আরশি কথা

আরশি কথা

No results found
    Breaking News

    আজ ১৬ সেপ্টেম্বর - "বিশ্ব ওজোন দিবস" ।। মৃণাল কান্তি পণ্ডিত ।। ত্রিপুরা ।। আরশিকথা অতিথি কলাম

    আরশি কথা

    আজ ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে 'আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস' বা "বিশ্ব ওজোন দিবস"।   এই দিবসটি কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রেক্ষাপট কি?

    ওজোন স্তরের এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার আগে আমার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে হয়। আমার চাকরি জীবনের শুরু ত্রিপুরার বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পরিবেশ দপ্তরের একজন প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে এই  পেশাতেই চাকরি জীবনের বেশিরভাগ সময়  কেটেছে -- ত্রিপুরার একমাত্র হর্টিকালচার রিসার্চ সেন্টার , নাগিছড়া এবং একমাত্র স্টেট এগ্রিকালচার রিসার্চ সেন্টার, অরুন্ধতী নগর, গবেষণাগারে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পরিবেশ দপ্তরে থাকাকালীন সময়ে ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু ( মার্চ মাসের শেষে অথবা এপ্রিলের প্রথম দিকে ) ত্রিপুরা থেকে দূরবীন দিয়ে দেখা যাবে-- এইটাই ছিল  সেসময়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা, আর তাই দপ্তরের কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে আমাকেই বেছে নিলেন। আমাকে দেওয়া হলো উচ্চ শক্তির একটি দূরবীন। বস্তুত সেই সময়েই হ্যালির ধূমকেতু পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি দূরত্বে (প্রায় ৬২ মিলিয়ন কিলোমিটার) অবস্থান করছিল। ভারতসহ দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো থেকে ধূমকেতুটি দেখার জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে সেরা ও উজ্জ্বলতম সময়। অবশেষে সেই প্রতিক্ষিত হ্যালির ধূমকেতু দেখার সুযোগ হয়।  হ্যালির ধূমকেতু উপলক্ষে এবং পরবর্তী আরও কিছু সময়, সবমিলিয়ে দীর্ঘ একবছর জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। রাতের নিস্তব্ধতায় আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করে আমাদের সৌরজগত, এই মিল্কিওয়ের বহু তথ্য জানার সৌভাগ্য হয়। আর তখন থেকেই ওজোন স্তরের এফেক্ট সম্পর্কে আমার সম্যক ধারণা। পরবর্তী সময়ে যখন হর্টিকালচার এবং কৃষি গবেষণাগারে ছিলাম, সে সময় একজন গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যে গবেষণাধর্মী অনেকগুলো ল্যাবরেটরি তৈরি করতে হয়েছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল গ্রীন হাউস এবং টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরি গুলো তৈরি করতে গিয়ে আমাকে Ultra Violet ray এবং shed net - এর ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিতে হয়। ধারণা নিতে গিয়ে এদের সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হয়েছিল।

                 ইউভি ফিল্ম (UV Film) হলো:--  এমন একটি পাতলা প্লাস্টিক বা পলিস্টার আস্তরণ, যা অতিবেগুনি রশ্মি (Ultraviolet Ray) বা UV আলো প্রতিরোধ করতে ব্যবহৃত হয়। 

    এটি প্রধানত দুই ধরনের:--

    ১. মোবাইল স্ক্রিন প্রটেক্টর (UV Tempered Glass/Film) এবং 

    ২. জানালা বা গ্লাসের ফিল্ম (UV Window Film).

                 শেড নেট (Shed Net) বা গ্রিনহাউস নেট হলো:--  এক ধরণের বিশেষভাবে তৈরি জাল বা নেট, যা সাধারণত উচ্চ মানের প্লাস্টিক (যেমন- হাই ডেনসিটি পলিথিন বা HDPE) দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি সরাসরি সূর্যের আলো, তীব্র বাতাস, শিলাবৃষ্টি এবং পোকামাকড় থেকে ফসলকে যেমন রক্ষা করে , তেমনি এই জালগুলো বিভিন্ন ঘনত্বের হয়ে থাকে (যেমন: ৫০%, ৭৫%, বা ৯০% শেড নেট ) । ফসলের  প্রয়োজন অনুযায়ী এই ধরণের নির্দিষ্ট নেট ব্যবহার করে,  ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণে সূর্যের আলো ও বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। কৃষকরা মূলত কৃষিকাজে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং ফসলের সুরক্ষায় এটি ব্যবহার করেন। 

                  নিচে কৃষকদের শেড নেট ব্যবহারের মূল কাজ ও সুবিধাসমূহ দেওয়া হলো:--      

                    কৃষকদের শেড নেট ব্যবহারের মূল কাজ:-- সূর্যের আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ:--     

                 অতিরিক্ত রোদ ও তাপমাত্রার হাত থেকে সংবেদনশীল গাছপালাকে রক্ষা করে এই শেড নেট। এটি ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ। ফলে  সারা বছর শেড নেটের ভেতরে কৃত্রিমভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে  কৃষকরা যেকোনো ঋতুতেই অসময়ের বা আনসিজনাল দামি ফসল ও সবজি চাষ করতে পারেন। 

                    চারা তৈরি বা নার্সারি: -- নতুন ও নরম চারার জন্য অতিরিক্ত রোদ বা বৃষ্টি ক্ষতিকর। নার্সারিতে চারা গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য শেড নেট দিয়ে চমৎকার সুরক্ষিত পরিবেশ তৈরি করা হয়। 

                পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষা:--  এটি ফসলকে ক্ষতিকর পোকামাকড়, পাখি এবং বিভিন্ন রোগ ছড়ানো জীবাণু থেকে দূরে রাখে। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক কমে যায়। 

                প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা:--  তীব্র ঝড়-বাতাস, অতিবৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টির সরাসরি আঘাত থেকে ফসলকে বাঁচায়। 

                জলের অপচয় রোধ: -- শেড নেটের নিচে সরাসরি কড়া রোদ পড়ে না, ফলে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। এর ফলে সেচের জলের ব্যবহার কমে যায় এবং ঘন ঘন জল দিতে হয় না, ফলে কৃষকের পরিশ্রম অনেকটা লাঘব হয়। কৃষকরা সাধারণত এই নেটের নিচে টমেটো, ক্যাপসিকাম, শসা, স্ট্রবেরি, বিভিন্ন ধরণের ফুল (যেমন- অর্কিড, জারবেরা) এবং বিভিন্ন শাকসবজির চারা উৎপাদন করে থাকেন। 

                  যে বিষয়ে আজ আলোচনা, সেই ওজোন স্তর নিয়ে মূল আলোচনায় আসা যাক। 

                 ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের এই দিনে ওজোন স্তর ধ্বংসকারী রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হ্রাস করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক 'মন্ট্রিল প্রোটোকল' স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর দিনটিকে 'ওজোন স্তর সংরক্ষণ' বা 'বিশ্ব ওজোন দিবস' -- এই সচেতনতা দিবসটি পালন করা হয়। 

             ২০২৬ সালের বিশ্ব ওজোন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা থিম হলো: --

    “Global action for a cooler planet” (একটি শীতল গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ)। মন্ট্রিল প্রোটোকলের আওতাধীন 'কিগালি সংশোধনী'-র ১০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব শীতলীকরণ প্রযুক্তির (Sustainable Cooling) ওপর এবার বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। 

                 ওজোন স্তর কী এবং এর ভূমিকা:-- 

                পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে (ভূমি থেকে প্রায় ১৫-৩৫ কিলোমিটার উপরে) ওজোন গ্যাসের একটি সূক্ষ্ম আবরণ রয়েছে, যা ওজোন স্তর নামে পরিচিত। 

               মহাজাগতিক ঢাল:-- এটি সূর্য থেকে আসা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি (UV Radiation) ৯৭% থেকে ৯৯% পর্যন্ত শোষণ করে নেয়।

               প্রাণের রক্ষাকবচ: -- ওজোন স্তর না থাকলে এই অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসত এবং মানুষসহ সমস্ত জীবজগতের অস্তিত্ব বিপন্ন হতো। 

         ‌      ওজোন স্তরের বর্তমান অবস্থা (২০২৬ সালের আপডেট):--

         ‌      বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের কারণে ওজোন স্তরের ক্ষয় রোধে পৃথিবী এক অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং নাসার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমান পরিস্থিতি নিম্নরূপ:--

            ওজোন হোল বা ফাটল সংকুচিত হচ্ছে:--

            গত কয়েক বছরে অ্যান্টার্কটিকার ওপরের ওজোন স্তরের ফাটলটি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ (২০২৫-২০২৬) অনুযায়ী, এটি ১৯৯২ সালের পর থেকে অন্যতম ক্ষুদ্রতম এবং স্বল্পস্থায়ী ফাটল হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে, যা ওজোন স্তর নিরাময়ের (Healing) একটি বড় প্রমাণ। 

               পূর্ণ পুনরুদ্ধারের সময়সীমা (Recovery Timeline): --

                জাতিসংঘ-সমর্থিত বিজ্ঞানীদের প্যানেলের সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন (Scientific Assessment of Ozone Depletion) অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের মন্ট্রিল প্রোটোকল চুক্তি মেনে ওজোন ক্ষয়কারী রাসায়নিকগুলোর (যেমন- CFCs) ব্যবহার যেভাবে কমানো হয়েছে, সেই বর্তমান নীতি ও বিধিনিষেধগুলো সঠিকভাবে বজায় থাকলে ওজোন স্তর তার ১৯৮০ সালের পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে।

                অঞ্চলভিত্তিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিচে দেওয়া হলো:-- 

               বিশ্বের বাকি অংশে:--  ২০৪০ সালের মধ্যে। 

                সুমেরু বা আর্ক্টিক অঞ্চলে:-- ২০৪৫ সালের মধ্যে।

              ‌ কুমেরু বা অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে: -- ২০৬৬ সালের মধ্যে। 

              বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে এর প্রভাব ও গুরুত্ব:--

               ওজোন স্তর সুরক্ষার প্রচেষ্টা নেওয়াও  বৈশ্বিক পদক্ষেপগুলোর ইতিবাচক প্রভাব এখন আমাদের জলবায়ু ও জীবনের ওপর সরাসরি দৃশ্যমান:-- 

                স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস:-- ওজোন স্তর নিরাময় হতে থাকায় পৃথিবীতে অতিবেগুনি রশ্মির প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের ত্বকের ক্যানসার (Skin Cancer), চোখের ছানি (Cataracts) এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। 

                জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ন্ত্রণ:--  ওজোন স্তর ধ্বংসকারী ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFCs) গ্যাসের ব্যবহার ৯৯% বন্ধ করা গেছে। এই গ্যাসগুলো শুধু ওজোনের ক্ষতিই করত না, বরং শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাসও ছিল। এগুলো বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। 

               বাস্তুতন্ত্র ও কৃষির সুরক্ষা:-- অতিবেগুনি রশ্মির প্রকোপ কম থাকায় সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (যা সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের মূল ভিত্তি) এবং স্থলভাগের উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে না। ফলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে। 

                 সতর্কবার্তা:--  সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিল্পকর্মে রাসায়নিকের ব্যবহারের আইনি ফাঁকফোকর ও সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার কারণে ওজোন স্তরের সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া হয়তো কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে। তাই পুরোপুরি ওজোন স্তর সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী কড়া নজরদারি ও পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। 

                ওজোন স্তর ধ্বংসের পেছনে দায়ী প্রধান রাসায়নিক উপাদানগুলো এবং এটি রক্ষায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের করণীয়গুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:--

                ১. ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রধান রাসায়নিক উপাদান (Ozone-Depleting Substances - ODS)

    বায়ুমণ্ডলে ওজোন অণু (O₃) ভেঙে ফেলার জন্য মূলত ক্লোরিন (Chlorine) এবং ব্রোমিন (Bromine) যুক্ত কিছু মানবসৃষ্ট স্থিতিশীল রাসায়নিক যৌগ দায়ী। প্রধান উপাদানগুলো হলো: -- 

    ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC): -- এটি ওজোন স্তর ধ্বংসের সবচেয়ে প্রধান কারণ। আগে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, অ্যারোসোল স্প্রে ক্যান এবং ফোম তৈরিতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। 

    হাইড্রোক্লোরোফ্লুরোকার্বন (HCFC): -- সিএফসি-র বিকল্প হিসেবে এটি সাময়িক ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল, তবে এটিও ওজোন স্তরের ক্ষতি করে (যদিও সিএফসি-র চেয়ে কম)। মন্ট্রিয়াল প্রোটোকলের আওতায় এটিও এখন নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। 

    হ্যালন (Halons):-- এই যৌগগুলোতে ব্রোমিন থাকে, যা ক্লোরিনের চেয়েও কয়েক গুণ দ্রুত ওজোন ধ্বংস করতে পারে। এগুলো সাধারণত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে (Fire Extinguishers) ব্যবহৃত হতো। 

    মিথাইল ব্রোমাইড (Methyl Bromide):--  এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কীটনাশক, যা কৃষিক্ষেত্রে এবং ফল-মূল ও ফসল সংরক্ষণে বালাইনাশক ( presticide)  হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

    কার্বন টেট্রাক্লোরাইড (Carbon Tetrachloride): -- শিল্পকারখানায় দ্রাবক (Solvent) হিসেবে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এটি ব্যবহৃত হয়। 

    নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O):--  যদিও এটি সরাসরি মন্ট্রিয়াল প্রোটোকলের ওজোন ক্ষয়কারী তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে বর্তমান সময়ে এটি অন্যতম প্রধান ওজোন ধ্বংসকারী গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত, যা মূলত নাইট্রোজেন সার এবং যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়। 

                  ২. ওজোন স্তর রক্ষা করতে দৈনন্দিন জীবনে আমাদের করণীয়:-- 

                   ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা ওজোন স্তর সুরক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারি:

    'Eco-friendly' বা ওজোন-বান্ধব সামগ্রী কেনা: নতুন ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার বা কুলিং সিস্টেম কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে সেগুলো CFC-free বা HFCs/HFOs (যা ওজোনের ক্ষতি করে না) প্রযুক্তিসম্পন্ন।

    এসি ও রেফ্রিজারেটরের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ:--

                    পুরনো ফ্রিজ বা এ.সি. ঠিকমতো কাজ না করলে বা লিক হলে তা থেকে ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাস বাতাসে মিশে যায়। তাই নিয়মিত টেকনিশিয়ান দিয়ে এগুলো সার্ভিসিং করানো উচিত।

    অ্যারোসোল স্প্রে ব্যবহার কমানো:--  বডি স্প্রে, রুম ফ্রেশনার বা বিভিন্ন ক্লিনিং স্প্রে কেনার সময় "CFC-Free" লেবেল দেখে নিন অথবা স্প্রে ফরম্যাটের বদলে বিকল্প পণ্য ব্যবহার করুন।

    রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো:--  কৃষিকাজে বা ছাদবাগানে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিক সার ও মিথাইল ব্রোমাইড সমৃদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার না করে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশক (Pesticide) ব্যবহার করা।

    পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্নতাকারী উপাদান ব্যবহার:--  বাজারচলতি রাসায়নিক ক্লিনিং প্রোডাক্টের বদলে ভিনেগার বা বেকিং সোডার মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করার ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা খুব প্রয়োজন।

    যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ:-- গাড়ি বা মোটরবাইক কম ব্যবহার করে হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা গণপরিবহন (Public Transport) ব্যবহার করলে নাইট্রোজেন অক্সাইডের নির্গমন অনেকটাই কমে যায়।

    সচেতনতা বৃদ্ধি:--  ওজোন স্তরের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সমাজকে সচেতন করা। 

    ওজোন স্তর রক্ষা করার অর্থ হলো সরাসরি নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা।

                 আপনার ফ্রিজ বা এসি ওজোন-বান্ধব (Eco-friendly) কিনা তা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ। নিচে এর প্রামাণিক উপায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ওজোন স্তরের পারস্পরিক গভীর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

                   ১. ফ্রিজ ও এসি ওজোন-বান্ধব কিনা যাচাই করার ৩টি সহজ উপায়:--

    আপনার ব্যবহৃত বা কিনতে যাওয়া কুলিং ডিভাইসের ব্যাক-প্যানেল বা স্টিকারে কিছু সুনির্দিষ্ট সংকেত দেখে এটি নিশ্চিত করা যায়।

    গ্যাস বা রেফ্রিজারেন্টের কোড দেখা (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য) খুব প্রয়োজন: -- ফ্রিজের পেছনে বা এসির আউটডোর ইউনিটের গায়ে একটি মেটাল প্লেট বা স্টিকার থাকে, যেখানে ব্যবহৃত গ্যাসের নাম লেখা থাকে। 

    ওজোন-বান্ধব ও পরিবেশ-বান্ধব গ্যাস:--  যদি সেখানে R-600a (আইসোবিউটেন) বা R-290 (প্রোপেন) লেখা থাকে ,তবে বুঝতে হবে এগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং ওজোন স্তরের জন্য শতভাগ নিরাপদ। এছাড়া এসির ক্ষেত্রে R-32 গ্যাসও ওজোন স্তরের ক্ষতি করে না।

    ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাস (বর্জনীয়):--  যদি সেখানে R-22 (সাধারণত পুরনো এসিতে থাকে) লেখা থাকে, তবে এটি ওজোন স্তরের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং মন্ট্রিয়াল প্রোটোকল অনুযায়ী এটি এখন নিষিদ্ধের তালিকায় রয়েছে। 

               গ্রিন বা ইকো-লেবেল (Green/Eco Labels) চেক করা: -- ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নতুন পরিবেশ বিধি অনুযায়ী, পরিবেশ ও ওজোন উইংগুলো এখন এসি এবং ফ্রিজের গায়ে বিশেষ Eco-Friendly Refrigerant বা Green Label যুক্ত করছে। এই ধরনের স্টিকার থাকলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি পরিবেশের ক্ষতি করবে না। 

    ব্যবহারকারীর নির্দেশিকা (User Manual) পড়া:--  যদি পণ্যের গায়ে স্টিকারটি অস্পষ্ট বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর অফিসিয়াল ক্যাটালগ বা ব্যবহারকারী নির্দেশিকায় থাকা 'Technical Specifications' বা 'Refrigerant Type' অংশটি দেখে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে। 

                ২. জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর ওজোন স্তরের প্রভাব:--

                ওজোন স্তরের ক্ষয় এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন—দুটি ভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া হলেও এদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং দ্বিমুখী:

    গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে ওজোন ক্ষয়কারী রাসায়নিক: যে সিএফসি (CFC) বা এইচসিএফসি (HCFC) গ্যাসগুলো ওজোন স্তর ধ্বংস করে, সেগুলো কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। মন্ট্রিয়াল প্রোটোকলের মাধ্যমে এই গ্যাসগুলোর ব্যবহার ৯৯% কমিয়ে আনার ফলে ওজোন স্তর তো রক্ষা পেয়েছেই, একই সাথে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি (Global Warming) প্রায় ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। 

                বিকল্প গ্যাসের নতুন সংকট ও 'কিগালি সংশোধনী': -- সিএফসি-র পরিবর্তে আমরা ফ্রিজ ও এসিতে যেসব এইচএফসি (HFCs যেমন: R-134a, R-410A) গ্যাস ব্যবহার শুরু করেছিলাম, সেগুলো ওজোন স্তরের ক্ষতি না করলেও অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে তুলছিল। এই কারণে ২০১৬ সালের 'কিগালি সংশোধনী' অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এইচএফসি (HFC) গ্যাসও ধাপে ধাপে বন্ধ করে R-600a এবং R-290 এর মতো পরিবেশ-বান্ধব প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। 

                  কার্বন সিঙ্ক (Carbon Sink) রক্ষা:--  ওজোন স্তর যদি অতিবেগুনি রশ্মিকে (UV Rays) না আটকাত, তবে পৃথিবীর বিশাল বিশাল বনভূমি এবং সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ধ্বংস হয়ে যেত। এই গাছপালা ও উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে (যাকে কার্বন সিঙ্ক বলে)। ফলে ওজোন স্তর পরোক্ষভাবে পৃথিবীর কার্বন শোষণের ক্ষমতা টিকিয়ে রেখে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে রাখছে। 

              জলবায়ু পরিবর্তনের পাল্টা প্রভাব:--  বিপরীতভাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা বাড়লেও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার (যেখানে ওজোন স্তর থাকে) শীতল হয়ে যাচ্ছে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অতিরিক্ত শীতল হলে সেখানে মেঘের সৃষ্টি হয় যা ওজোন ক্ষয়ের রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওজোন স্তর নিরাময়ের গতি কিছুটা শ্লথ বা বিলম্বিত হতে পারে। 

                 সংক্ষেপে, ওজোন স্তর রক্ষা করার বৈশ্বিক লড়াইটি একই সাথে পৃথিবীর জলবায়ু সংকট মোকাবেলার অন্যতম বড় হাতিয়ার।


    মৃণাল কান্তি পণ্ডিত

    লেখক ও কবি

    ত্রিপুরা


    আরশিকথা অতিথি কলাম


    ছবিঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট

    ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

     

    3/related/default