"ডাইনিং টেবিল" -- ত্রিপুরা থেকে সুস্মিতা ধর এর ছোট গল্প - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

test banner

Post Top Ad

test banner

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০

"ডাইনিং টেবিল" -- ত্রিপুরা থেকে সুস্মিতা ধর এর ছোট গল্প

থার্ড  পিরিয়ডের  ক্লাস টেনের কেমিস্ট্রি  ক্লাস শেষ  করে কমন রুমে এসেই জলের বোতল  থেকে বেশ কিছুটা জল খেয়ে নিল বর্ণালী। বড্ড গরম পড়েছে  আজ। তার মাঝে ক্লাসে আজ প্রায়  সবাই প্রেজেন্ট। একশ ছেলে- মেয়েকে নিয়ে এই গরমে ক্লাস করা যে কি কষ্ট  তা যিনি করেন তিনিই বোঝেন। পরের ক্লাস আবার পঞ্চম পিরিয়ডে।মাঝে বেশ কিছুটা  সময় আছে। এই ফাঁকে ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখে নেওয়া যাক। এই ভেবে বর্ণালী সবে মাত্র  খাতাগুলো খুলেছে অমনি বেজে উঠল ফোনটা। চেয়ে দেখে সুনীলের ফোন। সুনীল আর বর্ণালী ক্লাস সিক্স থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত  একই স্কুলে  পড়েছে।ও এখন এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের বড়ো অফিসার। ওদের সাথের স্কুল  বন্ধুরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে  ভারতবর্ষ এবং তার বাইরেও। সুনীল,অসীম, তাপস এবং আরও কয়েকজনের আন্তরিক প্রচেষ্টায়  বাইরের  বন্ধুরা  আগরতলা এলেই সবাই মিলে একসাথে জড়ো হয়। বেশ একটা হৈ চৈ হয়। বর্ণালী ফোন ধরতেই সুনীল উচ্ছ্বসিত। "এই জানিস বিদিশা আসছে, তোর ফোন নম্বর নেই ওর কাছে। আমাকে বলল স্পেশালি  তোর সাথে  দেখা করতে চায়। কতদিন  পরে আসছে বল? তুই কিন্তু  না বলতে পারবি না। " একশ্বাসে কথাগুলো  বলে  দম নিল সুনীল।  ওর স্বভাবই এমন,ভীষণ  তড়বড়ে। বিদিশা নামটা শুনেই একটু থমকাল বর্ণালী।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল --- "ঠিক আছে তোরা সব অ্যারেন্জমেন্ট কর, আমি আছি।" 

ফোন রাখতেই স্মৃতিগুলো সব হুড়মুড়িয়ে  ভেসে উঠল বর্ণালীর চোখে। রীতিমতো  পরীক্ষা দিয়ে  আগরতলার বনেদী স্কুলে  ক্লাস সিক্সে ভর্তি  হয়েছিল  বর্ণালী আর তার যমজ বোন মিতালী। টাউন বাস করেই স্কুলে  যাওয়া আসা করত দুই বোন।একই বাস স্টপ থেকে স্কুলে  যেত বিদিশা  আর ওর দিদি। টিফিন  ভাগ করে খাওয়া  থেকে শুরু করে একসাথে  কাবাডি খেলা সবকিছুতেই বর্ণালী আর বিদিশা  থাকত একসাথে।  বর্ণালীর টিফিনে রোজই থাকত রুটি-তরকারী।আর বিদিশার টিফিনে থাকত কোনোদিন আপেল,কোনোদিন সন্দেশ,আবার কোনোদিন পুডিং বা কেক।আর হবে নাই বা কেন,বর্ণালীর বাবা ছিলেন সামান্য স্কুল  মাষ্টার  আর অন্যদিকে বিদিশার বাবা ছিলেন  কলেজের প্রিন্সিপাল। এতে অবশ্য ওদের বন্ধুত্বে কখনও কোনো ছেদ পড়েনি। এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল ওদের জীবনের  সবচেয়ে  সুন্দর  দিনগুলো। একদিন  স্কুল  যাওয়ার পথে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে দুই বন্ধু। হঠাৎ হেসে উঠল বিদিশা হি হি করে। বর্ণালী তো  অবাক। পাগল হয়ে গেল নাকি মেয়েটা। জিজ্ঞেস করল --- "কি রে একা একা হাসছিস যে? " হাসতে হাসতে বিদিশা উত্তর  দিল -- " জানিস কাল রাতে না  একটা দারুন  কান্ড হয়েছে। সবাই তো ডাইনিং  টেবিলে  বসে ভাত খাচ্ছি, আর আমার থালার পাশে একটা ডিটেকটিভ  বই। আমি পড়ছি আর খাচ্ছি। পড়তে পড়তে থালায় হাত না দিয়ে ভাতের জন্য ডাইনিং টেবিলে হাতানো শুরু  করলাম। মা তো এই দৃশ্য দেখে দিল একটা বকা"-- বলেই আবার হাসতে শুরু  করল। বর্ণালী সেই প্রথম  শুনল ডাইনিং  টেবিলের  কথা। কায়দা করে বিদিশার কাছ থেকে জেনে নিল কিরকম হয় ডাইনিং টেবিল,কি থাকে এতে,কি করতে হয় সবকিছু। শুনতে শুনতে বর্ণালীর চোখের  সামনে ভেসে উঠছিল ওর নিজের বাড়ির রান্নাঘরের  দৃশ্য। মাটির ঘরে কুপি জ্বালিয়ে  পিড়ি  পেতে খেতে বসেছে ওরা দুই বোন আর বাবা।মা ভাত বেড়ে  দিচ্ছেন।

স্কুল  থেকে ফিরেই বর্ণালীর মাথায় ঘুরতে লাগল একটাই চিন্তা।কিভাবে  পাতা যায় নিজেদের রান্নাঘরে একটা ডাইনিং  টেবিল?  দুই বোন মিলে শলাপরামর্শ  করে বাড়ির  বাতিল  জিনিসপত্রের ঘর থেকে  সংগ্রহ  করল একটা টেবিল। যার একটা পা ভাঙা, আর একটা পা উই পোকায় খেয়েছে। কিন্তু  ওদের দুই বোনের উৎসাহের কাছে হার মানল পা ভাঙা টেবিল। এটাকেই ধুয়ে মুছে পরিষ্কার  করে রান্নাঘরে নিয়ে এল দুই বোন। ভাঙা পা দুটিকে দাঁড় করানো হল ইট দিয়ে। এবার চেয়ার। কোথায় পাওয়া যাবে একটা চেয়ার? বাড়িতে একটাই চেয়ার আর সেটা ব্যবহার করেন ওদের বাবা। দুই বোন মিলে ঠিক করল চেয়ার লাগবে না, ওরা দাঁড়িয়েই খাবে।তবু তো ডাইনিং টেবিলে খাওয়া হবে। ভাঙা টেবিলে দুই বোনের দাঁড়িয়ে  খাওয়া দেখে মা তো বকা শুরু  করলেন। বাবা কিন্তু বললেন --" আহা বকছ কেন?  ডাইনিং টেবিলে খাওয়া বিজ্ঞান   সম্মত। এতে মেরুদণ্ড  সোজা থাকে।আর হজমও ভালো হয়। দাঁড়া তোদের যখন এত শখ আগামী মাসে চেষ্টা করব নিতাই এর দোকান  থেকে  একটা ডাইনিং  টেবিল  আনতে। টাকাটা না হয় মাসে মাসে শোধ করে দেব। " শুনে তো আনন্দে  নেচে উঠল দুই বোন।

বেল বাজার শব্দে  বর্তমানে ফিরে এল বর্ণালী। মনটা ভারাক্রান্ত  হয়ে গেল বাবার কথা মনে করে।  বাবা মারা গেছেন আজ পাঁচ বছর হল।  শুধুমাত্র  মেয়েদের  মুখে হাসি ফোটাতেই ধার করে সেদিন তিনি কিনেছিলেন  একটি ছোট্ট  ডাইনিং  টেবিল  আর দুটি চেয়ার। সে টেবিল নিয়ে দুই বোনের সে কি উন্মাদনা।  আজ বর্ণালীর নিজ বাড়িতে  মডিউলার কিচেন, এইট সিটারের সবচেয়ে দামী ডাইনিং টেবিল। অথচ সবাই একসাথে  বসে ডাইনিং  টেবিলে  খাওয়া হয় কোথায়? ছেলে খায় টিভি দেখতে দেখতে বসার ঘরে।আর পতিদেব?  তিনি তো খেতে বসেও অফিসের কাজে ব্যাস্ত থাকেন। বর্ণালীর কিন্তু  খুব ইচ্ছে  করে সবাই মিলে ডাইনিং  টেবিলে  বসে সারাদিনের  গল্পগুলো  করতে খেতে । কিন্তু তা আর হয় কোথায়?  এত বড়ো ডাইনিং  টেবিলে  একা একা খেতে বসতেই ইচ্ছে  করেনা বর্ণালীর। তাই রান্নাঘরেই সেরে নেয় ওর নৈশাহার। দামী কাচের মসৃণ টেবিলের মসৃণতা  তাই একটুও নষ্ট  হয়না দিনের পর দিন।


সুস্মিতা ধর,ত্রিপুরা

ছবিঃসৌজন্যে ইন্টারনেট
৪ঠা জুলাই ২০২০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

test banner