষয় অবিরাম।
এক নজরে শরৎচন্দ্রের কালজয়ী সৃষ্টিসমূহঃ
তাঁর সুবিশাল সাহিত্যভাণ্ডারের প্রধান কিছু রত্ন নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো:--
উপন্যাসের নাম ।। প্রকাশের বছর সহ মূল উপজীব্য বিষয়:--
#বড়দিদি ।। ১৯১৩ -শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, বাল্যবিবাহ,মনস্তাপ ও প্রেম।
#পরিণীতা ।। ১৯১৪-ললিতা ও শেখরের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও শুদ্ধ প্রেমের জয়।
#শ্রীকান্ত ।। ১৯১৭–১৯৩৩ -চার খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস; জীবনের গভীর উপলব্ধি ও ভ্রমণ।
#চরিত্রহীন ।। ১৯১৭ -সামাজিক রক্ষণশীলতার মুখে কুঠারাঘাত ও নারীর মনস্তত্ত্ব।
#গৃহদাহ ।। ১৯২০ -অচলা, মহিম ও সুরেশের জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রেমের দ্বন্দ্ব।
#পথের দাবী ।। ১৯২৬ -সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ও দেশপ্রেমের জ্বলন্ত দলিল।
#রূপালি পর্দায় শরৎচন্দ্রের অমরত্ব:--
শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসের আবেদন এতটাই সর্বজনীন ও দৃশ্যমান যে, ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ তাঁর সৃষ্টির কাছে চিরঋণী। 'দেবদাস' উপন্যাসটি ভারতীয় চলচ্চিত্রে বারবার নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া পরিণীতা, দত্তা, মেজদিদি, স্বামী, বিন্দুর ছেলে ইত্যাদি কালজয়ী রচনাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্যবার রূপালি পর্দায় সেলুলয়েডের রূপ পেয়েছে।
#উপসংহার:--
চিরকালীন শরৎ-স্মরণশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেবল এক শতাব্দীর প্রতিনিধি নন, তিনি প্রতিটি যুগের বাঙালির আত্মিক সংকটের সহমর্মী বন্ধু। দেড়শত বছর পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালেও তাঁর সৃষ্টির আবেদন বিন্দুমাত্র মলিন হয়নি; বরং আজকের জটিল ও যান্ত্রিক সমাজেও তাঁর মানবিক মূল্যবোধ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মানুষের ভুলত্রুটিকে ছাপিয়ে তার ভেতরের খাঁটি মানুষটিকে ভালোবাসতে হয়। যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্পন্দন থাকবে, ততদিন বাঙালির আনন্দ-বেদনায়, প্রেমে ও দ্রোহে তিনি বেঁচে থাকবেন। হে অপরাজেয় অমর কথাসাহিত্যিক, তোমার সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে জানাই শতকোটি প্রণাম ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তুমি আমাদের হৃদয়ে অক্ষয়, চির অবিনশ্বর।
মৃণাল কান্তি পণ্ডিত
লেখক ও কবি, ত্রিপুরা
ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট
১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬


