তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ"....বাংলাদেশ থেকে দেবব্রত সেনের ছোট গল্প - আরশি কথা

আরশিকথা ঝলক

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০১৯

তখনও যায়নি ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ"....বাংলাদেশ থেকে দেবব্রত সেনের ছোট গল্প

রান্নাঘরের চুলায় আধ হাত জল, খড়ের চালের ফুটো দিয়ে সারাদিন বৃষ্টি পড়ে থকথকে হয়ে আছে সমস্ত ঘর। অগত্যা বড়ঘরের ধারের তুষের আল্গা চুলাটা ধরালেন ইন্দিরা দেবী। সারাদিন অবিরাম বৃষ্টির জন্য রান্না করা হয়নি, দুপুর বেলাতেও চিড়ামুড়ি খেয়ে আছে সবাই। এই বেলা যা হোক কিছু একটা ফুটিয়ে নিতে হবে। বিকেলে বৃষ্টিটা একটু ধরে এলে হিমাংশু ভাঙ্গা পুরানো টিন দিয়ে রান্নাকরার জন্য জায়গাটা ঢেকে দিলেন, ইন্দিরার কথামত। অনেকক্ষণ ধরে বাঁশের চোঙায় ফু দিয়ে চেষ্টা করছেন ইন্দিরা। কিন্তু আগুন ভালো মতো জ্বলছে না। চোখের জলটাই সার হলো। দরজার চৌকাঠে বসে টুকটুক অনেকক্ষণ মায়ের এই করুন প্রচেষ্টা দেখছিল। মার জন্য তার খুব কষ্ট হলো। কাছে এসে মায়ের কাছ থেকে চোঙাটা নিয়ে মাকে বলল, ‘আমি একটু চেষ্টা করে দেখি মা, তুমি ততক্ষণে সন্ধ্যাবাতিটা দিয়ে ফেল। বলাই বাহুল্য অন্যসময় সারাক্ষণ ভৎসনা করেও নক্ষেরনারাটি টুকটুককে দিয়ে সরানো যেত না। কন্যার এমন পরিবর্তনে ইন্দিরা খুব খুশি হলেন। আঁচলে চোখ কচলিয়ে সন্ধ্যাবাতি দিতে গেলেন। সন্ধ্যার তখনও খানিক দেরি ছিল, কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়াতে তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে এল। তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে যাবার সময় চকিতে একবার কন্যার দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালেন ইষৎ হেসে নিষ্ক্রান্ত হলেন তুলসীমঞ্চের দিকে। সন্ধ্যার আনুসাঙ্গিতা শেষ করে, গোয়ালে ধূপধূনো দিয়ে যখন ইন্দিরা মেয়ের কাছে আসলেন তখন চুলার ওপর ভাত হয়ে গেছে। বসা ভাত, সুতরাং মাড় গালার কোনো ঝক্কি নেই। টুকটুক ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে নিপূন হাতে চুলার উপর তরকারীর কড়াই বসিয়ে দিয়ে তেল আনার জন্য উঠে দাঁড়ালো। ইন্দিরা এতক্ষণ কন্যার অজান্তে তার পেছনে দাঁড়িয়ে মিটমিট হাসছিলেন, সে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা নিজের বুকে নিয়ে দুই হাতে অনেকক্ষণ নিজের শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে রাখলেন। মায়ের বুকের উষ্ণতা নিতে নিতে টুকটুক মায়ের বুকের ধুপধুপ শুনতে লাগলো পরম আবেশে। আত্মজার মাথাটা বুকে চেপে ধরে ইন্দিরার দু’চোখ। অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। এ অশ্রু চুলার বিষাক্ত ধোঁয়ার কনকনে সূঁচফোটানো অশ্রু নয়, অপত্য স্নেহের। ঝিঁঝিপোকা এবং ব্যাঙের ডাকের পাশাপাশি রাত গভীর হচ্ছিল ঢিমালয়ে। জোনাকিরা টিমটিম আলো জ্বালিয়ে ইতস্তত পরিভ্রমণেব্যস্ত। হারিকেনের ম্লান আলোতে ইন্দিরা স্বামী সন্তানদের রাতের খাবার পরিবেশন করে নিজে খাবার নিয়ে বসলেন। টুকটুক ভাইবোনদের নিয়ে বিছানায় শুয়ে গল্প বলছিল। আকাশে আবার ঘন মেঘ জমেছে, একটু পরই কু-লী পাকানো কালো ধোঁয়ার মতো বর্ষণ শুরু হলো। ইন্দিরা কোনোমতে, খাবার শেষ করে এ্যাঁটো বাসনগুলো একত্রে ঘরের কোণে জমা করে রাখতেন, রান্নাঘর লেপে মুছে পরিচ্ছন্ন করে রাখতেন। সকালে পরিচ্ছন্ন রান্নাঘরে ঢুকতে না পারলে ইন্দিরার কিছুতেই ভালো লাগে না। প্রথমে মন্থর ক্রমান্বয়ে ভারী বর্ষণ শুরু হলো। মরচে পড়া পুরানো টিনের চালের ছিদ্র দিয়ে জল পড়া শুরু হলো। হিমাংশু অনেকগুলো ফুটো আলকাতরা এবং পলিথিন দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ঠাকুরদার আমলের পুরনো টিন, নিত্য নতুন ফুটো হয়, কত বন্ধ করবেন! এখানে ওখানে সারা ঘরময় পাত্র বসানো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ছেলেমেয়েগুলো ঢুলুঢুলু চোখে বিছানায় উঠে বসে আছে। প্রবল বর্ষণ, জল পড়ছে প্রায় সমস্ত ঘরে। ইন্দিরা স্বামীকে দোষী করে বকাবকি করতে লাগলো, ঘন ভারী বর্ষণের মতোই। বেচারা হিমাংশু ! মুখে কোনো কথা নেই, অধোমুখী হয়ে বসে আছে। বুঝিবা ধিক্কার দিচ্ছেন নিজের অদৃষ্টকে। এছাড়া হিমাংশুরআর কিইবা করার আছে! থাকার মধ্যে বাপদাদার দিনের কিছুসম্পত্তি যার প্রায় সবটাই অন্যের ভোগ দখলে আর তাঁর আধ পঙ্গুদেহটা। একাত্তরে পাকবাহিনী প্রিয় স্বদেশ এই শ্যামল বাংলাকে যখনক্ষতবিক্ষত করছিল তা সহ্য করতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেনমুক্তিযুদ্ধে। শত্রুর গুলিতে আহত হয়ে ভারতে শরনার্থী শিবিরের হাসপাতালে পড়েছিলেন তিন মাস। যখন ছাড়া পেলেন তখন বাংলাদেশ স্বাধীন। তাঁর গুলিবিদ্ধ পায়ের যখম ভালো হলেও পা টা খোঁড়া হয়েগেল। শত্রুমুক্ত বাংলাদেশে যখন এলেন তখন তাঁর আপন বলতে আর কেউনেই। আহত মুক্তিযোদ্ধা বলে বাস্তুভিটা এবং কিছু জমি ফিরে পেয়েছিলেন। আর সব অন্যে দখল করে নিয়েছে। সরকার অবশ্য অনুগ্রহ করে একটা চাকরি তাঁকে দিয়েছিলেন কিন্তু তা-ও চলে গেল কিছুদিনপর। সরকার তাঁকে বাধ্যতামুলক অবসরে দিল। তবে পেনশনটা বন্ধ করলোনা দয়া করে।ঘরটা মেরামত করতে গেলে এবং কিছু নতুন টিন লাগাতে গেলেঅনেকগুলো টাকা চলে যাবে। কয়েকবার ভাবেননি যে তা ও না। অবসরদেবার সময় সরকার যে টাকাটা দিয়েছে তার অনেকটাই চলে যাবেতাহলে। বড় মেয়ে টুকটুকের বিয়ের বয়স হচ্ছে। ভাল পাত্র পেতে হলেঅনেক যৌতুক দিতে হবে। ছেলেদু’টোর পড়াশুনা, ছোট মেয়েটারও বিয়ে দিতে হবে। আধো ঘুম আধো জাগরনে হিমাংশু এসব কথাভাবছিলেন। গিন্নীর তিরস্কার তাঁর কানে পৌঁছায় নি। এক বসাতেসমস্ত রাত পার করে দিয়েছেন। কখন বৃষ্টি থামলো, কখন ভোর হলোকিছুই তিনি বুঝতে পারেন নি। সকালে মেয়ের শীতল হাতের স্পর্শেতন্দ্রা ভাঙ্গল। মেয়ের কচি মুখটাকে সদ্যস্নাত করবীর মতো মনে হচ্ছিল। সেই সরল মুখখানির দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জিতও হলেন।অনেকবার ভেবেছিলেন ভারতে চলে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশকে মায়ের মতোই ভালোবেসেছিলেন। এ ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মাটিরমায়া তিনি কাটাতে পারেন নি। বাপদাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়েআছেন। ওখানে গিয়েও বা কী করতেন। ভিনদেশি লোকের হাতে নিগৃহীত হওয়ার চাইতে স্ব-জাতির হাতে হওয়া অনেক ভালো। সারারাত্রির বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট একদম পরিস্কার। রোদের নরম স্পর্শ গায়ে মাখাতে মাখাতে হিমাংশু বাজারের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখনও রাস্তার লোক চলাচল তেমন শুরু হয় নি। বন্ধু এবং সহযোদ্ধা অনিল ঘোষের দোকানে গিয়েই শুনলেন খবরটা। নির্বাচন উপলক্ষে মুরগী মিলন, পিচ্চি হেলাল তাদের বাহিনী নিয়ে এসে জড়ো হয়েছে ইয়াছিন মোল্লার বাড়িতে। মনি, হীরা তারানাকি কয়েকজনকে দিনের বেলায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। গলকাল বৃষ্টির মধ্যে তারা দুই বস্তা অস্ত্র এনে রেখেছে ভোট কেন্দ্র দখল করারজন্য। খবরটা শুনে হিমাংশু শংকিত হলেন! এতদিন একরকমশান্তিপূর্ণভাবেই দিন যাপন করছিল সবাই। এই সংসদ নির্বাচনে বুঝি আবার শুরু হবে ত্রাসের তান্ডব। এক কাপ চা খেয়ে বিমর্ষভাবে বসে বসে বিড়ি টানছিলেন হিমাংশু। অনিল দোকান সামলাচ্ছিল।
এই সময় নরেশ মেম্বার আসলো চা খেতে। কথায় কথায়তার কাছেই জানা গেল দীপনারায়নের হারানো গরুটা দিয়ে নাকি কালরাতে ভুনা খিচুড়ি রান্না করে খেয়েছে মিলনের দল! ইয়াছিনমোল্লার কাচারীঘরেই নাকি ভোজ হয়েছে ! হিমাংশু চিন্তিত মনেবাড়ি ফিরলেন। গৃহিনী রান্না ঘরে ছিল। হিমাংশুকে দেখেইঝাঁঝালো গলায় বললো, ‘ এত বেলা পর্যন্ত দোকানে কিসের আড্ডাশুনি ? এদিকে যে রান্নার কিছু নেই। ছেলেমেয়েগুলো স্কুলে যাবে কি খেয়ে ? আমার হয়েছে যত জ্বালা ’। ইন্দিরার অকাট্য যুক্তির কাছে হিমাংশু কখনো পেরে উঠে না। তাইউত্তর দেয়া হতে নিজেকে বিরত রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গরুটাকে নিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে চলে গেলেন।বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। ফিরে এসে গৃহিনীকে ধীরে ধীরে সমস্তকথা খুলে বললেন। সব শুনে ইন্দিরা ভয় পেলেন, একটু বিচলিতও হলেন।ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে যেতে নিষেধ করে আবার রান্না ঘরে ঢুকলেন।এরমধ্যেই তিনি রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন করে ছাই ও তুষ দিয়ে একরকমশুকনো করে নিলেন। ৪. গত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে হিমাংশু ভোটকেন্দ্রে যান না। এবারস্থির করেছিলেন ভোট দিতে যাবেন সস্ত্রীক। নির্বাচনের দিন সকালবেলা প্রাত্যাহিক অভ্যাস বসত অনিলের দোকানে চা খেতে গিয়ে যা দেখলেন তাতে তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা।অনিল ঘোষের হাতে পায়ে বেন্ডেজ বাঁধা, দোকানের জিনিসপত্র এলোমেলো, আলমারি ভাঙ্গা, সর্বনাশ হয়ে গেছে। কর্মচারী হরিচরণ কেঁদে কেঁদে যা বলল তাতে হিমাংশু বুঝলেন,গতকাল রাত দশটার দিকে আট দশজন সন্ত্রাসী এসে অনিল ঘোষ ও কর্মচারিদেরকে বেদম মারধর করে। শুধু তাই নয় নগদ টাকা, আজকের জন্য মিষ্টি-দই যা তৈরি করেছিলেন এবং ময়দা, চিনি, দুধ সবনিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় শাসিয়ে গেছে কেউ যেন ভোট কেন্দ্রেনা যায় এবং থানায় যাতে কোনো মামলা কিংবা ডায়েরি না করা হয়। সমস্ত শুনে বন্ধুকে শান্তনা দেয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন হিমাংশু,বাকরুদ্ধ হিমাংশু কিচ্ছু মুখে না দিয়ে ফিরে এলেন বাড়িতে।আসার পথে অন্নদাপ্রসাদ গ্রামের হিরন্ময়ের সাথে দেখা হল। হিরন্ময়ের কাছে শুনলেন, তাঁদের স্বর্ণের দোকান এবং তার জেঠানীরেন্দ্রর মুদি দোকানেও ওরা হামলা করেছে গতকাল প্রকাশ্য দিবালোকে। তারা থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ মামলা নেয়নি। হিমাংশুকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করে ছেলেটি চলে গেল। বাড়িতে এসে শুনলেন, ইন্দিরার কানেও খবরগুলোপৌঁছে গেছে। ইন্দিরা বললেন,-‘এখন কী হবে গো ? আমার ভীষন ভয়করছে !’হিমাংশু স্ত্রীকে সান্তনা দিলেন,-‘ঈশ্বরকে ডাক। তিনি সবাইকে রক্ষাকরবেন। ইন্দিরা বলেন,-‘ একটা কাজ করলে হয় না ? চল আমরা অন্যকোথাও চলেযাই। গ্রামের লোকেরা তো সব শহরে আত্মীয়,স্বজনের বাড়িতে চলেযাচ্ছে। আমরাও চলে যাই না কেন ?‘আমাকে একটু ভাবতে দাও ?’ হিমাংশু চিন্তিত মনে গোয়ালের দিকে চলে গেলেন। হিমাংশু ভেবে কোন কুলকিনারা করতে পারেন নি। সারাজীবনই তিনিভেবেছেন, কিন্তু ফল অন্তসার শূন্য। নিজ থেকে কোন সিদ্ধান্তই নিতেপারেন না। তার সমবয়সী, সহযোদ্ধাদের অনেকেই কতকিছু করেছে-প্রভাব, প্রতিপত্তি কত কিছু। অথচ তিনি তাঁর একগুঁয়ে স্বভাবেরজন্য কিছুই করতে পারলেন না। এই অপরাধ বোধে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হনতিনি, আজও। সকাল সকাল রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে ইন্দিরা ঘরেচলে এলেন। সন্ধ্যা হতে না হতেই সমস্ত গ্রাম নীরব নিস্তদ্ধ হয়ে গেল। গ্রামথেকে অনত্র পালিয়ে যাবার জায়গা যাদের নেই তারা রাতের এই অন্ধকারে যেনগুহায় ঢুকে গেল। হিমাংশু বাড়ি ছেড়ে কোথাও নড়েননি, নড়তে পারলেন না। স্ত্রীর পাশে বসেআছেন, আকাশ-পাতাল আপন মনে ভেবে চলেছেন-নিশ্চুপ, নিথর। তখনও পঞ্চমীরচাঁদ ডুবে যায়নি, অপূর্ণ চাঁদের আলোয় আমগাছের একটা ছায়া উঠানে পড়ে কেমন ভৌতিক একটা অবয়ব তৈরি করেছে.....।

ছবিঋণঃ সৌজন্যে ইন্টারনেট



দেবব্রত সেন, ব্যাংক আধিকারিক
বাংলাদেশ

২৯শে মার্চ ২০১৯ইং

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here