গেট টুগেদার" ...... সুদূর ওমান থেকে আরশিকথা'য় গল্প লিখলেন মৌসুমি ভট্টাচার্য - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

রবিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯

গেট টুগেদার" ...... সুদূর ওমান থেকে আরশিকথা'য় গল্প লিখলেন মৌসুমি ভট্টাচার্য

আজ সোমার শ্বাস নেবার ফুরসত হচ্ছে না ।সকাল থেকে সাজো সাজো রব । কোনোমতে স্বামীকে আপিসে রওনা করিয়ে সে ঘর গোছাতে লেগে গেল । তার বাড়িতেই স্কুলের বান্ধবীদের গেট-টুগেদার হবে ।সবাই একই শহরে থাকে,তো মাঝেমাঝেই তারা কারো বাড়িতে একত্রিত হয়ে আড্ডা দেয় ।হৈ হুল্লুড়ে মনেই থাকে না যে তারা পঞ্চাশ পেরিয়েছে । সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত ,ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে স্থিতু হবার পথে । বেশ লাগে বাল্য বান্ধবীদের খুনসুটি ,পেছনে লাগা । আজকের প্রধান আকর্ষণ পৌলমী,কাতারে থাকে,সেখানে এক ইন্ডিয়ান স্কুলে অংক শিক্ষিকা । কলকাতায় গরমের ছুটিতে এসেছে ,তার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সিডি বেরোচ্ছে । রেকর্ডিং করতে এসেছিল ।বহু বছর পর পৌলমীকে খুঁজে পাওয়া গেছে এক সোশাল মিডিয়ার মারফতে ।নিয়মিত গান পোস্ট করে পৌলমী ,তাদের সবার খুব পছন্দ ওর গান । আজও কয়েকটা শোনার ইচ্ছে আছে । পরিবেশ যাতে রাবীন্দ্রিক লাগে সোমা রজনীগন্ধার স্টিক গুলো জলে ভিজিয়ে রেখেছে । খাবার এক পরিচিত রেস্টুরেন্টে অর্ডার দেয়া আছে,সময়মতো এসে যাবে । ব্যাস,চান করে রেডি হয়ে থাকবে ।চানে যাবে এমন সময় ফোন এল ,সুতনুকা । জানতে চাইল কিছু ফুড আইটেম আনবে কিনা । সোমা মানা করল,সে ট্রিট দেবে বন্ধুদের ।একথা সে কথার পর সুতনুকা বলল, “ তোরা তো গায়িকাকে একটু বেশি পাত্তা দিচ্ছিস ।বড়লোক এন আর আই ,একটু দেখাতে চায় পৌলমী যে সে বেস্ট ।ওসব পয়সা দিয়ে সিডি অনেকেই বের করছে । ক জন শোনে ! সিডি তো আজকাল চলেই না
। আরে গান আমরা সবাই শিখেছিলাম,এখন সংসারের চাপে আমরা ছেড়ে দিয়েছি ,পৌলমী ছাড়ে নি ।’’
 সোমা হতবাক হয়ে যায় ,এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা,তা আবার এত তীব্র ঈর্ষামিশ্রিত !বিরক্তি চেপে বলে, “ হা রে , বাঙ্গালী বাড়িতে ছোটবেলায় মেয়েদের গান শেখানো হয় । কিন্তু পরে ক জন চর্চা রাখে ? ইচ্ছে থাকলে পারা যায় ঠিকই । পৌলমীর গলা খুবই ভাল আর এখনো গাইছে সেটাও প্রশংসনীয় । ওর প্রতিভা আছে ।’’ সুতনুকা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সোমা শুনতে চাইল না । বলল, “ আয়, আড্ডা দেব ।আমার অনেক কাজ পড়ে ,দেরী হয়ে যাবে ।’’ চান করতে করতে সুতনুকার কথা ভাবছিল সোমা।অতীব সুখী,হায়দ্রাবাদে থাকে ,মাঝেমাঝে কলকাতায় আসে । এখানেও ফ্ল্যাট আছে ,গৃহবধূ। স্বামী বড় চাকরে,ছেলেও দাঁড়িয়ে গেছে ।  কিছু ভাগ্যবতী আছে,যাদের জীবন খুব মসৃণ হয় ,কোন কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় নি,সুতনুকা এমনি একজন ।ঘ্যানঘ্যান করে নিজের কিছু না করার অজস্র ফিরিস্তি দিতে থাকে যা খুব বিরক্তিকর । কারো সাফল্য দেখলেই ওর মনে হয়,সে কিছু করল না। নইলে তার মধ্যেও প্রচুর সম্ভাবনা ছিল ।এরকম অদ্ভুত এক কমপ্লেক্সে ভোগে সে ।
একে একে সবাই এসে গেল ,দুজন পরে আসবে অফিস ফেরত। বাকিরা গৃহবধূ,কোনো সমস্যা নেই,সুগার ,প্রেশারজনিত সমস্যা ছাড়া ।ছন্দা আর সুদীপা চলে এল কিছু মিষ্টি নিয়ে । ছন্দা ভারী ভীতু,রাস্তাঘাট কিছুই চেনে না।যেখানে যায় স্বামীর সাথেই যায়। দীপ্তি,রঞ্জিতা আধ ঘন্টার মধ্যে এল । ব্যাস,আড্ডা জমে উঠল ।রঞ্জিতা খুব আমুদে,হৈ হৈ করে বেশ জমাতে পারে । পৌলমী এল ট্যাক্সি করে ,হাতে বেশ বড় প্যাকেট । ‘ এই যে প্রধানা অতিথি এসে গেছেন’’ ,বলে সোমা দু হাত বাড়িয়ে পৌলমীকে   জড়িয়ে ধরল ।

পৌলমী হাসিমুখে বলল, “ বাব্বা,কত বছর পর দেখলাম তোদের । সবাই বুড়ি হয়ে গেছি ।রঞ্জিতা ,একই রকম সুন্দর আছিস । ভারী হয়েছিস একটু।’’
 “ হা রে,আমি একটু খেতে ভালবাসি । আর ব্যায়াম,যোগা এসব করি না । কিন্তু তুই ভারী হয়ে ভাল দেখাচ্ছিস ।স্কুলে যখন ছিলিস,বড় রোগা কাঠিকাঠি ছিলিস ।’’
সত্যি,পৌলমীর মধ্যে  ব্যক্তিত্ব আর সৌন্দর্য মিলে  তাকে ভারী আকর্ষণীয়া লাগছে ।   “ তারপর বল,তুই  তো আবার গায়িকা হয়েছিস !” সুতনকা কখন ঘরে ঢুকেছে,কেউ লক্ষ্য করে নি ।
 “আরে না,আমার অনেকদিনের সখ ছিল,রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কিছু করি । আমার হাজব্যান্ডও উৎসাহ দিল ।’’ লাজুক হেসে পৌলমী জানাল ।
 “ আমার জীবন তো সংসার ঠেলে,ছেলে বড় করতেই গেল। নিজের জন্য সময়,সুযোগ কোথায় পেলাম ! আমার মা থাকতেন আমার কাছে । এখন মা নেই,ছেলেও অন্য শহরে চাকরি করে । এখন গান শুনি,গাই ও,কিন্তু আফসোস হয়,কিছুই করা হল না ,’’ সুতনুকা বলল।
“ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি,সময়,সুযোগ কেউ দেয় না । নিজেকেই করে নিতে হয় ’’,মৃদু হেসে পৌলমী বলল।
“ সে তুই বলতে পারিস,তোকে তো আমার জীবন কাটাতে হয় নি । সব কিছুই করছিস ।চাকরি,গান”,রাগত ভাবে বলল সুতনুকা ।
পৌলমীর মুখ  কঠিন হল । ব্যাগ থেকে সিডি বের করে রঞ্জিতাকে দিল ।
  
 “ আরে আমাকে দিস না,শোনা হবে না । রাজনীতি করি,গণসঙ্গীতের চর্চাই হয়। তাছাড়া সিডি আজকাল শোনে বলে তো জানি না,”শ্লেষের সুরে রঞ্জিতা বলে । সুতনুকা আর রঞ্জিতার মধ্যে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হয় । বাকিরা কেউ উৎসাহ দেখায় না । ।রঞ্জিতার অদৃশ্য লীডারশীপ চলে বান্ধবীদের মধ্যে ।পৌলমী একটু ম্লান হয়ে যায় ,কিন্তু নিজেকে সামলে  নিয়ে বলে, “ ঠিক বলেছিস,সিডি চলে না ।ইউ টিউবে দেয়া হয়েছে,আরো কিছু অনলাইন সাইটে । আমি লিংক দেব । সিডি গুলো আমি এমনি দিচ্ছি। মেমেণ্টো হিসেবে রেখে দিস। গান তো সবাই শুনিস । আমার শুনে বলিস কেমন লাগল’’।সবার হাতে হাতে সিডি দিয়ে বলল, “ আমি খুব পরিশ্রম করে এ জায়গায় পৌঁচেছি,খুব কঠিন এক জীবন কাটিয়ে। কিন্তু এ নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করা আমার ভাল লাগে না । আর রঞ্জিতা,গণসঙ্গীতের সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কোনো বিবাদ তো নেই ।রেখে দে,কখনো ইচ্ছে হলে শুনবি ।ও হা,আরেকটা কথা ,পরশু সকাল আটটায় ডিডি বাংলা খুলিস,আমার গান আছে”।
“ আমার সকালে সময় হবে না ,যা কাজ থাকে”রঞ্জিতা জানাল।
“আমি তো ফ্লাইটে থাকব,হায়দ্রাবাদে এ সব চ্যানেল পাই না। বাট,অল দা বেস্ট”,কাষ্ঠহেসে সুতনুকা বলল।
ছন্দা ভাবছিল কিছু বলবে কিনা,রঞ্জিতা যদি বিরক্ত হয়,তাই ভেবে কিছু বলল না। সবসময় হাওয়ার দিকেই থেকেছে,বিপরীতে যাবার সাহস সে রাখে না।শুধু সুদীপা আর সোমা জানাল ওরা অবশ্যই শুনবে ।
অন্য প্রসঙ্গ উঠল,মস্করা,শাড়ি,শপিং ।কিছুক্ষণ বাদে মনীষা এল,ঝাঁঝিয়ে বলল, “এই তোরা   রবিবার ছাড়া কেনো  এসব রাখিস ? আমার কথা একটু ভাবিস না !”
মনীষা সরকারি পদস্থ অফিসার ।খুব সুন্দর করে সাজে । ঘরে বাইরে এত দায়িত্ব,এত টেনশন ! বন্ধুদের মাঝে কিছুক্ষণ ভুলে থাকা যায় সব ।ভাবে,বেশ তো আছে এই গৃহবধূরা । এদের স্বামীরা সব সামলায় । রিনরিনে ঈর্ষা অনুভব করে । টেনশন আর দুঃখ লুকাতে মেক আপ চড়া হয়েছে দিনদিন ।মদ্যপ স্বামি,রুগ্ন শাশুড়ি,ছেলের কেরিয়ার !
পৌলমী ভাবে,এরা তো দেশে বেশ আছে ।শুধু সে দূর বিদেশে থেকে সবকিছু মিস করে ।আর যেমন ভেবেছিল,তেমন হল কোথায় !খুব সাদর,উষ্ণ অভ্যর্থনা তো পেল না । ওই নেকিচন্ডীকে নিয়েই রঞ্জিতা আদিখ্যেতা করে। দুটিতে খুব ভাব । সুতনুকা তারও ভাল বন্ধু ছিল, কিন্তু এখন  কি ঈর্ষান্বিত ! কবে থেকে এত দূরত্ব তৈরী হল !
সোমা খাবার সাজিয়ে নিয়ে এল ।পৌলমীকে গান গাইতে বলবে ভেবেছিল,কিন্তু পাবলিকের মুড দেখে প্রস্তাব আর দেয় না ।তাকে এই বান্ধবীদের সাথে থাকতে হবে। নইলে বড় একা লাগে।
সন্ধ্যা নামে,ছন্দা উসখুস করতে থাকে। বাড়ি যাওয়া দরকার ।সবাই কত কিছু বলছে,স্বামী,ছেলেমেয়ে,চাকরী,বেড়ানো ! তার কিছুই নেই বলার ।অনেক বেশি বয়সে বিয়ে হয় । চাকরীও করে না,ছেলেপুলেও নেই ।
প্রচুর হৈ হুল্লুড়,খাওয়া দাওয়ার পর ‘গেট্টু’ সাঙ্গ হল । গৃহকর্ত্রী গেটে দাঁড়িয়ে সবাইকে বিদায় জানাল ।রঞ্জিতা একটু টয়লেটে গেছল,সবশেষে সে গেল । সোমা বেশ পরিতৃপ্তির সাথে ডিনার করতে করতে স্বামীকে বিবৃতি দিচ্ছিল । পৌলমীর সিডি বাজছিল,ওর মিষ্টি গলায়, ‘মনে কি দ্বিধা ....’এক আবেশ সৃষ্টি করেছিল ।
সোমার স্বামী ডিনার সেরে সিগারেট ধরিয়ে বলল,  “ তোমার বান্ধবীদের মধ্যে ক্লিপটোম্যানিয়াক কে? তাকে আর আসতে না দেয়াই ভাল”।
 “কি কে?”সোমা অবাক হয়ে বলল।
 “কেন,প্রথম শুনলে ? গুগল ঘেঁটে দেখ। ড্রয়িংরুম থেকে একটা দামী এন্টিক পীস দেখছি না। সকালেও ছিল । কাট গ্লাসের এত সুন্দর জিনিষটা 1”
সোমা সাথে সাথে স্মার্টফোনে মানে দেখে নেয় ,অবাক হয়ে ভাবে এ কার কাজ হতে পারে !তবে কি ....!কাল সকালে সুদীপাকে ফোন করবে । ওর কাছে সবার হাঁড়ির খবর থাকে। ছি ছি !! এক স্ক্যান্ডেলের  বিষয় পেয়ে চাঙ্গা লাগে ,অপেক্ষা করে পরদিন সকালের ।
ছবিঃ ইন্টারনেট হইতে সংগৃহীত
মৌসুমি ভট্টাচার্য, ওমান

১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ইং

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here